চিনা ডুবোজাহাজে শক্তি বাড়লেও যোজন পিছিয়ে! সমুদ্রশক্তিতে ভারত এবং পাকিস্তান, কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
চিনের কাছ থেকে পাকিস্তান আটটি হ্যাঙ্গর শ্রেণির ডুবোজাহাজ কেনার খবর প্রকাশের প্রায় পাঁচ মাস পর সেই ডুবোজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পরীক্ষা করেছে পাক নৌসেনা। অস্ত্রপরীক্ষার কার্যক্রম সফল হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইসলামাবাদ। ঘোষণা করেছে যে, হ্যাঙ্গর শ্রেণির ডুবোজাহাজটি সফল ভাবে তার প্রথম প্রকৃত অস্ত্রপরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
আরব সাগরের বুকে চিন থেকে আনা নতুন ডুবোজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পরীক্ষা করেছে পাকিস্তান। শক্তি বেড়েছে পাক নৌসেনার। রবিবার পাক নৌসেনায় সদ্য অন্তর্ভুক্ত ডুবোজাহাজ ‘পিএনএস/এম হ্যাঙ্গর’ উত্তর আরব সাগরে একটি জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এটিই ছিল ডুবোজাহাজটির প্রথম ‘লাইভ ওয়েপন টেস্ট’ বা সরাসরি অস্ত্রপরীক্ষা।
চিনের কাছ থেকে পাকিস্তান আটটি হ্যাঙ্গর শ্রেণির ডুবোজাহাজ কেনার খবর প্রকাশের প্রায় পাঁচ মাস পর সেই ডুবোজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পরীক্ষা করেছে পাক নৌসেনা। অস্ত্রপরীক্ষার কার্যক্রম সফল হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইসলামাবাদ। ঘোষণা করেছে, হ্যাঙ্গর শ্রেণির ডুবোজাহাজটি সফল ভাবে তার প্রথম প্রকৃত অস্ত্রপরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
এই মহড়ার সময় ডুবোজাহাজ থেকে একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটি সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা একটি জাহাজকে নিশানা করে আঘাত হানে। ধ্বংস হয় জাহাজটি। পাকিস্তানের নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরফ এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তার উপস্থিতিতে পরীক্ষাটি পরিচালিত হয়। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর এই ঘটনাকে দেশটির পরিচালনগত প্রস্তুতি এবং বিশ্বাসযোগ্য সামুদ্রিক প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বলিষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেছে।
আর পাক নৌবাহিনীর এই নতুন ডুবোজাহাজের শক্তিপরীক্ষার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, ইসলামাবাদের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম ডুবোজাহাজ আসায় কতটা চিন্তা বাড়ল ভারতের? একই সঙ্গে সামরিক অস্ত্র এবং ক্ষমতার দিক থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কে কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা নিয়েও কৌতূহল প্রকাশ করেছেন অনেকে।
‘ব্লু ওয়াটার’ বা গভীর সমুদ্রে শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম ভারতীয় নৌবাহিনী, যা সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এর মূল দায়িত্বগুলির মধ্যে রয়েছে কৌশলগত সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’ বা সঙ্কীর্ণ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ (যেমন মলাক্কা প্রণালী) রক্ষা করা, আন্তর্জাতিক সমুদ্র-যোগাযোগ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা এবং দেশের জন্য ‘নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’ বা সামগ্রিক নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করা।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, পাকিস্তান নৌবাহিনী মূলত একটি ‘গ্রিন ওয়াটার’ বা উপকূলীয় অঞ্চলের বাহিনী। এদের কার্যক্রম মূলত ‘সি ডিনায়াল’ (শত্রুকে সমুদ্র ব্যবহারে বাধা দেওয়া), উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং উত্তর আরব সাগরে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অঞ্চল রক্ষার উপর সীমাবদ্ধ। পাশাপাশি, চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্য করিডরগুলির সুরক্ষাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ভারতীয় নৌবাহিনীতে বর্তমানে দু’টি সক্রিয় বিমানবাহী রণতরী রয়েছে। আইএনএস বিক্রমাদিত্য (৪৫,০০০ টনের পরিবর্তিত কিয়েভ শ্রেণির রণতরী) এবং আইএনএস বিক্রান্ত (ভারতে নিজস্ব নকশায় তৈরি ৪৫,০০০ টনের রণতরী)। এই রণতরীগুলি থেকে মিগ-২৯কে যুদ্ধবিমান এবং সাবমেরিন-বিধ্বংসী হেলিকপ্টার মোতায়েন করা যায়, যা উন্মুক্ত সমুদ্র এলাকায় নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম।
পাক নৌবাহিনীর কাছে কোনও বিমানবাহী রণতরী নেই। উপকূলীয় জলসীমায় আকাশপথে সুরক্ষা বা ‘এয়ার কভার’ নিশ্চিত করতে পাকিস্তান স্থলভিত্তিক সামুদ্রিক আঘাত হানতে সক্ষম বিমানের উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে নৌবাহিনীর এটিআর-৭২ টহলদারী বিমান, সি কিং হেলিকপ্টার এবং বিমানবাহিনীর জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, যা জাহাজ ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত।
ভারতের ডুবোজাহাজের সংখ্যা ১৯টি। সেগুলির মধ্যে একাধিক পরমাণু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী ডুবোজাহাজ। এর মধ্যে আইএনএস আরিহান্ত এবং আইএনএস আরিঘাতও রয়েছে।
আরও পড়ুন:
পরমাণু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী ডুবোজাহাজগুলির মাধ্যমে ভারত সমুদ্রে পরমাণু প্রতিরোধ সক্ষমতা (নিউক্লিয়ার ট্রায়াড) অর্জন করেছে, যা কে-১৫ (৭৫০ কিমি পাল্লা) এবং কে-৪ (৩,৫০০ কিমি পাল্লা) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত। অধিক ওজনের এবং উন্নত প্রযুক্তির আরও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী ডুবোজাহাজ বর্তমানে পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
ভারত বর্তমানে নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরমাণু হামলা চালাতে সক্ষম এমন ডুবোজাহাজ তৈরির কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ (বিমানবাহী রণতরীকেন্দ্রিক যুদ্ধদল)-এর কার্যক্রমকে সহায়তা করার জন্য পরমাণু শক্তিচালিত আক্রমণকারী ডুবোজাহাজ ইজারা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়াও শত্রুপক্ষের উপর হামলা চালাতে পারে এমন একাধিক ডুবোজাহাজ রয়েছে ভারতের হাতে। এর মধ্যে রয়েছে ৬টি আধুনিক কালভারি-শ্রেণির (ফরাসি স্করপেন নকশা), ৪টি জার্মান নকশার শিশুমার-শ্রেণির (টাইপ ২০৯) এবং ৬টি রাশিয়ায় নির্মিত সিন্ধুঘোষ-শ্রেণির (কিলো-শ্রেণি) সাবমেরিন।
অন্য দিকে, পাকিস্তানের হাতে ডুবোজাহাজ রয়েছে ৭-৮টি। কিন্তু চিনের হ্যাঙ্গর শ্রেণির আরও ডুবোজাহাজ হাতে এলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের ডুবোজাহাজের বহর বৃদ্ধি পাবে।
পাকিস্তানে কোনও পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ নেই। প্রচলিত হামলাকারী কিছু ডুবোজাহাজ রয়েছে। বর্তমানে ৩টি আধুনিকীকৃত ফরাসি ‘অগস্টা ৯০বি’ (খালিদ-শ্রেণি) ডুবোজাহাজ চালু রয়েছে, যেগুলিতে ‘মেসমা’ এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) প্রযুক্তি এবং তুরস্কের উন্নত কিছু প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরনো ‘অগস্টা ৭০’ ডুবোজাহাজগুলিকে পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠাচ্ছে পাকিস্তান।
এখন হ্যাঙ্গর-শ্রেণির ডুবোজাহাজ ‘পিএনএস/এম হ্যাঙ্গর’-এর অন্তর্ভুক্তির ফলে পাক নৌবহর আরও শক্তিশালী হয়েছে। আরও সাতটি সমগোত্রীয় ডুবোজাহাজেরও পাক নৌসেনায় অন্তর্ভুক্তির কথা রয়েছে। ফলে পাকিস্তানের ডুবোজাহাজ বহরে ১১টি আধুনিক এআইপি-প্রযুক্তিযুক্ত আক্রমণকারী ডুবোজাহাজ থাকবে।
ভারতের হাতে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার রয়েছে ১৩টিরও বেশি। উন্নত যুদ্ধযানগুলির মধ্যে রয়েছে স্টেলথ বা রাডার-অদৃশ্যকারী প্রযুক্তিসম্পন্ন বিশাখাপত্তনম-শ্রেণি (প্রজেক্ট ১৫বি), কলকাতা-শ্রেণি (প্রজেক্ট ১৫এ) এবং দিল্লি-শ্রেণির জাহাজ। এই জাহাজগুলিতে অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে রাডার, দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপকারী ক্ষেপণাস্ত্র (বারাক-৮) এবং সুপারসনিক ব্রহ্মস জাহাজ-ধ্বংসকারী (অ্যান্টি-শিপ) ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
ভারতীয় নৌসেনায় প্রায় ১২-১৫টি স্টেলথ ফ্রিগেট, যার মধ্যে শিবালিক-শ্রেণি, তলওয়ার-শ্রেণি রয়েছে। নীলগিরি-শ্রেণির ফ্রিগেটও শীঘ্রই ভারতীয় নৌসেনার হাতে আসতে চলেছে। একই সঙ্গে বহু সংখ্যক অ্যান্টি-সাবমেরিন করভেট (কামোরতা-শ্রেণি) এবং ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ রয়েছে।
অর্থাৎ, ভারতীয় নৌসেনার হাতে ২২০ থেকে ২৪০টিরও বেশি সক্রিয় যুদ্ধজাহাজ, সহায়ক জাহাজ এবং উভচর ল্যান্ডিং জাহাজ রয়েছে।
অন্য দিকে, পাকিস্তানের হাতে কোনও নিবেদিত গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার নেই। পাক নৌবাহিনীটি আধুনিক একটি সারফেস ফ্লিট বা জলপৃষ্ঠের যুদ্ধজাহাজের বহর পরিচালনা করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চিনে নির্মিত ৪টি ‘টাইপ ০৫৪এ/পি’ (তুঘরিল-শ্রেণি) গাইডেড-মিসাইল ফ্রিগেট (এগুলিতে ওয়াইজে-১২ সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে)।
এর পাশাপাশি বহরটিতে রয়েছে তুরস্কের নকশায় তৈরি ৪টি বাবর-শ্রেণির (মিলগেম) ভারী করভেট/ফ্রিগেট এবং অপেক্ষাকৃত পুরনো জুলফিকর-শ্রেণির (এফ-২২পি) জাহাজ। প্রতিবেশী দেশের নৌবাহিনীতে আধুনিক ডাচ-নির্মিত ইয়ারমুক-শ্রেণির অফশোর পেট্রল ভেসেল (উপকূলীয় টহল জাহাজ) এবং অ্যান্টি-শিপ মিসাইল-সজ্জিত আজ়মত-শ্রেণির ফাস্ট অ্যাটাক যুদ্ধযান রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি সচল যুদ্ধজাহাজ এবং নৌযান রয়েছে পাকিস্তানের হাতে, যার মধ্যে উপকূলীয় টহল যান এবং দ্রুত গতির ক্ষেপণাস্ত্র-হামলাকারী নৌযানের (ফাস্ট-অ্যাটাক মিসাইল বোট) সংখ্যাই বেশি।