নায়িকার সঙ্গে প্রেম, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, মানসিক পীড়নের অভিযোগও! বিতর্কময় ‘নায়ক’ মুখ্যমন্ত্রীর জীবন
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন দক্ষিণী ছবির সুপারস্টার তলপতি বিজয়। তাঁর কাজ প্রশংসিতও হচ্ছে। কিন্তু বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন এখনও আলোচনার কেন্দ্রে।
তাঁর গোছানো রাজ্যশাসন দেখে জনগণ মুগ্ধ। অথচ তাঁর আপন ঘর-সংসারের অবস্থা বেশ অগোছালো। বিবাহবিচ্ছেদের মামলা, ‘বিবাহবহির্ভূত প্রেম’-এর অভিযোগ, নায়িকার সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জন— সব মিলিয়ে তামিলনাড়ুর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা তামিল ছবির সুপারস্টার বিজয় তলপতির সম্পর্ক বার বার এসেছে বিতর্কের কেন্দ্রে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই বিজয়ের বিরুদ্ধে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করেছিলেন তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতা সোর্নালিঙ্গম। স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনেন তিনি।
আদালতকে সঙ্গীতা বলেছিলেন, বিজয়ের সঙ্গে বিয়ের পরে ‘‘ধারাবাহিক মানসিক নিপীড়ন, অবহেলা এবং নিঃসঙ্গতার শিকার হতে হয়েছে।’’ বিজয় তাঁকে দিনের পর দিন একা ফেলে চলে গিয়েছেন বলেও আদালতে অভিযোগ করেন বিজয়পত্নী।
অথচ বিজয়ের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতার বৈবাহিক সম্পর্ক ২৬ বছরের। পরস্পরের প্রতি ভাললাগা, আকর্ষণ থেকেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন দু’জনে। তারও আগে তিন বছর পরস্পরের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন তাঁরা।
১৯৯৬ সালে দেখা হয় বিজয় আর সঙ্গীতার। তখন বিজয় তামিল সিনেমার উঠতি অভিনেতা। আর সঙ্গীতা ছিলেন তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত। ব্রিটেন নিবাসী শ্রীলঙ্কান-তামিল পরিবারের কন্যা সঙ্গীতা লন্ডন থেকে চেন্নাইয়ে এসেছিলেন শুধু বিজয়ের শুটিং দেখতে।
আরও পড়ুন:
সেটেই আলাপ হয় দু’জনের। সেই আলাপ গড়ায় বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক আকর্ষণে। তিন বছর পরে বাবা-মায়ের সঙ্গে সঙ্গীতার দেখা করান বিজয়। তাঁরাই বিয়ের অনুমতি দেন। ১৯৯৯ সালের ২৫ অগস্ট বিয়ে হয়।
দু’জনে দুই ধর্মের, দুই দেশের মানুষ। বিজয় ভারতের তামিল-খ্রিস্টান, সঙ্গীতা শ্রীলঙ্কার তামিল-হিন্দু। অবশ্য বিবাহেচ্ছুক দুই তরুণ-তরুণীর সামনে সেই সব পার্থক্য বিশেষ দাগ কাটতে পারেনি।
যদিও পরে এক সাক্ষাৎকারে বিজয়কে বলতে শোনা যায়, তাঁদের বিয়ে প্রেম-বিবাহ নয়। তিনি তাঁর বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করেছেন। কারণ, তিনি মনে করেন, বাবা-মায়ের পছন্দ করা সঙ্গীকে বেছে নিলেই সারা জীবন সুখে থাকা যায়।
বিয়ের এক বছরের মধ্যেই পুত্র জেসন সঞ্জয়ের জন্ম। তার পাঁচ বছর পরে বিজয় আর সঙ্গীতার জীবনে আসে কন্যা দিব্যা শাসা। সেই পর্যন্ত কোনও সমস্যা ছিল না। সঙ্গীতাও আদালতকে জানাননি, ঠিক কবে থেকে তাঁদের বিয়েতে সমস্যার সূত্রপাত। তবে তিনি আদালতকে বলেছেন, তাঁর আর বিজয়ের বিবাহিত জীবনে এক অভিনেত্রীর উপস্থিতির কথা।
আরও পড়ুন:
কে সেই অভিনেত্রী, নাম উল্লেখ না করে সঙ্গীতা জানিয়েছেন, ওই অভিনেত্রীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে বিজয়ের। সঙ্গীতা নাম না করলেও তামিল ছবির দর্শকের বুঝতে দেরি হয়নি কে সেই অভিনেত্রী।
দক্ষিণী তারকা তৃষা কৃষ্ণণের সঙ্গে বিজয়ের ‘বিশেষ’ বন্ধুত্বের কথা তামিল সিনেমার জগতের অজানা নয়। এ নিয়ে গুঞ্জন বহু বছর ধরেই ছিল। সঙ্গীতার বিচ্ছেদ মামলায় ‘অভিনেত্রী’ শব্দটুকুই তাই যথেষ্ট ছিল সেই গুঞ্জনে উসকানি দিতে।
বহু বছর ধরেই বিজয়ের সঙ্গে কাজ করছেন তৃষা। ২০০৪ সালে প্রথম দু’জনে অভিনয় করেন ‘ঘিলি’ ছবিতে। প্রথম ছবিতেই দর্শকের নজর টানে দু’জনের রসায়ন। সেই সময়ে ৫০ কোটির বেড়া টপকেছিল ছবিটি। সেই সময়ে তামিল চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অলটাইম ব্লক-বাস্টার মুভির তকমা পায় ‘ঘিলি’। বিজয় আর তৃষার বন্ধুত্বও তখন থেকেই।
তামিল সিনেমায় বেশ কয়েকটি হিট সিনেমা উপহার দিয়েছে বিজয়-তৃষার জুটি। তবে ২০০৮ সালের পরে হঠাৎই একসঙ্গে সিনেমা করা বন্ধ করে দেন দু’জনে। আবার হঠাৎ করেই একসঙ্গে পর্দায় ফেরেন ১৫ বছর পরে। ২০২৩ সালে ‘লিও’ ছবিতে স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেন দু’জনে। বিজয় আর তৃষার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে গুঞ্জনও শুরু হয় সেই বছর থেকেই। কারণও যথেষ্ট ছিল।
২২ জুন বিজয়ের জন্মদিনে নিজের আর বিজয়ের একটি আয়নার সামনে দাঁড়ানো নিজস্বী পোস্ট করেন তৃষা। বিবরণে লিখেছিলেন, ‘‘নিস্তব্ধতা থেকে ঝড় আর এখন ঝড় পেরিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি।’’ সেই পোস্ট ঘিরেই জল্পনার শুরু।
এর পরে কিছু সূত্রে তামিল সিনেমাজগতে এমন খবরও ছড়ায় যে, বিজয়ের বাড়ির কাছাকাছি কোনও ফ্ল্যাটে নিজের ঠিকানা বদলে নিয়েছেন তৃষা। সেই তথ্যের সত্যাসত্য জানা যায়নি।
তবে ‘লিও’ ছবির মুক্তি-পরবর্তী এক অনুষ্ঠানে তৃষা প্রকাশ্যেই বলেন, বিজয় তাঁর ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার মানুষ। তেমনটাই থেকেছেন বিগত ২০ বছর ধরে। তৃষা এ-ও বলেন যে, বিজয় তাঁর কাছে আশ্রয়ের মতো, যেখানে নিজের মতো থাকা যায়।
এক দিকে যখন বিজয় আর তৃষাকে নিয়ে গুঞ্জন বাড়ছে, তখন সঙ্গীতাকে দেখা যাচ্ছে না বিজয়ের নানা অনুষ্ঠানে। সিনেমার পার্টি থেকে শুরু করে বিজয়ের নতুন রাজনৈতিক দলের বিশেষ অনুষ্ঠান— কোথাও নেই বিজয়পত্নী। ফলে দুয়ে দুয়ে চার করতে শুরু করেন অনুরাগীরা।
এমনই চলছিল। হঠাৎই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিজয়ের বিরুদ্ধে চেঙ্গলপট্টু পরিবার আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন সঙ্গীতা। কারণ হিসাবে স্পষ্ট জানান এক অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা।
সঙ্গীতা আদালতে দাবি করেন, তিনি ২০২১ সালেই ওই সম্পর্কের কথা জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিজয় তখন তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ‘ওই সম্পর্ক শেষ করবেন’। সঙ্গীতা তাতে বিশ্বাস করেছিলেন কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, এর পরেও দু’জনের সম্পর্ক নিজের মতো এগিয়েছে।
সঙ্গীতার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরে শুরু হয় তৃষা আর বিজয়ের সমালোচনা। কিন্তু সে সবের পরোয়া না করেই মার্চ মাসে তৃষাকে সঙ্গে নিয়ে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হন বিজয়। পরে মে মাসে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানেও তৃষাকে দেখা যায় বিশেষ অতিথির আসনে।
অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে বিজয়ের ঘর ভাঙার অভিযোগ আনতে শুরু করেন নেটাগরিকেরা। তার জবাব পরোক্ষে সমাজমাধ্যমে দেন তৃষা। লেখেন, ‘ভালবাসা জাহির করারই বিষয়’। কার উদ্দেশে কেন সে কথা লেখা, তার ব্যাখ্যা না দিলেও, যাঁরা বোঝার তাঁরা ঠিকই বোঝেন, তৃষা কী বলতে চেয়েছেন।
গত ২২ জুন বিজয়ের জন্মদিনে মধ্যরাতেও বিজয়ের সঙ্গে ছবি পোস্ট করেন তৃষা। তাতে দেখা যায় ঘরোয়া পোশাকে দু’জনে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকগুলি কেকের সামনে। কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎই বদলে যায়।
জুলাই মাসে বিজয় আর সঙ্গীতার বিবাহবিচ্ছেদ মামলায় অনুপস্থিত ছিলেন দু’জনেই। অগস্টের ৭ তারিখে তাঁদের বিয়ের তারিখের ঠিক ১৮ দিন আগে সঙ্গীতা জানিয়ে দেন, তিনি বিজয়ের থেকে বিবাহবিচ্ছেদ চান না।
সঙ্গীতা বিচ্ছেদের মামলা প্রত্যাহার করেন। বিজয়ের তরফেও সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়নি। কিন্তু সঙ্গীতা আর বিজয়ের সম্পর্কের আবার উন্নতি হচ্ছে কি না, তৃষা তাঁদের জীবন থেকে চলে গেলেন কি না, সে ব্যাপারে কোনও পক্ষই জানাননি কিছু। ফলে ‘নায়কোচিত’ মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন আরও একবার ঢেকেছে ধোঁয়াশায়।