দীর্ঘদিন প্রচারের আড়ালে, ‘বনবাস’ কাটিয়ে ফিরতে চলেছেন ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর সেই অমিত সানা
‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর প্রথম সিজ়নে রানার-আপ হওয়ার ২২ বছর পর ‘ইন্ডিয়ান আইডল লেজেন্ডস রিটার্ন’-এর মাধ্যমে ফিরছেন অমিত। দীর্ঘ সময় প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকার পর, তিনি আবার সেই শোয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন যা তাঁকে একসময় খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ দিন প্রচারের আড়ালে। কোথায় কী করছিলেন, প্রায় কেউই জানতেন না। ‘বনবাস’ কাটিয়ে কাজে ফিরছেন গানের রিয়্যালিটি শো ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর প্রথম সিজ়নের প্রতিযোগী অমিত সানা। ‘ইন্ডিয়ান আইডল লেজেন্ডস রিটার্ন’-এর মাধ্যমে ফিরছেন তিনি।
অমিতের দাবি, অত্যধিক খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর না। গানের রিয়্যালিটি শোয়ের মাধ্যমেই আবার ফিরছেন তিনি।
‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর প্রথম সিজ়নে রানার-আপ হওয়ার ২২ বছর পর ‘ইন্ডিয়ান আইডল লেজেন্ডস রিটার্ন’-এর মাধ্যমে ফিরছেন অমিত। দীর্ঘ সময় প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকার পর, তিনি আবার সেই শোয়ের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছেন যা তাঁকে একসময় খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল।
নতুন রিয়্যালিটি শোয়ে অমিত জুটি বেঁধেছেন আর এক প্রাক্তন প্রতিযোগী প্রাজক্তা শুক্রের সঙ্গে। এই আয়োজনে প্রাক্তন প্রতিযোগীরা দ্বৈত বা ‘ডুয়েট’ পারফরম্যান্সের জন্য ফিরে আসছেন। তবে অমিত কখনও ভাবেননি যে, আবার ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর মঞ্চে ফিরবেন। ফলে এই শো তাঁকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে মঞ্চটিকে দেখার এবং অনুভব করার সুযোগ করে দিয়েছে।
অমিতের কথায়, ‘‘মনে হচ্ছে জীবন যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ করে আবার সূচনাবিন্দুতে ফিরে এসেছে। আমি কখনওই ইন্ডিয়ান আইডলে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবিনি। চ্যানেল এবং প্রোডাকশন হাউসের কাছ থেকে পাওয়া এক অপ্রত্যাশিত আহ্বানের সুবাদেই ২২ বছর পর আমি আবার শোতে ফিরলাম। এই ফরম্যাটে জনপ্রিয় প্রাক্তন আইডলেরা জুটিতে গান গাইবেন। এখানে মূল বিষয় হল, একটি জুটি কী ভাবে একসঙ্গে গান গায় এবং সঙ্গীত পরিবেশনা করে। তাঁদের পারস্পরিক বোঝাপড়া বা ‘কেমিস্ট্রি’ এবং কাজের মেলবন্ধন কতটা তা যাচাই করা হবে। আমার জুটি হিসেবে রয়েছেন প্রাজক্তা শুক্রে। বহু বছর ধরে আমার অনুরাগীরা আমাকে টিভিতে দেখতে চাইছিলেন, তাই অবশেষে সেই সুযোগ এল। টিভিতে ফিরে আসার অন্যতম কারণও এটিই।’’
আরও পড়ুন:
অমিত আরও বলেন, ‘‘২০০৫ সালের পর থেকে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, সেই সম্পর্কেও আমি ধারণা পেতে চেয়েছিলাম। আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কী ভাবে গান গায় এবং তাদের মানসিক অবস্থা বা চিন্তাভাবনা কেমন, সে সব বিষয়ও আমি জানতে চেয়েছিলাম। তাদের কাছ থেকে শেখার সুযোগটা আমার খুব ভাল লেগেছিল। তাই ভাবলাম, নিজেকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানানোর এই সুযোগটা কেন নেব না? এমন কিছু করার জন্য অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়। ‘ইন্ডিয়ান আইডল ১’-এ মানুষ আমাকে যেমন দেখেছিলেন, আমি নিশ্চিত ভাবেই এখন আর সেই মানুষটি নেই। তবে আমার ভেতরে সেই একই সত্তা বা ডিএনএ রয়েছে। তাই মানুষ আমার সঙ্গে একাত্ম অনুভব করতে পারবে এবং আমার মধ্যে অনেক নতুন বিষয়ও দেখতে পাবে।’’
ছত্তীসগঢ়ের (তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ) ভিলাইয়ের বাসিন্দা অমিত মাত্র তিন বছর বয়স থেকে গান গাওয়া শুরু করেন। আট বছর বয়সে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টের একটি অনুষ্ঠানে গান করেন অমিত। তখন ছেলের প্রতিভা সম্পর্কে সচেতন হন তাঁর বাবা।
এর পর ৮ বছর বয়স থেকেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন অমিত। আঞ্চলিক এবং রাজ্য স্তরের নানা সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় যোগ দিতেন। ‘কাটনি অল ইন্ডিয়া কিরণ সঙ্গীত সমারোহ’ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হন তিনি।
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে পড়ার জন্য জামশেদপুর চলে যান তিনি। সেখানেই একটি গানের রিয়্যালিটি শো-এর জন্য অডিশন দেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। এর পরে ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর প্রথম সিজ়নে সুযোগ পান তিনি। মজার বিষয় হল, ভিলাইয়ের বাসিন্দা অমিত অডিশন দেন কলকাতা শহর থেকে।
আরও পড়ুন:
‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর পরে তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘চল্ দিয়ে’ প্রকাশিত হয়, যার সুরকার ছিলেন বিশাল-শেখর। এর পরে ‘ইয়াদেঁ’ নামে আরও একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয় তাঁর। ২০০৮ সালে গানের একটি রিয়্যালিটি শো ‘জো জিতা ওহি সুপারস্টার’-এ যোগ দেন অমিত। কিন্তু কয়েকটি পর্বের পরেই বাদ পড়েন। ‘কলযুগ’, ‘জান-এ-মন’, ‘ডেল্হি হাইট্স’ প্রভৃতি ছবিতে নেপথ্যশিল্পী ছিলেন অমিত।
এর পর কেরিয়ার এবং জীবন থেকে তিনি আসলে কী চান তা বোঝার জন্য কিছুটা সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অমিত। অমিতের কথায়, ‘‘বাইরে থেকে হয়তো মনে হতে পারে যে আমি দীর্ঘ বিরতি নিয়েছি এবং সঙ্গীতের জগতে খুব একটা কাজ করিনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি স্থবির হয়ে পড়েছিলাম। বিষয়টি অনেকটা মাটির নীচে গাছের শিকড় বিস্তারের মতো। বাইরে থেকে হয়তো তেমন কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে কাজ চলতে থাকে।’’
অমিত জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে পরিকল্পনা করার স্বভাব তাঁর কখনওই ছিল না। তবে লক্ষ্য তাঁর ছিল এবং এখনও রয়েছে। কিন্তু মনের ভিতরে অনেক প্রশ্নও কাজ করত তাঁর। অমিতের দাবি, অনেক সময় তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। আবার কখনও বা চরম উচ্ছ্বাসে ভাসতেন।
অমিত বলেছেন, ‘‘আমি মুম্বই এসেছিলাম এক অতি সাধারণ ছোট শহর থেকে। এখানকার কর্মব্যস্ততা আর সব কিছু দ্রুত ঘটে যাওয়ার প্রবণতা, সব মিলিয়ে ইন্দ্রিয়গুলি যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত। ফলে স্বচ্ছ ভাবে চিন্তা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াত।”
অমিত আরও বলেন, “শুরুর সময়টা কেটেছে বিভিন্ন শো এবং শহরের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিচিত্র সব অনুভূতির সংস্পর্শে আসা আমাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রায়ই ভাবতাম, অন্যরা যে ভাবে কাজ করতে পারে, আমি কেন পারছি না। এই পুরো সময়টা জুড়ে আমার এক অভ্যন্তরীণ যাত্রাও চলেছে। এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন এক পথচলা এবং আমি এখনও শিখছি। সারা জীবনই হয়তো এমনটা চলবে, কারণ আমি ভীষণ কৌতূহলী এবং সব সময়ই বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরি। এই সময়ের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাটি ছিল ‘আর্ট অফ লিভিং’-এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।’’
অমিতের বিশ্বাস, এই অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাজীবন এবং চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছে। অমিতের কথায়, ‘‘অবশেষে ২২ বছর পর মনে হচ্ছে, আমার জীবনের গতিপথ আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, এই বছরের শুরু থেকে পরিস্থিতি যে ভাবে এগোচ্ছে, তাতে এমনটাই মনে হচ্ছে। আমার মনে হয়, শেখার প্রক্রিয়াটা তো চলছিলই। আমি সেই জ্ঞান বা উপলব্ধি গ্রহণ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম, আর এখন তা আসতে শুরু করেছে। সবকিছু সঠিক ভাবে অনুধাবন করে সঙ্গীতজীবন চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনসমক্ষে ফিরে আসতে আমি এখন অনেক বেশি প্রস্তুত। এ নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপ নেই।’’
পুরো বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব আনন্দিত বলেও জানিয়েছেন অমিত। তাঁর মন্তব্য, কেবল নিজের ‘নিরাপদ বলয়’ বা গণ্ডির মধ্যে আটকে থেকে নিজের জগৎকে রক্ষা করার চেষ্টা না করে, বরং নিজের অন্তরাত্মাকে বোঝা এবং নিজের ভেতরে কী ঘটছে, তা স্বীকার করে নেওয়াটা একজন মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অমিত বলেন, ‘‘আমি সবসময় জীবনে এই গণ্ডি ভাঙার বা চ্যালেঞ্জ জানানোর পক্ষে। আর এখন আমার কাছে এমন সব উপায় বা রসদ রয়েছে, যা আমাকে কেবল একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই নয়, বরং আধ্যাত্মিক এবং মানবিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করবে।”
খ্যাতির সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের তীব্র অভিজ্ঞতাটিই আলোর বৃত্তের (স্পটলাইট) সঙ্গে অমিতের সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “অবশ্যই আমি সেই সময়টা মিস্ করি। তবে একই সঙ্গে আমি আলোকবৃত্ত থেকে বেরিয়ে যাওয়া উপভোগও করছিলাম। কারণ এর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিকও আছে। মুদ্রার উল্টো পিঠটিও তো দেখতে ও অনুভব করতে হয়।’’
অমিত জানিয়েছেন, তাঁর এখন মনে হয় যে, তিনি আবার আলোকবৃত্তে ফেরার জন্য প্রস্তুত। প্রস্তুত নিজেকে আরও বেশি সক্রিয় করে তুলতে এবং বিষয়টি উপভোগ করতেও। তাঁর দাবি, এখনও আগামী ২০-৩০ বছর গেয়ে যেতে পারবেন তিনি। সঙ্গীতে তিনি কোন পথে এগোতে চাইছেন এবং ভক্তদের কী উপহার দিতে চান, সে বিষয়েও তাঁর ভাবনা একদম পরিষ্কার বলে জানিয়েছেন।
২০১১ সালে মনীষা বনসল নামে এক তরুণীকে বিয়ে করেন অমিত। তবে সে বিয়ে সুখের হয়নি। ২০১৮ সালে বিবাহবিচ্ছেদ হয় তাঁদের। ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর একটি পর্বে সোনু নিগম তাঁকে বলেছিলেন, তিনি ‘লম্বা রেসের ঘোড়া’।
অনু মালিক বলেছিলেন, আহত মানুষকে শুশ্রূষা দিতে পারে তাঁর কণ্ঠ। স্টেজ পারফর্ম করেন অমিত, তবে পেশাগত জীবনে খুব বেশি সফল হতে পারেননি তিনি। বর্তমানে সমাজমাধ্যমে তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা হাজার হাজার। মাঝখানে দীর্ঘ সময় ‘বনবাস’ কাটিয়ে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি।