সিআইএ এজেন্ট সেজে প্রতিরক্ষা চুক্তির চেষ্টা, ছিলেন বিদেশি প্রেসিডেন্টের ডান হাত! কী ভাবে ভেস্তে যায় ভারতীয় বংশোদ্ভূতের পরিকল্পনা?
যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ সংক্রান্ত কয়েকশো কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী। প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহণ বিমান এবং সামরিক কমান্ড সিস্টেম সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী মহলে তাঁর পরিচয় ছিল সিআইএ-র গোপন এজেন্ট হিসাবে। সেই পরিচয় ভাঁড়িয়ে শুধু বিদেশের ব্যবসায়ী মহল নয়, ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট (তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী) প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ঘনিষ্ঠ মহলেও প্রবেশ করেছিলেন এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত।
সিআইএ এজেন্ট সেজে ইন্দোনেশিয়া সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পর কয়েকশো কোটি ডলারের একাধিক প্রাথমিক প্রতিরক্ষা চুক্তি আদায় করার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। তবে শেষ পর্যন্ত এই জালিয়াতি নজরে পড়ে সরকারের। বিপুল ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হয় শেষ মুহূর্তে।
অভিযুক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীর নাম গৌরব শ্রীবাস্তব। তিনি নিজেকে দীর্ঘ দিন ধরে মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা সিআইএ-র এক ‘নন-অফিশিয়াল’ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে পরিচয় দিতেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তিনি দাবি করতেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মহলে তাঁর উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে। নানা সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক অভিযানের দায়িত্বভার ন্যস্ত করা হয়েছে তাঁর ঘাড়ে।
‘অর্গানাইজ়ড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রোজেক্ট’ এবং ইন্দোনেশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘টেম্পো’র এর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গৌরব ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সুবিয়ান্তোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সুবিয়ান্তোই বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট।
যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ সংক্রান্ত কয়েকশো কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সুবিয়ান্তোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। একাধিক সরকারি বৈঠক ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গৌরব। সেই সব অনুষ্ঠানের ছবিতেও বর্তমান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক ফ্রেমে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
আরও পড়ুন:
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুবিয়ান্তোর সঙ্গে গৌরবের একটি সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুবিয়ান্তো তাঁকে ‘মিস্টার জি’ নামে ডাকতেন। সুবিয়ান্তোর প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহণ বিমান এবং সামরিক কমান্ড সিস্টেম সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল গৌরবের।
তদন্তে দাবি করা হয়েছে, গৌরবের নিয়ন্ত্রণাধীন চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট পাঁচটি প্রাথমিক সমঝোতা বা ‘লেটার অফ ইনটেনশন’ পাওয়া যায়। সেই প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ৩৬টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ইউএইচ-৬০ ব্ল্যাক হক্ হেলিকপ্টার, সি-১৩০ পরিবহণ বিমান এবং সামরিক কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা।
যদিও প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলির কোনওটিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানায়, এগুলো ছিল কেবল প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশের নথি। এগুলি আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক কোনও চুক্তি ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত কোনও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। তা সত্ত্বেও এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রভাব খাটানো, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
গৌরবের প্রাক্তন ব্যবসায়িক অংশীদার নিল্স ট্রুস্ট ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ ইয়র্কের দক্ষিণাঞ্চলের ফেডারেল আদালতে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। সেখানে নেদারল্যান্ডসের তেল ব্যবসায়ী নিল্স অভিযোগ করেন, প্রতারণার সূত্রপাত হয়েছিল যখন গৌরব রেকর্ড করা একাধিক ফোনালাপে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাসংস্থা সিআইএ-র কর্মকর্তা বলে দাবি করেন।
আরও পড়ুন:
নিল্সের অভিযোগ, ওই পরিচয় ব্যবহার করেই গৌরব তাঁর আস্থা অর্জন করেন। পরবর্তী কালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত প্রকল্প হাতাতে নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন গৌরব। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পশ্চিম জাভার হাম্বালাঙ্গে অবস্থিত গরুড় যক্ষ এস্টেটে সুবিয়ান্তোর বাসভবনে গৌরবের সঙ্গে গিয়েছিলেন বলে টেম্পোকে জানিয়েছেন নিলস্।
নিলস্ জানান, অধুনা প্রেসিডেন্টের বাড়িতে আসার আগেই গৌরব তাঁর এমন কিছু অভ্যাসের কথা বলেছিলেন, যা কেবল তাঁর ঘনিষ্ঠেরাই জানতেন। এই অভ্যাসগুলোর মধ্যে একটি ছিল যে সুবিয়ান্তো বিশ্বাস করতেন যে বাড়ির ভিতরের মাকড়সার জাল সরানো উচিত নয়, কারণ সেগুলি প্রকৃতিরই অংশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে, গৌরব দাবি করেছিলেন যে তিনি প্রায়ই সুবিয়ান্তোর বাসভবনে যাতায়াত করতেন এবং সেখানেই থাকতেন। গাড়িতে ভ্রমণের সময় রেকর্ড হওয়া এক কথোপকথনে তিনি আরও দাবি করেন, ২০০২ সালের বালি বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তিনি ভূমিকা নিয়েছিলেন।
একই সঙ্গে নিল্সের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় গৌরব দাবি করেছিলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সুবিয়ান্তোর নাম সেই তালিকা থেকে প্রত্যাহারে তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে গৌরবের স্বপ্ন ছিল গোয়েন্দা অভিযান ও গোপন সামরিক কার্যক্রমের জগতে এক প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে ওঠা।
ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছে তিনি দাবি করেছিলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে একটি বেসরকারি সামরিক ও গোয়েন্দাসংস্থা গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য। গৌরবের পরিকল্পনা ছিল তাঁর সংস্থাটি অনেকটা রাশিয়ার কুখ্যাত ওয়াগনার গ্রুপের মতো কাজ করবে। তবে সেটি রাশিয়ার নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হবে।
সহযোগীদের সামনে তিনি এমন ধারণা তৈরি করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তিনি আরও দাবি করতেন, বিশ্বের যে যে অঞ্চল স্থিতিশীল নয় ও সংঘাতপূর্ণ, সেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৌশলগত বাজার থেকে অপরাধী ও অবৈধ গোষ্ঠীগুলোকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চান।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই আত্মপ্রচার ও কথিত গোয়েন্দা-সংযোগের গল্পই পরবর্তী কালে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই পরিচয়কে পুঁজি করেই তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী এবং ইন্দোনেশিয়ার উচ্চ পর্যায়ের সরকারি মহলে প্রবেশের সুযোগ করে নেন।
তদন্তে পাওয়া নথি থেকে জানা যায়, প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর সঙ্গে যুক্ত চারটি সংস্থাই ছিল মূলত ছায়া সংস্থা। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ বা সামরিক কেনাবেচা ব্যবস্থাপনায় তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কর পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় পরবর্তী কালে প্রতিষ্ঠানগুলির কাগজপত্র বাতিল করা হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সিকিউরিটি কোঅপারেশন এজেন্সি যে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিমান বিক্রির কথা উল্লেখ করেছে, সেখানে গৌরবের কোনও প্রতিষ্ঠানের নামই উল্লেখ করা হয়নি। এতে গৌরবের জাহির করা প্রতিরক্ষা ব্যবসার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।
নিল্সের দাবি, গৌরবের গোয়েন্দা সংযোগের উপর আস্থা রেখেই তিনি তাঁর সংস্থার ৫০ শতাংশ মালিকানা তাঁর কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। আদালতে দাখিল করা নথিতে গৌরবকে ‘অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন এক নির্লজ্জ প্রতারক’ বলে অভিহিত করেন নিল্স।
গৌরবের ব্যবসায়িক অংশীদারের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গৌরব তাঁদের সংস্থার মাধ্যমে আরসারি গ্রুপকে ৫.১ কোটি মার্কিন ডলারের একটি ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এই অর্থ মার্কিন সরকারের একটি গোপন কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হবে। নিল্সের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দাবিও ছিল সম্পূর্ণ ভুয়ো। যদিও এই ঋণের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
তাঁর দাবি, গৌরব আরসারি গ্রুপকে ঋণের প্রায় অর্ধেক অর্থ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত করতে রাজি করান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার মূল্যের একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ কিনেছিলেন। গৌরবের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল যে তিনি ঋণের অবশিষ্ট অর্থও আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আরসারি গ্রুপ শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ ঘটনাকে ঘিরে আইনি কার্যক্রম এখনও চলছে। তদন্তকারীরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। যদিও গৌরব সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। এ ছাড়া, তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনও ফৌজদারি মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এমন কোনও তথ্য এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।