‘জীবনে সিগারেটও খাইনি’, মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়ে চিৎকার ‘মমির দেশ’-এর তরুণী টিভি উপস্থাপিকার!
২০২৫ সালের এপ্রিলে মিশরের রাজধানী কায়রোয় একটি মাদক মামলার তদন্ত চলাকালীন সারার নাম উঠে আসে। সেই মামলায় সারাকে গ্রেফতার করা হয়। তার পরই গোটা দেশে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। সংঘবদ্ধ মাদক অপরাধচক্রের সদস্য হিসেবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তরুণী।
মিশরে মৃত্যুদণ্ড। দণ্ডিত ৩৯ বছর বয়সি এক টেলিভিশন উপস্থাপিকা-সহ আরও ১১ জন। বিপুল পরিমাণ মাদক উৎপাদন ও পাচারের মতো অভিযোগে তাঁদের সাজা দিয়েছে মিশরের এক আদালত। শনিবার মিশরের সরকারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী এই অভিযুক্তেরা বড়সড় এক মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ঘটনায় জড়িত সবচেয়ে আলোচিত নামটি হল মিশরের জনপ্রিয় এক অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা সারা খলিফা।
সারা যে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সেটিরও বিষয় হল অপরাধ ও নিরাপত্তা। অনুষ্ঠানটিতে নিরাপত্তা ও অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হত। ‘মিশন ইম্পসিবল’ নামের সেই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার জন্য মিশর জুড়ে পরিচিত মুখ সারা। মিশরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আল-আহরাম জানিয়েছে, মাদক দ্রব্য তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করতেন সারা ও তাঁর সঙ্গীরা। সেই মাদক দ্রব্য পাচারের উদ্দেশ্যে সংগঠিত অপরাধীচক্র গঠনেও মদত ছিল তাঁর।
এ ছাড়াও বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে সারা এবং ১১ জন আসামিকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। অভিযোগ, কৃত্রিম মাদক তৈরির জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করত এই চক্রটি। সারা খলিফা-সহ বাকি অভিযুক্তেরা একটি সংঘবদ্ধ মাদক-অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
চক্রটির সদস্যেরা নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়েছিলেন। কেউ বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ আনতেন। কেউ সেই উপকরণ দিয়ে মাদক তৈরি করতেন। আবার অন্য সদস্যেরা তৈরি করা মাদক বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার বা বিক্রি করার দায়িত্বে ছিলেন। সারাও তাঁর ব্যতিক্রম ছিলেন না।
২০২৫ সালের এপ্রিলে রাজধানী কায়রোয় একটি তদন্ত চলাকালীন সারার নাম উঠে আসে। মাদক মামলায় সারাকে গ্রেফতার করা হয়। তাতেই গোটা দেশে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো ওই সময় একটি বড় মামলার সূত্র ধরে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বলে জানা যায়। সারার মতো খ্যাতনামী উপস্থাপিকার গ্রেফতারির পর তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত আরও গভীর হয়।
আরও পড়ুন:
এর পর তদন্তে নতুন তথ্য ও প্রমাণ উঠে আসতে শুরু করলে মামলাটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। সেই বছরের (২০২৫ সালে) শেষের দিকে সারার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অর্থাৎ, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো তাঁকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
আদালতে মামলা উঠলে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন টেলিভিশন উপস্থাপিকা। আদালতে শুনানির সময় সারা বিচারককে জানান, মিশরের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রক দফতরে ছবি তোলার আগে পর্যন্ত তিনি নাকি জীবনে কখনও মাদক দেখেননি।
মাদক দ্রব্য তো দূরের কথা, তদন্তকারী আধিকারিকদের কাছে সারা এ-ও দাবি করেন যে তিনি কোনও দিন সিগারেটও ছুঁয়ে দেখেননি। মাদক তৈরি এবং পাচার সংক্রান্ত মামলায় ধরা পড়ে এজলাসে কান্নায় ভেঙে পড়েন সারা।
আদালতে কথা বলার সময় ভেঙে পড়েন এবং বিচারকের কাছে ক্ষমাও চান সারা। তিনি বলেন, তাঁর বাবা-মা তাঁকে যথেষ্ট আদর-যত্নে মানুষ করেছেন। তাঁর কোনও অভাব নেই। তাই মাদক পাচার থেকে উপার্জন করা টাকার তাঁর কোনও প্রয়োজন নেই। তাঁর কথা শোনার জন্য বিচারকের কাছে বহু আবেদন-নিবেদনও করেন সারা।
আরও পড়ুন:
টেলিভিশনে উপস্থাপনা করার পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত সারা। একটি কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিক এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও (ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট) চালান মিশরীয় তরুণী।
তদন্ত চলাকালীন মাদক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ৭৫০ কেজিরও বেশি মাদক দ্রব্য উদ্ধার করেন। কৃত্রিম মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত নানা সরঞ্জামও বাজেয়াপ্ত করা হয় বলে মিশরের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে। মাদক পরীক্ষাগার হিসেবে দু’টি অ্যাপার্টমেন্টকে ব্যবহার করা হত বলে অভিযোগ করেন তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে বেশ কিছু বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা।
মামলাটির তদন্তে সাক্ষীদের বক্তব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তিগত এবং ডিজিটাল প্রমাণও ব্যবহার করা হয়েছে আদালতে। এর মধ্যে ছিল মোবাইলের বার্তা, ছবি ও ভিডিয়ো। এ সব ডিজিটাল সাক্ষ্য থেকে ওই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করেছেন সরকারপক্ষের আইনজীবীরা।
সরকারপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, এই চক্রের বিভিন্ন সদস্য ভিন্দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি, মাদক উৎপাদন এবং তা সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। মিশর পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, সন্ত্রাসবাদ, নির্দিষ্ট কিছু ধর্ষণ অপরাধ এবং মাদক পাচার-সহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে এখনও। সেই আইনেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেছে ‘পিরামিডের দেশ’।
রায়টি প্রথমে গত মাসে প্রাথমিক ভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর পর মিশরের আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের মামলায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হিসেবে বিষয়টি গ্র্যান্ড মুফতির কাছে পাঠানো হয় ধর্মীয় মতামতের জন্য। মিশরের আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে গ্র্যান্ড মুফতির ধর্মীয় মতামত বা পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
গ্র্যান্ড মুফতি তাঁর মতামত দেওয়ার পর আদালত আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই রায় বহাল রাখে। রায় বেরোনোর পর সারার দাবি, তিনি নির্দোষ। সারার আইনজীবী জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
সারা-সহ আরও ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এই মামলায় জড়িত অন্য ন’জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর বাকি সাত জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। মাদক-সংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তিও তুলেছে সংস্থাগুলি। তাদের মতে, এ ধরনের অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার করা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত ও উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনে যুক্ত বেসরকারি সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মিশরে ৪৯২টি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছিল। একই বছরে ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড শুধু ইচ্ছাকৃত হত্যার মতো সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই সীমিত থাকা উচিত।
তবে মিশরে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে মিশরের অধিকার ও স্বাধীনতা কমিশনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ৫৪১টি মৃত্যুদণ্ডের রায় নথিভুক্ত করা হয়েছিল।