বাজারমূল্য কমেছে ৮০ শতাংশ, আগ্রহ হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরাও! দুর্দান্ত শুরুর পরেও কেন ধুঁকছে ‘সুগার কসমেটিক্স’
বিনিয়োগকারীদের কাছেও ‘সুগার কসমেটিক্স’-এর ধারণাটি ছিল স্বচ্ছ। ২০২২ সালে সংস্থাটি প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকার সর্বোচ্চ মূল্যায়নে তহবিল সংগ্রহ করে, যা এটিকে ভারতের অন্যতম প্রধান দেশীয় রূপটান স্টার্টআপে পরিণত করেছিল।
কয়েক বছর আগে ভারতের ডি২সি (সরাসরি গ্রাহকের কাছে পণ্য বিক্রির) বিপ্লবের এক আদর্শ উদাহরণ হিসেবে দেখা হত রূপটান পণ্য প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘সুগার কসমেটিকস’কে। ভারতীয়দের গায়ের রঙের সঙ্গে মানানসই পণ্য এবং সোশ্যাল মিডিয়া, নেটপ্রভাবী ও ডিজিটাল-কেন্দ্রিক বিপণন কৌশলের উপর ভিত্তি করে তরুণ ভারতীয় গ্রাহকদের, বিশেষ করে নব্য প্রজন্মকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা হয়েছিল ব্র্যান্ডটি।
বিনিয়োগকারীদের কাছেও ‘সুগার কসমেটিক্স’-এর ধারণাটি ছিল স্বচ্ছ। ২০২২ সালে সংস্থাটি প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকার সর্বোচ্চ মূল্যায়নে তহবিল সংগ্রহ করে, যা এটিকে ভারতের অন্যতম প্রধান দেশীয় রূপটান স্টার্টআপে পরিণত করেছিল।
সেই প্রসাধনী সংস্থাই এ বার আর্থিক সঙ্কটের মুখে। সম্প্রতি, ‘সুগার’ তাদের সর্বশেষ তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং ‘এ৯১ পার্টনার্স’-এর কাছ থেকে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
তবে আলোচনার মূল বিষয় ছিল তাদের বর্তমান বাজারমূল্য। জানা গিয়েছে, সংস্থাটির বর্তমান বাজারমূল্য মাত্র ৫৫০–৬০০ কোটি টাকা, যা তাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়নের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম।
আর এই অবনমন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতপক্ষে, ২০২৫ অর্থবর্ষে ‘সুগার’-এর পরিচালন আয় ২০ শতাংশ কমে ৪০৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে এবং একই সময়ে তাদের মূল লোকসান প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন:
এর প্রধান কারণ হল সৌন্দর্য বা রূপটান পণ্যের বাজারের চাহিদার বদল এবং ভারতের প্রসাধনী সামগ্রীর বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা। নাইকা, ল্যাকমে, ল’রিয়েল, মেবলিন, মামাআর্থ, কে বিউটি-র মতো প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম-কেন্দ্রিক অসংখ্য নতুন ব্র্যান্ড একই গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার লড়াইয়ে নেমেছে।
মনে করা হচ্ছে সেই লড়াইয়ে বাকিদের সঙ্গে পেরে উঠছে না ‘সুগার কসমেটিক্স’। ফলে একসময় ভারতের শীর্ষস্থানীয় কনজ়িউমার স্টার্টআপগুলির একটি বলে মনে করা হত যে সংস্থাকে, সেটি তার বাজারমূল্যের একটি বড় অংশ হারিয়েছে।
আসলে সমস্যা হল, একটি জনপ্রিয় প্রসাধনী ব্র্যান্ড গড়ে তোলা যতটা সহজ, সেই ব্যবসা দাঁড় করানো তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। শুরুর দিকের নব্য তরুণ প্রজন্মকে নিশানা করার যে কৌশলটি ‘সুগার’ নিয়েছিল, তা বেশ কার্যকর ছিল।
ব্র্যান্ড সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে মূলত নেটপ্রভাবীদের উপর নির্ভর করত সংস্থাটি। রূপটান শিল্পে একাধিপত্য গড়তে একের পর এক নতুন পণ্য বাজারে আনত। কিন্তু সমস্যা হল, অন্য সংস্থাগুলিও প্রায় একই কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে।
আরও পড়ুন:
প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন গ্রাহক পাওয়ার খরচ (কাস্টমার-অ্যাকিউজ়িশন কস্ট) বেড়ে যায়। ব্র্যান্ডগুলিকে কেবল নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য বিজ্ঞাপন, ছাড় এবং নেটপ্রভাবীদের পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ, রূপটান পণ্য এমন নয় যে গ্রাহকেরা খুব ঘন ঘন সেগুলি কেনেন। এক বার কিনলে তা বেশ কয়েক মাস, অনেক সময় এক বছর চলে যায়।
হিসাব অনুযায়ী, একটি ডি২সি কোম্পানির ক্ষেত্রে এক জন নতুন গ্রাহক পেতে গড়ে প্রায় ১,৮৫০ টাকা খরচ হয়। সেখানে প্রতিটি অর্ডারের গড় মূল্য মাত্র ৮৯০ টাকার মতো। সহজ কথায়, কোনও ব্র্যান্ড এক জন গ্রাহককে কোনও পণ্য কেনায় আগ্রহী করতে সেই গ্রাহকের প্রথম অর্ডারের মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ ব্যয় করে।
তাই পুরো ব্যবসায়িক মডেলটিই নির্ভর করে ওই গ্রাহককে বার বার ফিরিয়ে আনার উপর। কারণ, কেবল প্রথম লেনদেন থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে গ্রাহককে খুঁজে পেতে বা আকৃষ্ট করতে কোম্পানি যে খরচ করেছে, তা হয়তো উঠে আসে না।
এক জন গ্রাহক হয়তো ৯০০ টাকার কোনও লিপস্টিক খুব পছন্দ করলেন, কিন্তু তিনি সেটি প্রতি মাসে, এমনকি প্রতি দুই বা তিন মাস অন্তরও কিনবেন না। ফলে, গ্রাহক সংগ্রহের পিছনে করা বড় অঙ্কের খরচ দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে প্রসাধনী সংস্থাগুলির জন্য।
তা পরবর্তী সমস্যার দিকে নিয়ে যায়। প্রসাধনী পণ্যের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য আশ্চর্যজনক ভাবে ভঙ্গুর হতে পারে। গ্রাহকেরা তুলনামূলক ভাবে সহজেই এক ব্র্যান্ড থেকে অন্য ব্র্যান্ডে চলে যেতে পারেন, বিশেষ করে যখন প্রতিযোগীরা ক্রমাগত নতুন পণ্য বাজারে আনে, ছাড় দেয় এবং তাদের প্রিয় নেটপ্রভাবীদের সঙ্গে কাজ করে।
ডি২সি ব্র্যান্ডগুলিরও শুরুতে একটি সুবিধা ছিল, কারণ তারা প্রচলিত খুচরো ব্যবসাকে এড়িয়ে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারত। কিন্তু এই সংস্থাগুলি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দোকানেরও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
কিন্তু এক বার কোনও ব্র্যান্ড দোকান এবং কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করলে, তাকে এমন সব সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, যারা এই নেটওয়ার্কগুলি তৈরি করতে কয়েক দশক সময় ব্যয় করেছে। ফলে একটি ওয়েবসাইটভিত্তিক পণ্য বিক্রয়কারী সংস্থার জায়গা অনেক সীমিত থাকে। ‘সুগার’-এর ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকদের ধরে রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে ‘সুগার’। অনুগত গ্রাহক তৈরি করতে পারেনি তারা। অর্থাৎ, গ্রাহকদের বার বার ফিরে আসার জন্য বিশেষ কোনও পদক্ষেপ করতে পারেনি। যে সমাজমাধ্যম ‘সুগার’কে তার ব্র্যান্ড তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, সাহায্য করতে পারেনি তা-ও।
পাশাপাশি, ‘সুগার’ একই পণ্য আরও বেশি পরিমাণে বিক্রি করার চেষ্টা করছিল না। রূপটান সামগ্রীর বাজারে ভাল ভাবে ব্যবসা জমানোর আগেই স্কিনকেয়ার, সুগন্ধি ব্যবসাতেও পা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে প্রসাধনী সংস্থাটি। কিন্তু তা লাভের থেকে ক্ষতি বেশি করেছে।
খবর, ‘সুগার’-এর আয় এক-পঞ্চমাংশ কমে যাওয়ায় এবং লোকসান প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় সংস্থাটির উপর থেকে ভরসা উঠছে বিনিয়োগকারীদেরও। যখন একটি ব্যবসা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বিনিয়োগকারীরা লোকসান সহ্য করতে পারেন, কারণ তাঁরা বাজি ধরেন যে আজকের ব্যয় ভবিষ্যতে আরও বড় এবং লাভজনক একটি ব্যবসা তৈরি করবে। কিন্তু যখন আয় কমতে শুরু করে এবং লোকসান বাড়তে থাকে, তখন সেই চুক্তি রক্ষা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ‘সুগার’-এর বাজারমূল্য ৮০ শতাংশ কমে যাওয়াটা বেশ কৌতূহলেরও। প্রসাধনী সংস্থার বাজারমূল্য কমে যাওয়ার মানে এ-ও নয় যে ভারতে সৌন্দর্য-পণ্য বা বিউটি পণ্যের বাজারের সম্ভাবনা হারিয়ে যাচ্ছে। বরং এর উল্টোটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ভারতের প্রসাধনী সামগ্রীর বাজার ক্রমাগত বড় হচ্ছে। কারণ লক্ষ লক্ষ ক্রেতা এখন সুসংগঠিত খুচরো বিক্রয় ব্যবস্থার আওতায় আসছেন এবং শৌখিন বা ঐচ্ছিক পণ্যসামগ্রীর পিছনে বেশি অর্থ ব্যয় করছেন।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, ‘সুগার’-এর বাজারমূল্য কমে যাওয়ার ঘটনাটি ভারতের কনজ়িউমার-স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একটি চমৎকার ব্র্যান্ড মানেই যে সেটি একটি চমৎকার ব্যবসা হবে, তা কিন্তু নয়। আবার প্রতি ১ টাকার পণ্য বিক্রয় করতে যদি আরও ২ টাকা সেই পণ্যের প্রচারে খরচ হয়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে সেই সংস্থা টিকে না-ও থাকতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতের প্রসাধনী সামগ্রীর বাজারের পরবর্তী ধাপে হয়তো তারাই এগিয়ে থাকবে, যারা দ্রুত ক্রেতা সংগ্রহের থেকে তাঁদের ধরে রাখতে সক্ষম হবে।