শতকোটিপতি, সব মহাদেশে বাড়ি, কিনেছিলেন জোড়া দ্বীপ! সব হারিয়ে দেউলিয়া হন এয়ারসেলের মালিক
১৯৫৬ সালের ২৯ জুলাই চেন্নাইয়ে জন্ম হওয়া চিন্নাকন্নন শিবশঙ্করন বর্তমানে সেশেলসের নাগরিক। তিনি ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ‘এয়ারসেল’, ‘শিভা কম্পিউটার্স’, এবং ‘ডিশনেট’-এর প্রতিষ্ঠাতা।
একসময় তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। দু’টি ব্যক্তিগত দ্বীপের মালিক ছিলেন। ঝড় তুলেছিলেন কম্পিউটার এবং টেলিকম ব্যবসার জগতে। কিন্তু, এখন তিনি দেউলিয়া। কথা হচ্ছে ব্যবসায়ী চিন্নাকন্নন শিবশঙ্করনের (সি. শিবশঙ্করন)। টেলিকম সংস্থা এয়ারসেলের প্রতিষ্ঠাতা শিবশঙ্করন। গড়ে তুলেছিলেন কম্পিউটার সংস্থা ‘স্টার্লিং কম্পিউটার্স’। এক সময়ের শতকোটিপতি শিবশঙ্করন পরিচিত ছিলেন বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্যও।
কিন্তু, এয়ারসেল ধসে পড়ার পর শুরু হয় আইনি লড়াই। প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা হারান তিনি। আর, এখন তিনি সব হারিয়ে দেউলিয়া। শিবশঙ্করন নিজেও বলেন, ‘‘আমি গরিব নই। আমি দেউলিয়া।” শতকোটিপতি থেকে দেউলিয়া হওয়া ভারতের অন্যতম ব্যবসায়ী শিবশঙ্করনের কাহিনি বেশ চমকপ্রদ।
১৯৫৬ সালের ২৯ জুলাই তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে চিন্নাকন্নন শিবশঙ্করনের জন্ম। তবে, ভারতে জন্মালেও বর্তমানে তিনি সেশেলসের নাগরিক। ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ‘এয়ারসেল’, ‘শিভা কম্পিউটার্স’, এবং ‘ডিশনেট’-এর প্রতিষ্ঠাতা এই শিবশঙ্করন।
১৯৮৫ সালে রবার্ট অমৃতরাজের কাছ থেকে ‘স্টার্লিং কম্পিউটার্স’ কিনে তাঁর ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেন শিবশঙ্করন। তাঁর হাত ধরে স্টার্লিং ভারতের শীর্ষ তিনটি কম্পিউটার সংস্থার একটিতে পরিণত হয়।
১৯৯২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এমটিএনএল-এর সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি চুক্তি করেন শিবশঙ্করন। এমটিএনএল মুম্বই এবং দিল্লিতে টেলিযোগাযোগ পরিষেবা পরিচালনা করত। শিবশঙ্করন তাঁর কাজ-কারবার চেন্নাই থেকে নয়াদিল্লিতে স্থানান্তরিত করেন।
আরও পড়ুন:
১৯৯৮ সালে ‘ডিশনেট ডিএসএল’ চালু করেন শিবশঙ্করন, যা ছিল দেশের প্রথম ডিএসএল ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ২০০৪ সালে এটি ভিএসএনএল-এর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ২০০৮ সালে টাটা গোষ্ঠী অধিগ্রহণ করে।
২০০৪ সালে, শিবশঙ্করন দিল্লি এবং আরও তিনটি টেলিযোগাযোগ সার্কেলের জন্য সেলুলার টেলিফোনি লাইসেন্স পেতে সক্ষম হন। তিনি এই লাইসেন্সগুলি চেন্নাইয়ের এসার গোষ্ঠীর শশী রুইয়ার কাছে ১০.৫০ কোটি ডলারে বিক্রি করে দেন। ২০০৪ সালেই শিবশঙ্করন তাঁর সংস্থা ‘ফ্রেশ অ্যান্ড অনেস্ট’-এর মাধ্যমে ক্যাফে সংস্থা ‘বারিস্তা’-র ৬৫ শতাংশ মালিকানা কিনে নেন। ‘ফ্রেশ অ্যান্ড অনেস্ট’ ছিল স্টার্লিং গোষ্ঠীর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে স্টার্লিং গোষ্ঠী ‘টাটা কফি’-র মালিকানাধীন অংশও কিনে নেয়।
শিবশঙ্করন তিরুভান্নামালাই জেলার চেয়ার তালুকের কোভিলুর গ্রাম থেকে এয়ারসেল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৯ সালে তামিলনাড়ুতে সংস্থাটির কার্যক্রম শুরু হয়। ওড়িশা, অসম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় টেলিকম সার্কেলগুলিতে সংস্থাটির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। এ ছাড়া একসময় তামিলনাড়ুর টেলিকম বাজারে শীর্ষ স্থানে ছিল এয়ারসেল। রিলায়্যান্স কমিউনিকেশনসের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সব জায়গায় তাদের ভয়েস পরিষেবা এবং অন্যান্য ২জি ও ৩জি পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০০৫ সালে মালয়েশীয় টেলিকম কোম্পানি ম্যাক্সিস কমিউনিকেশনস এয়ারসেলের ৭৪ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। বাকি ২৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সুনীতা রেড্ডির ‘সিন্ডিয়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস’-এর মালিকানায়। তবে, এয়ারসেল-ম্যাক্সিস চুক্তিতে আর্থিক তছরুপের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, প্রভাব খাটিয়ে বেআইনি ভাবে এয়ারসেল সংস্থায় মালয়েশিয়ার ম্যাক্সিসকে লগ্নি করার ছাড়পত্র পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশ সার্কেলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় এয়ারসেল। কারণ ওই সার্কেলগুলিতে কিছুতেই লাভের মুখ দেখতে পারছিল না সংস্থাটি। বস্তুত, একসময় লাভের মুখ দেখা এয়ারসেল বাজারে মাশুল যুদ্ধ শুরুর পরে ক্রমশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তাদের মূল সংস্থা ম্যাক্সিসও অর্থ জোগানো থেকে পিছিয়ে আসে।
২০১৮ সালে এয়ারসেল তীব্র আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়ে। ঋণের ভারে জড়িয়ে পড়ে সংস্থাটি। সেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে এয়ারসেল নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করার জন্য মুম্বইয়ে জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইবুনালে (এনসিএলটি) আর্জি জানায়।
দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এয়ারসেলের প্রতিষ্ঠাতা শিবশঙ্করন তাঁর মনের গভীরে জমে থাকা আক্ষেপগুলির কথা তুলে ধরেছিলেন ইউটিউবার রণবীর ইলাহবাদিয়ার পডকাস্টে। সেখানে কথা বলার সময় এককালের উদ্যোগপতি তাঁর ৭,০০০ কোটি টাকা হারানোর অভিজ্ঞতা এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের গল্প শুনিয়েছেন। তিনি এমন দু’টি সাধারণ বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যে কারণে তাঁকে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল— এক, হিন্দি ভাষা না শেখা এবং দুই, কর্মজীবনের শুরুতেই দিল্লি বা মুম্বইয়ের মতো বড় শহরে স্থানান্তরিত না হওয়া।
শিবশঙ্করন বলেন, ‘‘আমি যদি হিন্দি শিখতাম, তাহলে ১৪০ কোটি ভারতীয়ের কাছে পৌঁছোতে পারতাম। তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘আর যদি তরুণ বয়সে দিল্লি বা মুম্বই চলে যেতাম, তবে নিশ্চিত ভাবেই ১ লাখ কোটি টাকা আয় করতে পারতাম।"
নিজের চেষ্টায় একদা প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পপতি ব্যাখ্যা করেছেন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ইলাহবাদিয়াকে তিনি বলেন, ‘‘আমি ঋণ নিতে চাই না, বরং আমার কাছেই অর্থ আসে।’’ তিনি আরও জানান, ‘‘৬৮ বছর বয়সেও আমি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কখনও ১০০ টাকাও ধার করিনি।’’ উদ্যোক্তা হিসেবে শিবশঙ্করন জানান, তাঁর সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক সুযোগগুলি হাতছাড়া হওয়ার কারণ দূরদর্শিতার অভাব ছিল না। বরং, সঠিক যোগাযোগের অভাবেই ঘটনাগুলি ঘটেছিল।
শিবশঙ্করন বলেন, ‘‘আমি দু’টি ভুল করেছি, হিন্দি না শেখা এবং দিল্লি বা মুম্বই না যাওয়া। ব্যাস, এটুকুই।’’ পডকাস্টের অন্য অংশে দেউলিয়া হওয়ার আগে তাঁর করা সবচেয়ে ব্যয়বহুল কেনাকাটাগুলির কথাও জানিয়েছেন এই উদ্যোক্তা। শিবশঙ্করন জানান, তিনি রিয়েল এস্টেট খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিলেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক বাড়ি কিনেছিলেন।
রণবীর ইলাহবাদিয়া তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘আপনার কেনা সবচেয়ে দামি জিনিস কী ছিল?’’ উত্তরে শিবশঙ্করন বলেছিলেন, ‘‘দ্বীপ।’’ তিনি জানান, সেশেলসে তাঁর দুটি দ্বীপ ছিল, যা তিনি এখন বিক্রি করে দিয়েছেন। শিবশঙ্করন আরও জানান, দ্বীপগুলি তিনি কিনেছিলেন নিজের তৈরি দেশে বসবাস করার স্বপ্ন নিয়ে। দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন ‘রিপাবলিক অফ শিবা’। তাঁর কথায়, ‘‘এর পর আমি সেশেলস, আমেরিকা, কানাডা ও লন্ডনে বাড়ি কিনলাম। প্রতিটি মহাদেশে আমার বসবাসের জন্য একটি করে জায়গা রাখার ইচ্ছা ছিল। তাই আমি সেগুলি কিনেছিলাম।’’
শিবশঙ্করন আরও বলেন, ‘‘আমি যখন বাড়িগুলি কিনেছিলাম, তখন একটি বিলাসবহুল বাড়িতে থাকতাম, যার মূল্য ছিল ৫২৪ কোটি টাকা এবং তাতে ৭১টি শোয়ার ঘর ছিল। পরে সেটি ভেঙে ফেলা হয়। তবে, আমি সেই বাড়ির অর্ধেক অংশ পুনরায় কিনে নিয়েছি। এখন আমার কাছে ২ একরের একটি জমি আছে। কিন্তু, আমি সেখানে এখনই বাড়ি তৈরি করতে চাই না। আগে আমি সব সমস্যার সমাধান করতে চাই।’’
শিবশঙ্করন আরও জানান, দেউলিয়া হওয়ার আগে ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রিমন্টে তাঁর ১৪ একর জমির উপর একটি বাড়ি ছিল। একটি হেলিপ্যাডও ছিল সেখানে। এ ছাড়া কানাডাতেও তাঁর একটি বিশাল অট্টালিকা ছিল।