যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, ক্রমাগত কটাক্ষ, টাকার বিনিময়ে ‘মিটমাটের’ অভিযোগ! খ্যাতনামী নেটপ্রভাবীর মৃত্যুতে বহু প্রশ্ন
চেন্নাইয়ে ২৭ বছর বয়সি জনপ্রিয় বিনিয়োগ প্রভাবী ভি হরীশের মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য। সাইবার উৎপীড়নের অভিযোগ করেছেন মৃতের বাবা জে বিনয়গম। মৃত্যুর আগে রেকর্ড করা শেষ ভিডিয়োয় কী বলেছিলেন হরীশ?
চেন্নাইয়ের ভিলায় উদ্ধার ভি হরীশের ঝুলন্ত দেহ। ‘ফিন্যান্স উইথ হরীশ’-এর স্রষ্টা ছিলেন তিনি। ভাড়াবাড়িতে জনপ্রিয় ইউটিউবারের মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। সমাজমাধ্যমে ১৩ লক্ষেরও বেশি অনুসারী রয়েছেন ওই বিনিয়োগ প্রভাবীর (ফিন্যান্স ইনফ্লুয়েন্সার)। খবর, আত্মহত্যা করেছেন ২৭ বছর বয়সি ওই ইউটিউবার। প্রযুক্তি সংস্থার সিইও এবং ইউটিউবার জেসন স্যামুয়েলের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন হরীশের বাবা।
তামিলনাড়ুর ২৭ বছর বয়সি বিষয়স্রষ্টার অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে সমাজমাধ্যমে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। কারণ, মৃতের বাবা প্রযুক্তি সংস্থার সিইও জেসনের বিরুদ্ধে ‘সাইবার বুলিং’-এর অভিযোগ করেছেন। ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘ফিন্যান্স উইথ হরীশ’ চালাতেন ভি হরীশ। তাঁকে চেন্নাইয়ের ভাড়া করা ভিলায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ছেলের আকস্মিক মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলেই জানিয়েছেন তাঁরা বাবা।
‘ফিন্যান্স উইথ হরীশ’ নামের সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলে অর্থ এবং বিনিয়োগ সম্পর্কিত ভিডিয়ো, টিপ্স এবং পরামর্শ দিতেন হরীশ। তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ১৩ লক্ষেরও বেশি।
ইউটিউবার হরীশের অগণিত অনুগামী এবং তাঁর পরিবার এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই, তাঁর বাবা বিনয়গম চেন্নাইয়ের কানাতুর থানায় ‘ভেঞ্চার স্টুডিয়ো জেমুরিয়া ইনকর্পোরেটেড’-এর সিইও জেসন স্যামুয়েলের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে বিনয়গম দাবি করেন, জেসন হরীশের বিরুদ্ধে একটি ‘মানহানিকর ভিডিয়ো’ পোস্ট করেছিলেন। ওই ভিডিয়োর ফলে হরীশ ‘সাইবার বুলিংয়ের’ শিকার হন। তিনি আরও দাবি করেছেন, ক্রমাগত কটাক্ষ, সমালোচনার জেরে তীব্র মানসিক চাপ এবং জেসন স্যামুয়েলের করা অভিযোগই হরীশকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে।
আরও পড়ুন:
মৃত্যুর আগে হরীশের শেষ রেকর্ড বলে দাবি করা একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিয়োটি ঘি ঢেলেছে বিতর্কের আগুনে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই ভিডিয়োয় আর্থিক পরামর্শদাতার যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের জেরে মানসিক হেনস্থা, পরিবারকে হুমকি এবং টাকা চাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন হরীশ। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
ভিডিয়োয় হরীশ দাবি করেন, “এটা আমার পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফল। আমার মধ্যে কোনও ভুলত্রুটি খুঁজে পেলে আপনারা আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন এবং আমি তার জবাব দিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রম চুরি করে নেওয়া হল।” এর পর ওই ভিডিয়োটিতেই হরীশ অভিযোগ করেন, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে হয়রানি করা হয়েছে। মিটমাট করে নেওয়ার জন্য টাকা চাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে করেন তিনি।
তবে ওই ভিডিয়োয় কারও নাম উল্লেখ করেননি প্রয়াত নেটপ্রভাবী। অভিযোগে কারও নাম না করলেও কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার দিকে আঙুল তুলে হরীশ বলেছিলেন, “হুমকি পাচ্ছি যে আমার পরিবারকে নিশানা করা হবে। আমি পুদুচেরির বাসিন্দা জেনে দাবি করা হয়েছে, পুদুচেরির বিধায়ক, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে ওদের। আমার কাছে টাকা চেয়ে জিজ্ঞাসা করছে, টাকা না দিয়ে তুমি কোথায় যাবে?”
এর পর হতাশার সুরে নিজের অসহায়তা তুলে ধরেছিলেন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, “আমি জানি না কী করব। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে মনে হচ্ছে, আমার জন্য অন্যদেরও বদনাম হচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করলেও আমার অপরাধবোধ হচ্ছে। আমাকে মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। আয়কর বিভাগ জরিমানা আরোপ করলে আমাকে ৬০ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে এবং এমনকি কারাদণ্ডও হতে পারে, এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে।”
আরও পড়ুন:
ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োয় হরীশের অভিযোগ, আপসে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমায় বলা হয়েছে, এই সব ঝামেলায় না জড়িয়ে টাকা দিয়ে সমঝোতায় আসতে। নইলে এর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্বও বার করা হবে।”
পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর সেপ্টেম্বরে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। এর পর নতুন হ্যান্ডলের মাধ্যমে ভিডিয়ো পোস্ট করতে শুরু করেন হরীশ।
মঙ্গলবার ভি হরীশের মৃত্যুর খবর জানাজানি হয়। ওই ঘটনার পর এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে জেসন স্যামুয়েল জানান, তিনি হরীশের মৃত্যুতে গভীর ভাবে মর্মাহত। তবে তাঁর দাবি, তিনি শুধুমাত্র হরীশের ‘তথ্য বিকৃত করা’র বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেসন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় করা এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, “আমি কেবল এটাই উল্লেখ করেছিলাম যে ওই প্রভাবী তথ্যকে ‘বিকৃত’ করেছেন।” তিনি দাবি করেন, হরীশ সেবি অনুমোদিত বিনিয়োগ উপদেষ্টা বা আরআইএ ছিলেন না এবং ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ মিউচুয়াল ফান্ডস ইন ইন্ডিয়া’ (এএমএফআই) থেকে অতি সম্প্রতিই রেজিস্ট্রেশন নম্বর পেয়েছিলেন।
তবে নিজের শেষ ভিডিয়োয় হরীশ স্বীকার করেছিলেন যে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন। কিন্তু যা ঘটেছে, তা মেনে নিতে তাঁর অসুবিধা হচ্ছিল বলেও জানান।
হরীশের বাবা জে বিনয়গম ‘সাইবার বুলিংয়ের’ অভিযোগ তুলে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি ঘটনার দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।
হরীশের বাবার অভিযোগ, ওই ভেঞ্চার অপারেটর (জেসন) নিশানা করেছিলেন তাঁর ছেলেকে। ওই ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতেই হরীশের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল স্থগিত হয় বলে দাবি তাঁর বাবার। বাধ্য হয়ে নতুন প্রোফাইল খুলতে হয়! এই সব কিছু নিয়ে হরীশ হতাশায় ভুগছিলেন। তার জেরেই এই ঘটনা বলে দাবি বাবার।