‘ইমুদ্রা’ নিয়ে কেন এত শোরগোল? কেন আচমকা বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্র বিলি বন্ধ করল ভারতীয় সংস্থা?
আর বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্র বিলি করবে না বেঙ্গালুরুর সংস্থা ‘ইমুদ্রা’। কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিল তারা?
১৮ বছরের সুনামে কালির দাগ। শুধু তা-ই নয়, রাতারাতি প্রশ্নের মুখে তাদের বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইট ডিজিটাল শংসাপত্রের ব্যবসা। সাইবার হামলার আশঙ্কায় তাতে তালা ঝোলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেঙ্গালুরুর সংস্থা ‘ইমুদ্রা’! তাদের এহেন পদক্ষেপে শেয়ারবাজারেও শোরগোল পড়ে গিয়েছে। দু’দিনে ৩৫ শতাংশের বেশি পড়ে গিয়েছে সংস্থার স্টকের দর। ফলে, লগ্নীকারীদের যে বিপুল লোকসানের মুখ দেখতে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের ২২ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্রের ব্যবসা নিয়ে বড় ঘোষণা করে ‘ইমুদ্রা’। সংস্থার তরফে জানানো হয়, ওই নথি আর ইস্যু করবে না তারা। কারণ, তাদের দেওয়া আটটি সার্টিফিকেটে দুর্বল ‘প্রাইভেট কি’-র হদিস পাওয়া গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই যেগুলিকে ব্লক করে দেয় গুগ্ল ক্রোম ও মজ়িলা ফায়ারফক্সের মতো আমজনতার বহুল ব্যবহৃত ব্রাউজ়ার।
কী এই ওয়েবসাইটের ‘ব্যক্তিগত তালা-চাবি’? সেখানে ত্রুটি খুঁজে পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক? প্রযুক্তিবিদদের কথায়, যে কোনও ব্রাউজ়ারে প্রতিটি ওয়েবসাইট চিহ্নিতকরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নম্বর থাকে। একটি শংসাপত্রের মাধ্যমে সেটি হাতে পায় তারা। এটি একই সঙ্গে ব্রাউজ়ার ও ওয়েবসাইটের মধ্যেকার যোগাযোগকে গোপন এবং সুরক্ষিত রাখে। বিশ্বব্যাপী এই সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে বিভিন্ন সংস্থা। ভারতের ক্ষেত্রে এত দিন সেই কাজটিই করছিল ‘ইমুদ্রা’।
একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। এ দেশের আমজনতার বড় অংশের কাছেই রয়েছে আধার কার্ড। তাতে একটি নম্বর লেখা থাকে। প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেটি আলাদা। ওই নম্বরের উপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের যাবতীয় তথ্য হাতে পায় সরকার। এই একই পদ্ধতি ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আধারের মতো নম্বরযুক্ত পৃথক পৃথক ডিজিটাল শংসাপত্র রয়েছে তাদেরও।
এখন ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি কম্পিউটার-ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে সুনির্দিষ্ট কোনও ওয়েবসাইটের খোঁজ করলেন। সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে ব্রাউজ়ার। এটি ‘প্রাইভেট কি’ বা ‘ব্যক্তিগত চাবি’ দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। হ্যাকারদের তৈরি করা ‘ভুয়ো’ ওয়েবসাইটের ফাঁদ থেকে আমজনতাকে রক্ষা করতে বছরের পর বছর ধরে এই পদ্ধতিতে কাজ হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন:
ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যার ‘প্রাইভেট কি’ তৈরির নেপথ্যে সুনির্দিষ্ট একটি যুক্তি রয়েছে। একসঙ্গে অনেকগুলি কম্পিউটার ব্যবহার করেও এর নাগাল পাওয়া সাইবার অপরাধীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আর তাই, ডিজিটাল শংসাপত্রের ‘ব্যক্তিগত চাবি’কে এত দিন সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুরক্ষা ব্যবস্থা বলে মনে করা হত। সেই ধারণা সাম্প্রতিক আবিষ্কারে (পড়ুন, আটটি সার্টিফিকেটে দুর্বল ‘প্রাইভেট কি’-র হদিস পাওয়ার পর) ভেঙে গিয়েছে।
উল্লেখ্য, পরিষেবা বন্ধ করার আগে পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি ওয়েবসাইটকে ডিজিটাল শংসাপত্র বিলি করেছে ‘ইমুদ্রা’। সূত্রের খবর, তার মধ্যে আটটি সার্টিফিকেটে নেই নির্দিষ্ট সংখ্যার নম্বর। ফলত, সেই ‘চাবি’ ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এর জেরে বেঙ্গালুরুর সংস্থাটির সুনাম ঘিরে উঠে যায় প্রশ্ন। ফলে, ডিজিটাল সার্টিফিকেট দেওয়া পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণা করে তারা।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ‘ইমুদ্রা’র বিলি করা ডিজিটাল শংসাপত্রে ত্রুটির বিষয়টি চিহ্নিত করতে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স)-এর সাহায্য নেওয়া হয়। তবে সূত্রের খবর, ব্রাউজ়ারগুলিকে এই বিষয়ে সতর্ক করার আগে পর্যন্ত সার্টিফিকেটের ওই দুর্বলতা প্রায় ১৮ মাস এবং দু’টি বাহ্যিক অডিট চক্র পর্যন্ত টিকে ছিল। এ ব্যাপারে অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটেছে সব পক্ষ।
কী ভাবে ত্রুটিপূর্ণ ডিজিটাল শংসাপত্র বিলি হল, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘ইমুদ্রা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা কৌশিক শ্রীনিবাসন। সংবাদমাধ্যম ‘ইকোনমিক টাইমস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘মানবিক অসাবধানতার কারণে দুর্বল ক্রিপ্টোগ্রাফিক তৈরি হয়েছিল। তবে, তার জন্য কোনও গ্রাহকের তথ্য ফাঁস হয়নি।’’ সার্টিফিকেট বিলি তাঁদের মোট ব্যবসার মাত্র এক শতাংশ বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ৩০ জুলাই একটি অনুষ্ঠানে ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্রের ‘প্রাইভেট কি’তে প্রথমবার ত্রুটির হদিস পান শ্রীনিবাসন। তিনি জানিয়েছেন, উত্তর আমেরিকার রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পরিকাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছিল। তখনই মানবিক অসাবধানতার জন্য দুর্বল ‘ব্যক্তিগত চাবি’ বা গাণিতিক নম্বর তৈরি হওয়ার বিষয়টি সকলের নজরে আসে।
‘ইমুদ্রা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতার দাবি, এর পরই সংস্থার পরিচালন পর্ষদ ও লগ্নি থেকে প্রত্যাশিত রিটার্নের বিষয়টি পর্যালোচনা করে এই ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে, কোনও ব্রাউজ়ার তাঁদের বিলি করা ডিজিটাল শংসাপত্রের উপর থেকে আস্থা হারিয়েছে বলে মানতে নারাজ শ্রীনিবাসন। বরং তাঁর দাবি, সংস্থার জি১ রুটের উপর আস্থা অব্যাহত রয়েছে তাদের।
২০০৮ সালে ১৬ জুন মুম্বই থেকে পথ চলা শুরু করে ‘ইমুদ্রা’। ওই সময় এর নাম ছিল ‘৩আই ইনফোটেক কনজ়ুমার সার্ভিসেস লিমিটেড’। এটি প্রকৃতপক্ষে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ‘৩আই ইনফোটেক’-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এর আবার আগের নাম ছিল ‘আইসিআইসিআই ইনফোটেক’। ওই বছরই ব্যবসা করার লাইসেন্স পায় তারা।
‘৩আই ইনফোটেক’-এর মাথায় ছিলেন পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আইসিআইসিআই-এর সাবেক অফিসার ভেঙ্কটরামন শ্রীনিবাসন। ২০১০ সালে সহায়ক সংস্থা ‘ইমুদ্রা’কে তিনি রবি জগন্নাথনের তৈরি ‘ইন্ডাস ইনোভেস্ট’-এর কাছে বিক্রি করে দেন। মজার বিষয় হল, ‘ইন্ডাস ইনোভেস্ট’-এর ডিরেক্টর পদে রয়েছেন শ্রীনিবাসনেরই পুত্র কৌশল।
গত ২১ অক্টোবর ব্যাপক পরিসরে সাইবার হামলার আশঙ্কা করে বিশেষ সতর্কতা জারি করে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দফতর। শুধু তা-ই নয়, হ্যাকারদের হাত থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি ওয়েবসাইট বন্ধ করতে বলে তারা। এই সতর্কবার্তা প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিবৃতি দেয় জাপান, কানাডা এবং ইউরোপের একাধিক দেশ।
সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়েবসাইট তৈরি ও ব্যবহারে বহুল ব্যবহৃত ‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ পিএইচপি-তে ত্রুটি ধরা পড়ায় ওই সতর্কতা জারি করে মার্কিন প্রশাসন। এর জেরে পাসওয়ার্ড ছাড়াই যে কোনও ওয়েবসাইটে ঢোকার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল হ্যাকারদের দল। তড়িঘড়ি সিস্টেমে আপডেটে পাঠিয়ে সামাল দেওয়া হয় পরিস্থিতি।
অন্য দিকে, সম্প্রতি ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের (এসবিআই) ৩,৮৯৭ জন গ্রাহকের তথ্য ফাঁস করে সাইবার অপরাধীদের দল। সেই তথ্য ডার্ক ওয়েবে প্রকাশ করে তারা। গ্রাহকদের মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ, নাম, ই-মেল আইডি এবং বাড়ির ঠিকানা হাতাতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘ইমুদ্রা’র বিলি করা ওয়েবসাইটের ডিজিটাল শংসাপত্রে ধরা পড়ল ত্রুটি।