আদর করে ঘরে আনার পরে একদিন সেই আদরের পোষ্যটিকেই বাড়ি থেকে বার করে দেওয়ার ঘটনা দিনে দিনে বাড়ছে। সমীক্ষা বলছে, আমাদের দেশে প্রায় ৬-৮ কোটি গৃহহীন পথকুকুর, বিড়াল রয়েছে, যাদের মধ্যে একটা বড় অংশ প্রথমে আশ্রয় পেলেও পরে বিতাড়িত। এই পরিত্যাগের ঘটনা যে ক্রমশ বাড়ছে, তা বিভিন্ন ডগ শেল্টার কিংবা রেসকিউ সেন্টারগুলিতে খোঁজ নিলেই জানা যায়। অবোলা প্রাণীদের প্রতি এই অমানবিকতা দিন দিন বাড়ছে কেন?
নেপথ্য কারণ
একটি পোষ্য যে প্রায় সন্তানসম পরিচর্যা, যত্ন ও সময় দাবি করে, তা দিতে প্রস্তুত থাকেন না অনেকেই। রোজকার খাবার ছাড়াও ভ্যাকসিন, অসুখ করলে চিকিৎসার খরচ... ইত্যাদির ব্যয়ভার সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ে অনেকের কাছে। দামি ব্রিডের পোষ্য হলে এই খরচ আরও বাড়ে।
তা ছাড়া অনেকের বাড়ির পরিবেশ পোষ্য রাখার পক্ষে উপযুক্ত হয় না। বাড়ির কোনও কমবয়সি সদস্য হয়তো হঠাৎ শখপূরণ করতে কুকুরছানা কিনে বসল, কিংবা উপহার পেল, অথচ সেই বাড়ির বাকি সদস্য তার জন্য প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে বাড়িতে কুকুর আনলে ঘর অপরিষ্কার হবে— এটা ধরে নিয়েই এগোতে হয়। নির্দিষ্ট সিজ়নে লোম ঝরা, দাঁত ওঠার সময়ে জিনিসপত্র কেটে নষ্ট করার মতো ঘটনা মেনে নিতে না পারলে, পোষ্যের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে না পারলে একদিন তার স্থান হতে পারে বাড়ির বাইরে।
আবার অনেকে পোষ্যকে ছেড়ে দেন তার বয়স হয়ে গেলে, কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে। চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্ব এড়াতেই এমনটা করে থাকেন তাঁরা। বড় আকারের কুকুরের (গ্রেট ডেন, অ্যালসেশিয়ান) ক্ষেত্রে অনেক সময়েই দেখা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চলচ্ছক্তি কমে গিয়েছে, কখনও পিছন দিকের পা দু’টি পড়ে যায়। সেই সময়ে যে পরিমাণ যত্ন তার প্রয়োজন, তা দিতে পারেন না অনেকে।
আবার পরিকল্পনা ছাড়াই গর্ভবতী হয়ে পড়লেও সেই পোষ্যকে অনেকে পরিত্যাগ করেন। এই ঘটনা বিড়ালের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। যে পথকুকুর বা বিড়ালরা কোনও বাড়ি থেকে রোজ খাবার পায়, তারা সাধারণত সেই বাড়ির আশপাশেই বাচ্চা দেওয়ার চেষ্টা করে। যিনি রোজ তাদের খেতে দেন, অনেক সময়ে তিনিও সেই বাচ্চাদের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন না।
পথকুকুর বাড়িতে নিয়ে এসে পোষা হয়েছে, এমন ঘটনাও প্রায়ই দেখা যায় আশপাশে। কিছু স্ট্রিট ডগ ছোটবেলায় একেবারে ল্যাব্রেডর কিংবা ডোবারম্যানের ছানার মতো দেখতে হয়। এমন সুন্দর দেখতে কুকুরছানা অনেকেই বাড়িতে নিয়ে আসেন শখ করে। হাট থেকেও কেনেন অনেকে। কিছু সময় পর থেকে দেখা যায়, তারা আসলে দেশি নেড়ি কুকুর। পেডিগ্রির পরিবর্তে ইন্ডিয়ান পারিয়ার লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করলেই শখ মিটে যায় তাঁদের, স্থান হয় রাস্তায়। স্টেশন কিংবা বাজার চত্বরে ছেড়ে দিয়ে আসা হয় তাদের। অনেকে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়ার সময়ে ভাবেন, নেড়ি কুকুর ঠিক সার্ভাইভ করে নেবে। কিন্তু বাড়ির কুকুর হঠাৎ রাস্তায় বেরোলে অনেক সময়েই নিজেরা খুঁজে খেতে শেখে না, রাস্তার কুকুররাও এদের আক্রমণ করে। ফলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের পক্ষে।
অনেক বাড়িতে ভালবাসার পাশাপাশি শাসনের নামে অত্যাচারও চলে পোষ্যের উপরে। আটকে রাখা, খেতে না দেওয়ার সঙ্গে চলে শারীরিক অত্যাচারও। এই ধরনের ঘটনা অনেক সময়েই আড়ালে রয়ে যায়। কখনও কখনও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে কোনও রেসকিউ সেন্টার থেকে উদ্ধার করা হয় আতঙ্কে আধমরা হয়ে থাকা সেই পোষ্যদের। এই ধরনের ঘটনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কী করণীয়?
কুকুর-বিড়াল পোষা যে শুধুই স্টেটাস সিম্বল নয়, তা সবার আগে বুঝতে হবে। এ প্রসঙ্গে পশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গৌতম মুখোপাধ্যায় বললেন, “বাড়ির একজন সদস্যের মতো করে তাকে দেখতে পারলে তবেই পোষ্য কিনুন। কেনার আগে অবশ্যই কাগজপত্র যাচাই করবেন। যদি কোনও বাধ্যবাধকতার কারণে পোষ্য রাখা আর সম্ভব না হয়, তা হলে তার অ্যাডপশনের যথাযথ ব্যবস্থা করুন।”
কর্মসূত্রে বাইরে চলে যাওয়ার সময়েও অনেকে অ্যাডপশনের সন্ধান করেন। অনেকে ঠিকঠাক পরিবার না পেয়ে কোনও ডগ শেল্টারে দিয়ে দেন পোষ্যদের। এই ধরনের সংস্থাগুলি কখনও কখনও নিজেদের সামর্থ্যের বেশি পোষ্য নিয়ে ফেলে, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অর্থে যত্ন হয় না সেখানে। সরকারি সাহায্য ছাড়া এই শেল্টারগুলি চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ শহর ও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অবোলা প্রাণীদের উদ্ধার ও আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত কাজ করে চলেছে। পেটা ইন্ডিয়ার মতো সংস্থা জাতীয় স্তরে কাজ করে। মানেকা গান্ধীর সংস্থার শাখা ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশে, এ রাজ্যেও। ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিমাল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট ফ্রন্টের সেক্রেটারি অনাবিল চক্রবর্তী বললেন, “রেসকিউ করার জন্য আমাদের কাছে আগে মাসে যেখানে দু’-তিনটে ফোন আসত, সেই সংখ্যাটা বেড়ে ১৫-২০টা হয়ে গিয়েছে। বেশির ভাগ সময়েই অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নামীদামি ব্রিডের কুকুর। আরও খারাপ অবস্থা পথকুকুরদের। পাচারচক্রও সক্রিয়। সরকার থেকে ভ্যাকসিনেশন, স্টেরিলাইজ়েশনে উদ্যোগী হলে কুকুর-মানুষের সহাবস্থান আরও সহজ হবে। যাঁরা পোষ্য নিতে চান, তাঁদের বলব দামি ব্রিডের পরিবর্তে পথকুকুরদের অ্যাডপ্ট করুন।”
পোষ্য মানে দায়িত্ব, শখপূরণের নিমিত্তমাত্র নয়। সেই দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হলে তবেই এগোন।