ছোট্ট ফ্ল্যাট, খড়্গপুরে প্রেম, গুগ্ল ছাড়ার প্ররোচনা পেরিয়েই সুন্দর পিচাই, কেমন ছিল সাফল্যের সফর?
নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কেটেছে সুন্দরের ছোটবেলা। সে সবের মধ্যে দিয়েই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বিটেক পড়তে আইআইটি খড়্গপুরে হাজির হলেন সুন্দর। আর সেখানে এসে অনেকটা পাল্টে গেল তাঁর জীবন।
এখন তিনি অর্বুদপতি! ভারতীয় মুদ্রায় তিনি প্রায় ১৪,৩৬০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। অথচ এককালে তাঁর গোটা সংসার চলেছে কেবল ৩,০০০ টাকায়।
সেই সংসারে ছিলেন তিনি, তাঁর ভাই এবং বাবা-মা। চেন্নাইয়ে একটি ছোট্ট দু’কামরার ফ্ল্যাটে ছিল চার জনের সংসার। আজকের গুগ্ল সিইও সুন্দর পিচাই তখন ছিলেন সেই ছোট্ট সংসারের মুখচোরা বড় ছেলে। নাম পিচাই সুন্দররাজন।
চেন্নাইয়ের জওহর বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন সুন্দর। ছোট থেকেই বড় চুপচাপ। সহপাঠীরা বলেন, কোনও বন্ধু ছিল না সুন্দরের। হবেই বা কী করে। কারও সঙ্গে কথা বলত না সে। সারাক্ষণ শুধু সে আর তার বই। স্কুলের বাসে উঠেও ব্যাগ থেকে বই বার করে পড়তে শুরু করত। পাশে যদি কোনও মেয়ে বসে, তা হলেও তাকাত না সুন্দর!
আসলে বন্ধুরা জানত না, মুখচোরা ছেলেটি তখনই বুঝতে শুরু করেছে জীবনের কঠিন সত্য— প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠতে গিয়ে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে।
বাবা ছিলেন চেন্নাইয়ের এক ব্রিটিশ ইলেকট্রিক সংস্থার ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর বেতন ছিল ৩০০০ টাকা। দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে তা দিয়ে সংসার চলত টেনেটুনে। তাই মা-ও স্টেনোগ্রাফারের কাজ করতেন।
আরও পড়ুন:
চেন্নাইয়ে দু’কামরার ফ্ল্যাটে সুন্দর আর তার ভাইয়ের আলাদা ঘরও পাওয়ার উপায় ছিল না। এক সাক্ষাৎকারে সুন্দর জানিয়েছিলেন, তাঁর এবং ভাইয়ের পড়াশোনা এবং ঘুমোনোর জায়গা ছিল তাঁদের বসার ঘরটিই।
একবার চেন্নাইয়ে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সময়ে তাঁর পরিবারের অসহায় অবস্থার কথাও এক সাক্ষাৎকারে রোমন্থন করেছিলেন সুন্দর। তিনি বলেছিলেন, ‘‘বাড়িতে জল নেই। আমার মনে আছে, সরকার থেকে পরিবারপিছু আট বালতি করে জল বরাদ্দ হয়েছিল। আমি আর মা বালতি নিয়ে সেই জলের লাইনে দাঁড়াতাম রোজ। নিজেদের সারাদিনের প্রয়োজনের জল তুলে আনার জন্য।’’
এমনই নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কেটেছে সুন্দরের ছোটবেলা। সে সবের মধ্যে দিয়েই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বিটেক পড়তে আইআইটি খড়্গপুরে হাজির হলেন সুন্দর। আর সেখানে এসে অনেকটা পাল্টে গেল তাঁর জীবন। মুখচোরা সুন্দরও পড়লেন প্রেমে।
খড়্গপুরে সুন্দরের ক্লাসেই পড়তেন অঞ্জলি হরিয়ানি। রাজস্থানের কোটা শহরের কন্যা ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী। আর সুন্দর পড়তেন মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রথম কয়েক বছর বন্ধুত্বই ছিল দু’জনের। পরে তা পরিণতি পায় প্রেমে।
আরও পড়ুন:
এক সাক্ষাৎকারে সুন্দর জানিয়েছেন তাঁদের প্রেমের সময়ের গল্প। সুন্দরের কথায়, অঞ্জলি থাকত খড়্গপুর ক্যাম্পাসের লেডিজ় হস্টেলে। তখন ফোন ছিল না যে আলাদা করে ডেকে দেখা করতে বলা যাবে। দেখা করতে চাইলে বলতে হত হস্টেলের নীচে থাকা কোনও ওয়ার্ডেন অথবা সহপাঠীকে। আর তিনি জোরে হাঁক দিয়ে বলতেন, অঞ্জলি, তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে সুন্দর! মুখচোরা সুন্দর মুখ লুকোনোর জায়গা পেতেন না তখন।
অঞ্জলিকে সুন্দর প্রেম নিবেদন করেন আইআইটি-র ফাইনাল ইয়ারে। তবে তার পরেই বিদেশে পড়তে চলে যান সুন্দর। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। আলাদা হয়ে যান প্রেমিক-প্রেমিকা।
ছ’মাস অঞ্জলির মুখ দেখা তো দূর, কথাও বলতে পারেননি দু’জনে। কারণ, বিদেশ থেকে দেশে ফোন করার মতো অর্থ ছিল না সুন্দরের কাছে।
সুন্দর পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আমার বাবা তাঁর সারাবছরের বেতন দিয়ে আমার বিদেশে যাওয়ার টিকিট কেটে দিয়েছিলেন। সামান্য যা অতিরিক্ত টাকা ছিল, তা আমার বিদেশে পড়াশোনার প্রয়োজনীয় খরচের জন্য রাখতে হয়েছিল। সে সময়ে ফোন কেনা তো দূর, বিদেশ থেকে দেশে ফোন করার টাকাও ছিল না আমার কাছে।’’
এ যুগে যখন স্কাইপি, হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিয়ো কলে জুড়ে থেকেও ‘লং ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ’ টিকিয়ে রাখতে পারছেন না প্রেমিক-প্রেমিকারা, সেখানে ছ’ মাস সম্পূর্ণ নীরব থেকেও জুড়ে ছিলেন সুন্দর আর অঞ্জলি। পরে দু’জনেই বলেছেন, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসই ওই কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করেছিল তাঁদের।
পরে অবশ্য দূরত্ব ঘোচে। সুন্দর বিদেশে চাকরি পাওয়ার পরে অঞ্জলিও সেখানে চলে যান। ১৯৯৬ সালে বিয়ে হয় দু’জনের।
তখনও গুগ্লে চাকরি পাননি সুন্দর। অ্যাপ্লায়েড মেটারিয়াল নামে এক মার্কিন সংস্থার চাকরি ছেড়ে সবে যোগ দিয়েছেন ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট বা পরামর্শদাতা হিসাবে।
২০০৪ সালে গুগ্লে যোগ দেন পিচাই। তাঁর দায়িত্ব ছিল প্রডাক্ট ম্যানেজমেন্টের। তবে তার পাশাপাশি সুন্দরের কাজ দেখে একের পর এক বাড়তি দায়িত্বও পিচাইকে দিতে শুরু করে গুগল।
গুগ্ল ক্রোম থেকে শুরু করে গুগ্ল ড্রাইভ, জিমেল, গুগ্ল ম্যাপের মানোন্নয়নের ভার সামলেছেন পিচাই। ২০০৯ সালে মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেম হিসাবে ক্রোম লঞ্চ করেন সুন্দর। তার চার বছর পরে গুগলের নতুন পণ্য হিসাবে অ্যান্ড্রয়েডকেও নিয়ে আসেন তিনি। এর ঠিক দু’বছর পরে ২০১৫ সালে পিচাইকে গুগলের সিইও পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়।
তবে এই যে গুগ্লের সিইও হওয়া, তার নেপথ্যেও রয়েছে একটি ছোট গল্প। ২০১৪ সালে সুন্দরকে মাইক্রোসফটের সিইও পদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছিল। সুন্দরের সামনে গুগ্ল ছাড়ার সুযোগ এসেছিল আরও বড় পদের জন্য। সুন্দর নিজেও কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে পথ দেখান স্ত্রী অঞ্জলি।
সুন্দর জানিয়েছেন, অঞ্জলি সেই সময় তাঁকে গুগ্লেই থেকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তার পরে কী হয়, তা সবার জানা। এক বছর পরে গুগ্লের সিইও পদে অভিষেক হয় সুন্দরের। ২০১৯ সালে গুগ্লের প্যারেন্ট কোম্পানি অ্যালফাবেট ইনকর্পোরেশনের দায়িত্বও পান সুন্দর।
আপাতত সুন্দর পৃথিবীর ১০০ জন প্রভাবশালীর মধ্যে অন্যতম। টাইম পত্রিকা তাদের ১০০ জন সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালীর তালিকায় স্থান দিয়েছে পিচাইকে। ভারত সরকার দিয়েছে পদ্মভূষণ সম্মান। ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাটলস হিলসের ৩৮২ কোটি টাকার বিলাসবহুল বাড়িতে দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে সুখে সংসার করছে চেন্নাইয়ের দু’কামরার ফ্ল্যাটে শুয়ে স্বপ্ন দেখা মুখচোরা ছেলেটি।