বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, ৫৮ বছর আগের অসম্পূর্ণ কাজ মেটাতে লড়ছেন দর্জি থেকে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া অভিনেতা
অভাবের সংসারে চতুর্থ শ্রেণির পর ছাড়তে হয়েছিল স্কুল। দর্জির কাজ করতে করতেই সিনেমায় সুযোগ। পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। কয়েক দশক পর বহু বছর আগের অসম্পূর্ণ কাজটি শেষ করতে তিনি ফিরে গিয়েছেন স্কুলে।
২০২৬-এর শুরু থেকে কোনও বড় বাজেটের ছবি ব্যাপক সাফল্য না পাওয়ায় ধুঁকছিল তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। তাতে প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে পরিচালক আরজে বালাজির ‘কারুপ্পু’। এই ছবির বাণিজ্যিক সাফল্যের পরেই রাজ্য জুড়ে প্রেক্ষাগৃহগুলিতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল। ছবিটি যে সব কারণে প্রশংসা কুড়িয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন অভিনেতা ইন্দ্রান্স। তাঁর অভিনয় দর্শক থেকে সমালোচক সকলেরই প্রশংসা পেয়েছে।
‘কারুপ্পু’ ছবিতে কেরলমের এক ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্দ্রান্স। এই ছবির মাধ্যমেই তামিল ছবিতে পা রাখলেন তিনি। সিনোমায় তাঁর চরিত্রটি মেয়ের চিকিৎসার জন্য চেন্নাই আসে। গয়না চুরি হয়ে যাওয়ার পর আদালত তা ফেরত দিতে দেরি করায় তিনি ন্যায়বিচার পেতে লড়াই শুরু করেন। একজন অসহায় বাবার চরিত্রে তাঁর আবেগঘন অভিনয় যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। ছবিতে তিনি যে বাস্তবতা এবং সারল্য ফুটিয়ে তুলেছেন, অনেক দর্শকই তার প্রশংসা করেছেন।
‘কারুপ্পু’তে ইন্দ্রান্স অত্যন্ত আবেগঘন এবং গভীর এক অভিনয় উপহার দিয়েছেন সিনেপ্রেমীদের। সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি এবং সংযত সংলাপের মাধ্যমে তিনি চরিত্রটিতে এক ধরনের বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। অতি-নাটকীয় অভিনয়ের পরিবর্তে তিনি নীরবতা এবং অভিব্যক্তির উপর জোর দিয়েছেন। এর ফলে প্রতিটি দৃশ্যই স্বাভাবিক এবং প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তাঁর উপস্থিতি গল্পে আবেগের গভীরতা এনে দিয়েছে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এই ছবিতে তিনি ছা়ড়াও অন্যতম মুখ্য চরিত্রে রয়েছেন সুরিয়া এবং তৃষা কৃষ্ণণ।
এই চরিত্রে ইন্দ্রান্স যে ভাবে অসহায়ত্ব এবং দৃঢ়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন, তা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনও রকম অতিরঞ্জিত অভিনয় ছাড়াই তাঁর চোখমুখের অভিব্যক্তি বেদনা, ভয় এবং সহমর্মিতার মতো অনুভূতিগুলি স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়ে তোলে। চরিত্র-প্রধান ভূমিকায় কেন তাঁকে মালয়ালম চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসাবে গণ্য করা হয়, তা তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন। এমনকি অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তগুলিতেও তাঁর অভিনয় ছিল অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য এবং হৃদয়স্পর্শী।
সমসাময়িক মালয়ালম সিনেমার অন্যতম সেরা চরিত্রাভিনেতা ইন্দ্রান্স ধীরে ধীরে নিজের পরিধি প্রসারিত করেছেন এবং অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত খ্যাতি এবং স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। কিন্তু, সাফল্যের যাত্রাপথ খুব একটা সহজ হয়নি অভিনেতার জীবনে। ৮০-এর দশকের শুরু থেকে টিন্সেলটাউনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি প্রায়ই কৌতুকচরিত্রে ‘টাইপকাস্ট’ হয়ে থাকতেন। যেখানে তাঁর শারীরিক গঠন এবং চেহারাকে ঠাট্টার পাত্র হিসাবে ব্যবহার করা হত। কিন্তু পেশাজগতের বাইরে এক কীর্তির জন্যও জনপ্রিয় তিনি। একদিকে, তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম সিনেমার সাফল্য। অন্য দিকে, ছোটবেলার এক অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার অদম্য ইচ্ছা। কী করেছিলেন ইন্দ্রান্স?
আরও পড়ুন:
ভাল নাম— কে সুরেন্দ্রন। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে ইন্দ্রান্স নামেই বেশি পরিচিত। জন্ম কেরলমের তিরুঅনন্তপুরমে। ছয় দশকেরও বেশি সময় পার করে ফিরে গিয়েছিলেন স্কুলে। আবার শুরু করেন পড়াশোনা। দারিদ্রের কারণে মাত্র ১০ বছরেই যে ছেলেটিকে ছাড়তে হয়েছিল স্কুল, ৬৮ বছর বয়সে তিনি আবার ফিরে যান সেই ক্লাসরুমে। যে বয়সে অনেকেই অবসর জীবনে থিতু হয়ে যান, সেই বয়সে প্রখ্যাত মালয়ালম অভিনেতা একটি স্কুল ব্যাগ আর শৈশবে ফেলে আসতে বাধ্য হওয়া এক স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করলেন শ্রেণিকক্ষে।
মুহূর্তটি ছিল সিনেমার সেট বা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান থেকে অনেক দূরে। কিন্তু এটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ করতালি, প্রশংসা এবং জাতীয় স্বীকৃতির অনেক অনেক আগে ছিল তিরুঅনন্তপুরমের একটি ছোট্ট ছেলে যে স্কুলে যেতে শুধু ভালইবাসত না, ছিল ক্লাসের সেরাও।
জানা যায়, ছেলেবেলায় মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ক্লাসে সামনের সারিতে বসত ছোট্ট সুরেন্দ্রন। শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। তার বিশ্বাস ছিল, শিক্ষাই একদিন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। কিন্তু, সাত ভাইবোনের সংসারে চরম দারিদ্রের কারণে চতুর্থ শ্রেণিতেই ছাড়তে হয় স্কুল। শুধুই শংসাপত্রের জন্য নয়, স্কুল ছাড়ার পরেও আজীবন পড়াশোনা করে শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন নীরবে লালন করেছেন ইন্দ্রান্স।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, অভাবের কারণে স্কুলের পোশাক, এমনকি বই কেনারও সামর্থ্য ছিল না অভিনেতার অভিভাবকদের। স্কুল ছাড়ার পর পরিবারের হাল ধরতে কাকার কাছে দর্জির কাজ শিখতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের একটি ছোট কাপড় সেলাইয়ের দোকান খোলেন। নাম দেন, ‘ইন্দ্রান্স ব্রাদার্স টেলার্স’।
আরও পড়ুন:
দর্জির কাজই অবশেষে তাঁকে মালয়ালম সিনেমার সেটে নিয়ে আসে। প্রথম জীবনে সেখানে তিনি পোশাক পরিকল্পক হিসাবে কাজ করতেন। পর্দার আড়ালে থেকেই কাজের প্রতি নিষ্ঠা, তাঁর রসবোধ এবং ক্ষুরধার বুদ্ধির জন্য অল্প সময়েই খ্যাতি অর্জন করেন। তখনও জানতেন না তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শীঘ্রই তাঁর জন্য অভিনয়ের জগতে অপ্রত্যাশিত দরজা খুলে দেবে।
তবে, সুযোগ এলেও খ্যাতি আসে অনেক দেরিতে। অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে ছোট ছোট ভূমিকায় সুযোগ পেতেন এবং প্রায়শই উপেক্ষিত হতে হত সুরেন্দ্রনকে। বছরের পর বছর ধরে ইন্দ্রান্স পার্শ্বচরিত্র এবং কৌতুকাভিনয় করেছেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি, একটি একটি করে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের কেরিয়ার গড়ে তুলেছেন।
তার পর এল ‘সিআইডি উন্নিকৃষ্ণণ’। যে সিনেমা তাঁকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। কেরলম জুড়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন ইন্দ্রান্স। এর পর একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে মালয়ালম সিনেমার অন্যতম পরিচিত চরিত্রাভিনেতা হয়ে ওঠেন।
বহু বছর ধরে দর্শক ইন্দ্রান্সকে মূলত কৌতুকাভিনেতা হিসাবেই চিনতেন। তাঁর অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখভঙ্গি এবং সাবলীল রসবোধ তাঁকে পর্দায় এক পরিচিত মুখ করে তুলেছিল।
নিজের অভিনয় জীবন সম্পর্কে একবার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রধান চরিত্রে থাকলে তাঁর বিপরীতে কাজ করতে রাজি হতেন না অনেক অভিনেত্রীই। এক বার একটি সিনেমার জন্য তাঁকে ভাল স্মার্টফোন কিনে দিতে চেয়েছিলেন মাম্মুট্টী। তার আগে তাঁর কোনও দামি ফোনও ছিল না, ব্যবহার করতেন সাধারণ মুঠোফোন।
২০১৭ সালের ‘আলোরুক্কাম’ সিনেমার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসাবে কেরলম রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। মালয়ালম চলচ্চিত্র ‘হোম’-এ অভিনয়ের জন্য ইন্দ্রান্স ৬৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।
২০২৪ সালে, ৬৮ বছর বয়সে, ইন্দ্রান্স স্কুলে ফিরে আসেন। নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, “নিরক্ষর হওয়ার অর্থ অন্ধ হয়ে থাকা। আমি বিশ্বকে দেখতে চেয়েছিলাম।”