ইমামদের বিরুদ্ধে অশ্লীল মন্তব্য, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ! জেলে অকথ্য অত্যাচারের পর মৃত্যুদণ্ড ইরানি তরুণীকে
ইরানের কট্টরপন্থী শাসনের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে চলা বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নের মধ্যেই গত ৩১ জানুয়ারি নাজ়মেহকে গ্রেফতার করা হয়। চলতি বছরের শুরু থেকেই তিনি উত্তর-পূর্বের শহর মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে বন্দি। একটি ফৌজদারি আদালতে পৃথক দু’টি মামলায় তাঁকে ১২ বছরের বেশি কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন।
দেশেরই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা ধর্ম নিয়ে মুখ খুললেই বিক্ষোভকারীকে ‘আল্লার শত্রু’ হিসেবে দেগে দেওয়া হয় ইরানে। আর ধর্ম বা ধর্মীয় কোনও বিষয় নিয়ে প্রতিবাদের সুর চড়ালেই সোজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান। দমন পীড়নের চেষ্টার পরেও সেই বিক্ষোভে রাশ টানতে পারেনি ইরানের প্রশাসন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও জ্বলছে ক্ষোভের ধিকিধিকি আগুন।
প্রাণ চলে যেতে পারে জেনেও কণ্ঠরোধ হয়নি তেমনই এক প্রতিবাদীর। সমাজমাধ্যমে ধর্ম নিয়ে পোস্ট করার কারণে ২৩ বছরের তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দিল মোজতবা খামেনেইয়ের দেশ। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ইরানের আদালত নাজ়মেহ আমিনিকে চরম শাস্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে বলে খবর।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের দাবি, চলতি বছরের গোড়ায় ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালীন গ্রেফতার করা হয়েছিল তরুণীকে। পরে তাঁর একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় ইরানের একটি আদালত।
ইরানের কট্টরপন্থী শাসনের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে চলা বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নের মধ্যেই গত ৩১ জানুয়ারি নাজ়মেহকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানা গিয়েছে। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভে ইরানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, ৫০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে খুন করে ইরানের প্রয়াত প্রাক্তন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেইয়ের বাহিনী।
পাশাপাশি, ‘ধর্মদ্রোহী’ চিহ্নিত করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে। সেই সময় গণবিক্ষোভে যোগ দেওয়ার ‘অপারাধে’ এক যুবকের ফাঁসির শাস্তি ঘোষণা করে ইরান। আমজনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঠেকাতে আবার পুরনো পথেই হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে সাবেক পারস্যের বর্তমান প্রশাসন।
আরও পড়ুন:
নাজ়মেহ হিসাবশাস্ত্র বা অ্যাকাউন্টিংয়ের ছাত্রী। চলতি বছরের শুরু থেকেই তিনি উত্তর-পূর্বের শহর মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে বন্দি। একটি ফৌজদারি আদালতে পৃথক দু’টি মামলায় তাঁকে ১২ বছরের বেশি কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন। ইরানি আইন অনুযায়ী, ধর্মের অবমাননা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
আরও একটি পৃথক মামলায়, নাজ়মেহর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তার বিরোধী কাজকর্ম এবং সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। সেই মামলায় তাঁকে ১২ বছর, ছ’মাস ও একদিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
গ্রেফতারের পর নাজ়মেহর ঠিকানা হয় মাশহাদের কুখ্যাত ভাকিলাবাদ কারাগার। মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা (এইচআরএএনএ)-র অভিযোগ, সেখানে তাঁকে নির্মম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শুধু তাই নয়, প্রায় তিন মাস তাঁকে নির্জন কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনা ইরানে কারাগারে থাকা বন্দিদের উপর নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিতর্ককে আবারও এক বার উস্কে দিয়েছে।
নাজ়মেহর পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান’-কে এই তথ্য জানিয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ‘সাব্ব-উল-নবী’ (নবীর অবমাননা) অভিযোগে তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, ইরানের সাইবার পুলিশ ‘ফাটা’(ফেলিস-এ ফেজাই-এ তৌলিদ ওয়া তাবাদোল-এ এতেলাত-এ ইরান)-এর অনলাইন নজরদারির পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
আরও পড়ুন:
একটি সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নাজ়মেহর বিরুদ্ধে ইমামদের নামে অত্যন্ত ‘অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য’ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে, তাঁর সমাজমাধ্যমের পোস্টগুলিতে ঠিক কী লেখা ছিল, তা এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
মাশহাদের কলেজের ছাত্রী নাজ়মেহ কারাগার থেকেই একটি অডিয়ো বার্তায় জানিয়েছেন যে বিচার বিভাগ ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারি করেছে। তবে, আশার বিষয় এই দণ্ডাদেশ চূড়ান্ত নয়। ইরানের সর্বোচ্চ আদালতে এর বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে।
সেই অডিয়ো বার্তায় তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘আমার নামটা মনে রাখবেন। হয়তো এমন দিন আসবে, যখন আমি আর কথা বলতে পারব না। তবুও, যত দিন বেঁচে আছি, আমার একটাই স্বপ্ন—ফাঁসির দড়ি আমার জীবনের ইতি টানার আগেই যেন নিজের সমৃদ্ধ ও স্বাধীন ইরানকে দেখে যেতে পারি।”
রুদ্ধ কারাগার থেকে তিনি তাঁর প্রতিবাদী স্বর ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন সেই বার্তায়। নাজ়মেহ জানান, তিনি নিজেকে বীর হিসেবে তুলে ধরতে চান না। তাঁর কণ্ঠস্বর যেন তাঁর হয়ে কথা বলতে পারে। ইরানকে পাল্টে দেওয়ার আশা ও স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে রয়েছেন তিনি। সেই অডিয়ো বার্তায় নাজ়মেহ বলেন ‘‘আমার বাবা-মা আছেন, যাঁরা প্রতিদিন আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। এমন একটি পরিবার, যারা আমাকে হারানোর আশঙ্কায় প্রতি রাত কাটায় চরম উৎকণ্ঠায়, আর প্রতিটি রাত যেন তাদের কাছে এক একটি দীর্ঘ সকাল হয়ে ওঠে।’’
ইরানি সংবাদপত্র খোরাসানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতে ওই তরুণী দাবি করেন, বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেডেলিক মাশরুম খাওয়ার পর বিভ্রমের ঘোরে থাকাকালীন তিনি ওই মন্তব্যগুলি করেছিলেন। তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, মন্তব্যগুলি ইচ্ছাকৃত ছিল না, বরং মানসিক বিভ্রান্তির মধ্যে অসচেতন ভাবেই তিনি সেগুলি করেছিলেন। তবে আদালত সেই যুক্তি মানতে নারাজ। জানা যায়, শুনানির সময় বিচারক তাঁকে প্রশ্ন করেন, “একই বিভ্রমের মধ্যে থাকাকালীন আপনি আমেরিকা ও ইজরায়েলের মতো অন্য দেশ বা সরকারের বিরোধীদের কেন অপমান করেননি?”
সাইবার পুলিশের নজরদারির পর সমাজমাধ্যমে করা পোস্টের ভিত্তিতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নাজ়মেহকে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তিনি শিয়া ইসলামের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, বারোজন ইমামকে নিয়ে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। বিচারক জাভেদ আশিয়ান-ইয়াজদের সভাপতিত্বে খোরাসান রাজাভি প্রদেশের ফৌজদারি আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনায়।
এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই ইরান হিউম্যান রাইটস এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টের জন্য কোনও তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তা শান্তিপূর্ণ ভাবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে। সংস্থাটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এই রায় বাতিল করার পাশাপাশি অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।