পুতিনের পর রাশিয়ার কুর্সিতে কে? ভ্লাদিমির-বিয়োগে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষছে চিন, সলতে পাকাচ্ছে ‘ষড়যন্ত্রের’!
ভ্লাদিমির পুতিনের পর কে হবেন রুশ প্রেসিডেন্ট? ইতিমধ্যেই সেই হিসাব কষতে শুরু করে দিয়েছে চিন। পশ্চিমি বিশ্লেষকদের এ-হেন দাবি ঘিরে দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
উপরে গলায় গলায় ভাব। কিন্তু মনে মনে চলছে অন্য হিসাব! ‘প্রিয় বন্ধু’র মৃত্যু হলে, কে পাবেন কুর্সি? নতুন নায়কের আবির্ভাবে আমূল বদলে যাবে সম্পর্কের সমীকরণ? সেই কথা মাথায় রেখে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে ড্রাগন। প্রত্যেককে বাজিয়ে দেখে নেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। যদিও অন্যের ঘরোয়া রাজনীতিতে ‘নাক গলানো’কে মোটেই ভাল চোখে দেখছে না বহির্বিশ্ব।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চিনা রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক তাঁদের ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’ নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ায় জল্পনার অন্ত নেই। সেখানেই এ বার নতুন রসায়নের গন্ধ পাচ্ছে বেশ কিছু মার্কিন গণমাধ্যম। তাদের দাবি, পুতিনকে নিয়ে আর মাথা ঘামাতে রাজি নয় বেজিং। উল্টে তাঁর উত্তরসূরি কে হতে চলেছেন, সে দিকে দৃষ্টি রেখেছে ড্রাগন। সেইমতো বিদেশনীতি সাজানোর প্রক্রিয়াও শুরু করেছে তারা।
পুতিন-উত্তর রাশিয়াকে নিয়ে চিনের মাথাব্যথার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে প্রথমটি অবশ্যই অর্থনীতি। ২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কো সামরিক অভিযানে নামলে পূর্ব ইউরোপে বেধে যায় যুদ্ধ। চার বছর পেরিয়ে এখনও সেখানে শান্তি ফেরেনি। উল্টে সংঘর্ষ শুরু হতেই ক্রেমলিনের উপর ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। সেটা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে রাশিয়াকে।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার জেরে শ্বাস উঠে আসা মস্কোর অর্থনীতির অন্যতম ‘লাইফলাইন’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে চিন। আর তাই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেজিঙে খনিজ তেলের রফতানি দ্বিগুণ করেছেন পুতিন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মান্দারিনভাষীদের ১২,৯০০ কোটি ডলারের পণ্য বিক্রি করে ক্রেমলিন। অপরিশোধিত তেল ছাড়াও তাতে রয়েছে কয়লা, সার এবং প্রাকৃতিক গ্যাস।
বিনিময়ে রাশিয়ার হাতে ১১,৬০০ কোটি ডলারের পণ্য তুলে দিয়েছে চিন। বেজিঙের থেকে মূলত ভারী যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম ও যানবাহন আমদানি করছে মস্কো। এ ছাড়া সামরিক ও বেসামরিক দ্বৈত ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য প্রায় সমস্ত পণ্যই ড্রাগনভূমি থেকে কিনছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। এর উপর ভর করে টিকে আছে ক্রেমলিনের প্রতিরক্ষা শিল্প। বলা বাহুল্য, এই অবস্থা বজায় রাখার পক্ষপাতী শি জিনপিং।
আরও পড়ুন:
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়’ নামের মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। তাঁদের দাবি, ২১ শতকের গোড়াতেই অর্থনীতির নিরিখে রাশিয়ার সমকক্ষ হয়ে ওঠে চিন। কিন্তু, ২০২০ সালে মাথাপিছু মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (জিডিপি) মস্কোকে ছাপিয়ে যায় বেজিং। পরবর্তী বছরগুলিতে ক্রেমলিনের চেয়ে ১০ গুণ বড় অর্থনৈতিক দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেv মান্দারিনভাষীরা।
আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড) জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে ৩০ লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছোবে চিনের আর্থিক বৃদ্ধির সূচক। অন্য দিকে, বড় কোনও পরিবর্তন না হলে দুই লক্ষ কোটি ডলারের নীচেই স্থির থাকবে রুশ জিডিপি। আর তাই মস্কোকে আর সমকক্ষ মানতে নারাজ বেজিং। বরং ক্রেমলিনকে ‘ছোট ভাই’য়ের চোখে দেখতে শুরু করেছেন ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট জিনপিং।
পশ্চিমি বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমানে রুশ-চিন সম্পর্ক অনেকটাই জ্বালানি-নির্ভর। মস্কোর অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লা বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই যাচ্ছে বেজিঙে। এর জেরে ড্রাগনের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্ক ট্যাঙ্কটি মনে করে তার থেকে বাঁচতে ক্রেমলিনের জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমানোর ফিকির খুঁজছে মান্দারিনভাষী সরকার।
মস্কো-বেজিং সম্পর্কে ইতিমধ্যেই তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বলে স্পষ্ট করেছে পর্যবেক্ষক মহল। সাইবেরিয়া-২ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে চিনা অনুমোদন পাওয়ার ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত ছিলেন পুতিন। কিন্তু, সম্প্রতি তাতে ‘না’ বলেছে জিনপিং প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট পাইপলাইন তৈরি হয়ে গেলে সরাসরি সাইবেরিয়া থেকে বেজিং পর্যন্ত প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠাতে পারত ক্রেমলিন। এই নিয়ে দর কষাকষিতেও চিঁড়ে ভেজেনি বলে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রুশ কূটনীতি নিয়ে চিনের যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। কোনও অবস্থাতেই সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে রাজি নয় বেজিং। উল্টে ধারাবাহিক ভাবে সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাদের। অন্য দিকে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আমল থেকেই সামরিক হস্তক্ষেপে সমস্যা সমাধানে বেশি আগ্রহী মস্কো। তাই আফগানিস্তান, চেচনিয়া বা ইউক্রেন আক্রমণ করতে দু’বার ভাবেনি ক্রেমলিন।
তবে পুতিন-উত্তর রাশিয়া দুর্বল হোক, সেটাও চায় না বেজিং। কারণ, সে ক্ষেত্রে সরাসরি পশ্চিমি শক্তিগুলির সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনীতি বা সামরিক সংঘাতে নামতে হবে তাদের। তাই গত জুলাইয়ে ঘটা করে রুশ-চিন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ২৫তম বার্ষিকী উদ্যাপন করে জিনপিং প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে অবজ়ারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের জুনিয়র ফেলো রাজোলি সিদ্ধার্থ জয়প্রকাশ বলেছেন, ‘‘মস্কোয় মিত্র সরকার ক্ষমতায় থাকুক, সেটা সব সময় চেয়ে এসেছে ড্রাগন।’’
প্রসঙ্গে ভারত-সহ একাধিক দেশের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত রয়েছে বেজিঙের। আর তাই রুশ-চিন সীমান্তে কোনও রকম অশান্তি চায় না ড্রাগন। সম্প্রতি এ ব্যাপারে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’-এর সিনিয়র ফেলো জোসেফ ওয়েবস্টার। তাঁর কথায়, ‘‘প্রেসিডেন্ট শি ও চিনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) বুঝে গিয়েছে যে পুতিনের পক্ষে বেশি দিন মস্কোর গদিতে থাকা অসম্ভব।’’
চলতি আর্থিক বছরের (২০২৬-’২৭) প্রথম ত্রৈমাসিকে ঋণাত্মকে চলে গিয়েছে রুশ অর্থনীতি। অন্য দিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ক্রমাগত বাড়ছে সামরিক খরচ। ওয়েবস্টারের দাবি, চিন মনে করে এই দুইয়ের চাপেই কুর্সি হারাবেন পুতিন। তবে মস্কোর ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণ না-ও হতে পারে। ক্রেমলিনের নতুন শাসক বেজিঙের সঙ্গে নতুন সমীকরণে গেলে আর্থিক লোকসান হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা। তাই সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছে শি প্রশাসন।
চিনের দ্বিতীয় উদ্বেগের জায়গা হল রুশ-উত্তর কোরিয়ার (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা ডিপিআরকে) সামরিক সমঝোতা। ইউক্রেন যুদ্ধে সৈন্য সরবরাহ করে সরাসরি মস্কোর পাশে দাঁড়িয়েছে পিয়ংইয়ং। বেজিঙের আশঙ্কা, বিনিময়ে সেখানকার সুপ্রিম লিডার কিম জং-উনকে বহু জটিল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর করছেন পুতিন। ফলে আগামী দিনে কয়েক গুণ বাড়তে পারে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতা।
জিনপিং প্রশাসন মনে করে, এর জেরে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমি শক্তিগুলির আরও কাছাকাছি চলে যাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে)। পাশাপাশি, নতুন করে সামরিক উত্থান হতে পারে টোকিয়োর। সেটা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। সেটা যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ান তথা সাবেক ফরমোজ়া (রিপাবলিক অফ চায়না) দখলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। বহু গবেষক মনে করেন, পুতিন-উত্তর রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে আসা অসম্ভব। তা ছাড়া মুখে বন্ধুত্ব থাকলেও বেজিংকে কখনওই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি ক্রেমলিন। গত বছরের জুনে (২০২৫ সাল) মস্কোর অভ্যন্তরীন গোয়েন্দাসংস্থা ‘ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস’-এর একটি গোপন রিপোর্ট ফাঁস করে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। তাতেই এর উল্লেখ রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জটিল সামরিক প্রযুক্তি চুরি করতে রুশ গুপ্তচরদের লাগাতার লোভ দেখিয়ে দলে টানার চেষ্টা চালাচ্ছে চিন। মস্কোর প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদেরও একই ভাবে কব্জা করার ছক রয়েছে তাঁদের। পাশাপাশি, সুমেরু সাগরেও গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেছে বেজিঙের ‘মিনিস্ট্রি অফ স্টেট সিকিউরিটি’ বা এমএসএস। এর কোনও কিছুই পুতিন জানেন না, এমনটা নয়।
মজার বিষয় হল, পুতিন ও জিনপিং সমবয়সি। বর্তমানে দু’জনেরই বয়স ৭৩ বছর। দেশ শাসনের পাশাপাশি চিনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান (সর্বোচ্চ পদ) পদেও রয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। তাঁর মতো শক্তিশালী নেতা বেজিঙের হাতে দ্বিতীয়টি নেই। ফলে জিনপিং সরে গেলে উত্তরসূরির সমস্যায় ভুগতে হবে ড্রাগনকেও। ফলে কোথাকার জল কোন দিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার।