বেতন-বোনাস না নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই, তাকলাগানো চিনা চিপের ‘চোখরাঙানি’তে তাবড় টেক জায়ান্টদের মাথায় হাত
টানা ন’বছরের পরিশ্রমের ফল। অবশেষে ডির্যাম তৈরি করে দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে চিনা সংস্থা সিএক্সএমটি। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের মতো টেক জায়ান্টের স্টকে নেমেছে ধস। কিন্তু কেন?
ডিপসিক-এর পর এ বার সিএক্সএমটি। ফের চিনা সংস্থার জন্য শেয়ারবাজারে উথাল-পাতাল! এর জেরে জাপান ও রিপাবলিক অফ কোরিয়ায় (পড়ুন, দক্ষিণ কোরিয়া) হু-হু করে নামল স্টকের সূচক। আতঙ্ক ছড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটেও। অন্য দিকে, স্রোতের বিপরীতে হেঁটে তেমন প্রভাব পড়েনি ভারতের শেয়ারবাজারে। কেন এই উলট-পুরাণ?
বর্তমান সময়ে দুনিয়া জুড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে কৃত্রিম মেধা বা এআই-এর (আর্টিফিশিয়াল টেকনোলজি) দাপট। সুষ্ঠু ভাবে এই প্রযুক্তি চালাতে চাই অত্যাধুনিক মেমরি চিপ। এত দিন সেই বাজারে রাজত্ব করতে দেখা গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক সংস্থাকে। এর মধ্যে এনভিডিয়া, ইনটেল, কোয়ালকম, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স অন্যতম। এ বার সেখানেই থাবা বসাচ্ছে চিন।
সম্প্রতি, ‘ডায়নামিক-র্যান্ডাম অ্যাক্সেস মেমরি’ বা ডির্যাম চিপ তৈরি করে গোটা দুনিয়াকে চমকে দেয় ‘চ্যাংজিন মেমরি টেকনোলজ়িস’ বা সিএক্সএমটি নামে বেজিঙের একটি সংস্থা। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ায় ছড়িয়েছে আতঙ্ক। তাদের আশঙ্কা, আগামী দিনে ‘জলের দরে’ বিশ্ববাজারে চিপ বিক্রি করবে ড্রাগন। ফলে, পাত্তারি গোটাতে হবে এসকে হাইনিক্স, স্যামসাং ও কোয়ালকমকে।
বিশেষজ্ঞদের এই আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ারও নয়। কারণ, ঠিক এই কায়দায় অতীতে বহু বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের বাজার দখল করেছে চিন। উদাহরণ হিসাবে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের কথা বলা যেতে পারে। আজকের দিনে সেখানে চুটিয়ে ব্যবসা করেছে ভিভো, ওপো, শাওমি, রিয়েলমি বা লেনোভো-র মতো সংস্থা। দাম কম হওয়ার কারণে দিন দিন তাদের তৈরি পণ্যের বিক্রি বাড়ছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
সিএক্সএমটির তৈরি ডির্যাম বাজার আসায় চিপের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৬ সালের ১৩ জুন চিনের হেফেই-তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন ঝু ইমিং। ড্রাগনভূমির এমআইটি হিসাবে পরিচিত সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। পরবর্তী কালে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি দেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে প়ড়াশোনা করেন তিনি।
আরও পড়ুন:
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে কর্মজীবন শুরু করেন ঝু। ২০০৫ সালে পাকাপাকি ভাবে ফিরে আসেন চিনে। দেশের মাটিতে গড়ে তোলেন ‘গিগাডিভাইস’ নামের একটি সংস্থা। সেখানে তৈরি হত ফ্ল্যাশ মেমরি চিপ। কিন্তু, এতে একেবারেই খুশি ছিলেন না ইমিং। তাই কিছু দিনের মধ্যেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তিনি। ঝাঁপান ডির্যাম তৈরিতে, যেখানে একচ্ছত্র রাজস্ব এসকে হাইনিক্স বা স্যামসাঙের।
মেমরি চিপের ব্যাপারে চিনের এখনও বিদেশি নির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে, কৃত্রিম মেধা বা অন্যান্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগোতে সমস্যা হচ্ছে বেজিঙের। এই সমস্যার পাকাপাকি সমাধান করতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন ঝু। ঠিক করেন স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স বা মাইক্রনের সমগোত্রীয় চিপ বানিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দেবেন তিনি। সেই লক্ষ্যেই তাঁর হাত ধরে জন্ম হয় সিএক্সএমটি-র। বর্তমানে সংস্থার চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন ইমিং।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চিনা সংস্থাটির পক্ষে চিপ নির্মাণ মোটেই সহজ ছিল না। কারণ, তত দিনে এর প্রযুক্তিকে পুরোপুরি কুক্ষিগত করে ফেলেছে বিশ্বের হাতে গোনা বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠান। তার পরেও হাল ছাড়েননি ঝু। কথিত আছে, এ ব্যাপারে ‘ধনুকভাঙা পণ’ করে বসেন তিনি। যত দিন না চিপ বানিয়ে সিএক্সএমটি লাভের মুখ দেখছে, তত দিন বেতন বা বোনাস নেবেন না বলে জানিয়ে দেন ইমিং।
চিনা উদ্যোগপতির ‘ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা’ বিফলে যায়নি। ন’বছর পর ডির্যাম চিপ তৈরিতে সাফল্য পায় সিএক্সএমটি। শুধু তা-ই নয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মেমরি চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় সেটি। এর পর অবশ্য আর ঝু-কে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। হু-হু করে বেড়েছে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ। বলা বাহুল্য, এতে স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
আরও পড়ুন:
চলতি বছরে স্টকের দুনিয়ায় পথচলা শুরু করে ঝু-এর সিএক্সএমটি। সাংহাইয়ের বাজারে তালিকাভুক্তির দিনে প্রায় ৪৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এর শেয়ারের দাম। ফলে, ৩.৩ লক্ষ কোটি ইউয়ানে পৌঁছোয় সংস্থাটির বাজারমূল্য, যেটা প্রায় ৪৮,৭০০ কোটি ডলার। এর জেরে খুব অল্প সময়ের জন্য মূল চিনা ভূখণ্ডের সবচেয়ে দামি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট-কে ছাপিয়ে যায় সেটি। পরে অবশ্য সূচক সামান্য নামলেও তেমন পতন দেখা যায়নি।
তালিকাভুক্তিতে সিএক্সএমটি-র শেয়ারের এ-হেন মূল্যবৃদ্ধির জেরে বেড়েছে ঝু-এর ব্যক্তিগত সম্পত্তিও। জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম ফোর্বস-এর মতে, বর্তমানে তাঁর মোট সম্পত্তির বাজারমূল্য ১,৫৯০ কোটি ডলার। ফলে চিনের অন্যতম ধনকুবের উদ্যোগপতিদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। অন্য দিকে, চিনা সংস্থাটির মেমরি চিপের খবর প্রকাশ্যে আসতেই পড়েছে স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের স্টকের দর।
গত ১৩ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার সূচক ‘কোসপি’তে দেখা যায় ৫.৫ শতাংশের পতন। ওই তারিখে যথাক্রমে ১০ ও ৭.৪ শতাংশ হ্রাস পায় এসকে হাইনিক্স এবং স্যামসাঙের স্টকের দর। অন্য দিকে, জাপানি বাজারের সূচক ‘নিক্কেই ২২৫’-এ পতনের অঙ্ক দাঁড়ায় ১.৮ শতাংশ। এর কারণ হিসাবে মূলত একটি বিষয়কেই চিহ্নিত করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ। আর সেটা হল সিএক্সএমটির উত্থান।
ঝু-এর সংস্থার তৈরি ডির্যাম বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনে। কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তিতেও একে কাজে লাগানো যেতে পারে। সস্তার চিনা চিপ বাজারে চলে আসায় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কপাল পুড়বে বলে একরকম নিশ্চিত লগ্নিকারীদের একাংশ। এর জেরে এসকে হাইনিক্স বা স্যামসাঙের মতো টেক জায়ান্টের স্টক বিক্রি করে দিচ্ছেন তাঁরা। ফলে, লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে সেগুলির শেয়ারের দর।
যদিও বিষয়টিকে এতটা সরলীকরণ করে দেখতে নারাজ আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, সিএক্সএমটি-র ডির্যাম পৃথিবীর সব দেশ গ্রহণ করবে, এমনটা নয়। ইতিমধ্যেই চিনা সংস্থাটির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া, কৃত্রিম মেধা বা অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জামে এর তৈরি ডির্যাম কতটা কার্যকর, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সেখানে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স বা কোয়ালকম।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মোটের উপর ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে ভারতীয় শেয়ারবাজার। সেখানে দুর্দান্ত কামব্যাক করেছে এ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র। কৃত্রিম মেধা চলে আসার দরুণ তাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যেতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছিল। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। বরং বর্তমানে এআই সংক্রান্ত বহু পরিষেবা দিচ্ছে তারা। ফলে, প্রযুক্তির দুনিয়ায় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির চাহিদা।
চিপ তৈরিতে এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া বা চিনের পর্যায়ে পৌঁছোতে পারেনি ভারত। তবে, এই ক্ষেত্রে উন্নতি করার লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লিও। সম্প্রতি, বেঙ্গালুরুতে ঘরের মাটিতে তৈরি দুই ন্যানোমিটারের চিপ জনসমক্ষে আসেন কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স দফতরের মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। তবে এই পণ্য উৎপাদনে চাই বিরল খনিজ, যার মূল নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে রয়েছে বেজিঙের হাতে।