দাদু চম্বলের কুখ্যাত ডাকাত, আইআইটি করে, বিদেশের চাকরির মোহ ছেড়ে নাতি পাশ করলেন দেশের কঠিনতম পরীক্ষা
ডাকাতের নাতি হয়েও দেব বেছে নিয়েছেন দেশের হয়ে কাজ করার পথ। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করে বর্তমানে তিনি ভারতীয় রেলের হয়ে কাজ করছেন।
শৈশবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতায় ডাকাতের কথা প্রায় সব বাঙালিই পড়েছেন। সেই ডাকাত যে কেবল গল্প বা কবিতার পাতাতেই সীমিত নয়, তার সাক্ষ্য বহন করে মধ্যপ্রদেশের মোরেনা জেলায় অবস্থিত চম্বল গ্রাম।
একসময় সেখানকার ডাকাতদের ভয়ে সকলে কাঁপত। কিন্তু ডাকাতের উত্তরসূরিদেরও যে ডাকাতই হতে হবে তেমন তো কোনও কথা নেই। সেটাই প্রমাণ করলেন চম্বলের কুখ্যাত ডাকাত রামগোবিন্দ সিংহ তোমরের মেধাবী নাতি।
কথা হচ্ছে দেব প্রভাকর সিংহ তোমরকে নিয়ে। ঠাকুরদা যদি সুমেরু হন, নাতি দেব তা হলে কুমেরু। ডাকাতের নাতি হয়েও দেব বেছে নিয়েছেন দেশের হয়ে কাজ করার পথ। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করে বর্তমানে তিনি ভারতীয় রেলের হয়ে কাজ করছেন।
তবে দেবের জন্য এই যাত্রা সহজ ছিল না। এক পডকাস্টে এসে দেব জানিয়েছিলেন, প্রায় ৭৫ বছর আগে দেবের ঠাকুরদা চম্বলের কুখ্যাত ডাকাতদলে যোগ দিয়েছিলেন। স্থানীয় ভাষায় তাঁদের ‘বাগী’ বা ‘বিদ্রোহী’ বলা হত। পারিবারিক সমস্যা এবং তৎকালীন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমস্যার জেরেই দেবের ঠাকুরদা সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন।
কিন্তু পুলিশের খাতায় তাঁদের পরিচয় ছিল ডাকাত হিসেবে। দাগী আসামী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তাঁরা। দেবের দাবি, তাঁর পরিবারে এমনও দিন গিয়েছে যখন দু’বেলা পাতে খাবার জুটত না। ফলস্বরূপ দেবের কাকাও ডাকাতদলে যোগ দেন।
আরও পড়ুন:
কিন্তু দেবের বাবা বলবীর সিংহ তোমর সেই চক্র ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। বলবীরের ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার। স্বপ্নপূরণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে বলবীর গ্বালিয়রের পথে পাড়ি দেন।
গ্বালিয়রে বলবীর পড়াশোনা চালাতে থাকেন। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই সংসার পাতেন বলবীর। পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে।
দেব শৈশবেই বাবার মতাদর্শ মেনে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। প্রথমে মধ্যপ্রদেশ বোর্ডের স্কুলে পড়াশোনা করেন দেব। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই পড়েন। তার পর তাঁকে একটি সিবিএসসিই বোর্ডের স্কুলে ভর্তি করানো হয়।
সেই স্কুলে প্রথমে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয় তাঁর। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হয়ে অথৈ সাগরে পড়েন বলে মনে হয় তাঁর। ক্রমে তিনি সে সমস্ত বাধা কাটিয়ে ওঠেন। বন্ধু বানাতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন:
একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর মাথায় আইআইটির জেদ চাপে। আশপাশে বন্ধুরা সবাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তাঁদের দেখে দেবেরও ইচ্ছা হয় আইআইটিতে ভর্তি হওয়ার। সেইমতো পড়াশোনা শুরু করেন।
যদিও অনেকের মতো কোটার মতো শহরে গিয়ে পড়াশোনা করার আর্থিক ক্ষমতা দেব বা তাঁর পরিবারের ছিল না। বইপত্র কিনে বাড়িতেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার পাশাপাশি আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষাও দেন।
আইআইটি রোপারে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। সেখানে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনা শেষ করতে না করতেই ক্যাম্পাসিংয়ে চাকরি পেয়ে যান ডাকাতের নাতি।
নেদারল্যান্ডসে নামী সংস্থায় চাকরি পাকা হয় দেবের। কিন্তু বিদেশের মাটিতে সফলতার স্বাদ পেয়েও মন ভরে না তাঁর। মনে হতে থাকে, জীবনকে তিনি যে ভাবে গোছাতে চেয়েছিলেন, সে পথে জীবন এগোচ্ছে না। সেই সময় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার ভাবনা মাথায় ঘুরতে শুরু করে।
দেব বুঝতে পারেন, চাকরির পাশপাশি ইউপিএসসির মতো কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। শুরু হয় সিভিল সার্ভিসে বসার তোড়জো়ড়।
প্রথম বার প্রিলিমিনারিতেও পাশ করেননি দেব। ১২.৫ নম্বরের ব্যবধানে ছিটকে যান। হার না মেনে দ্বিতীয় বার পরীক্ষায় বসেন। সে বার মাত্র আড়াই নম্বরের জন্য স্বপ্ন সত্যি হওয়া থেকে ছিটকে যান।
দেবের মনে হয় যে তাঁর প্রস্তুতিতে কোথাও ভুল হচ্ছে। তিনি পড়াশোনার ধরনে বদল আনেন। তৃতীয় বারে প্রিলিমিনারি এবং মেনস, উভয় পরীক্ষাতেই সফল হয়ে ইন্টারভিউ রাউন্ড অবধি পৌঁছোন। কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশার শিকার হতে হয়।
তত দিনে দেব বিয়েও করে ফেলেছেন। ফলত মাথায় সংসারের চাপ এসে পড়ে। তাই দিল্লিতে একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু পরিবারের তরফ থেকে তাঁকে পুনরায় সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষায় বসার জন্য উদ্বুদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। সে কথা শুনে শিক্ষকতার পাশাপাশি দেব পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়াও শুরু করেন।
চতুর্থ বারে এসে দেবের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। কোনও আশা না নিয়েই রেজ়াল্ট দেখতে বসেছিলেন বলে দাবি তাঁর। কিন্তু সেই রেজ়াল্টই তাঁর জীবন চিরকালের মতো বদলে দেয়। ২০২৫ সালের ইউপিএসসি ব্যাচে ৬২৯ র্যাঙ্ক নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রাফিক সার্ভিস’ (আইআরটিএস)-এর জন্য নির্বাচিত হন দেব। বর্তমানে তিনি ভারতীয় রেলে কর্মরত। ডাকাতের নাতি হয়ে ভারত সরকারের হয়ে কাজ করার যাত্রাপথটা সহজ ছিল না। কিন্তু একাগ্রতা এবং পরিশ্রম তাঁকে আজ এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।