পৃথিবী সর্বোত্তম বাসযোগ্য নয়, আরও উন্নত বাসস্থান রয়েছে মহাকাশেই! ‘ভাল গ্রহের’ খোঁজে বিশেষ প্রচেষ্টা শুরু বিজ্ঞানীদের
বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, পৃথিবী নাকি মানুষের জন্য সবথেকে উপযুক্ত আবাসস্থল নয়। এই মহাবিশ্বে এমন আরও গ্রহ রয়েছে, যেখানে মানুষ এখানের থেকে ঢের ভাল থাকবে!
ছোটবেলা থেকে আমরা পড়ে আসছি, কেবল পৃথিবীতেই মানুষের বসত রয়েছে। কারণ হিসাবে বিজ্ঞান এত দিন আমাদের জানিয়েছে, সৌরজগতের বাকি গ্রহগুলি প্রাণ প্রতিপালনের যোগ্য নয়। সেই জন্য পৃথিবী বাদে বাকি কোনও গ্রহে মানুষের বসবাস নেই। জল ও অক্সিজেনের অনুপস্থিতি, অতি উচ্চ তাপমাত্রা - এ সমস্ত নানা কারণে পৃথিবীর বাইরে মানুষ পাকাপাকি ভাবে নিজের আস্তানা গড়ে তুলতে পারেনি।
কিন্তু, বর্তমানে বিজ্ঞানীদের গলায় শোনা যাচ্ছে অন্য সুর। বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, পৃথিবী নাকি মানুষের জন্য সবথেকে উপযুক্ত আবাসস্থল নয়। মহাবিশ্বে এমন আরও গ্রহ রয়েছে, যেখানে মানুষ এখানের থেকে ঢের ভাল থাকবে। শুনতে অবাক ঠেকলেও গবেষণা তেমনই দাবি করছে।
‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, পৃথিবীর থেকে আকৃতিতে বৃহৎ গ্রহগুলি নাকি জীবকুলের জন্য পৃথিবীর থেকে আরও বেশি বসবাসযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে যে সমস্ত গ্রহ নির্দিষ্ট ধরনের নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, সেগুলি নাকি জীবকুলের প্রতিপালনের জন্য পৃথিবীর থেকেও বেশি ভাল।
এ সমস্ত গ্রহকে বিজ্ঞানীরা ‘সুপারহ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অতিবাসযোগ্য জগৎ’-এর তকমা দিচ্ছেন। গ্রহগুলিকে এমন তকমা দেওয়ার কারণ, সেগুলির তাপমাত্রা নাকি পৃথিবীর থেকে অধিক আরামদায়ক। একই সঙ্গে বলা হচ্ছে, সে সমস্ত গ্রহে নাকি জলের পরিমাণও পৃথিবীর থেকে বেশি! যার ফলে মনে করা হচ্ছে, এ সমস্ত গ্রহে প্রাণীকুল অনেক বেশি সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে এবং বিকশিত হতে পারবে।
এ সমস্ত সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ নাকি পৃথিবীর থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অধিক প্রশস্ত। একই সঙ্গে এই গ্রহগুলির ভর পৃথিবীর ভরের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলেও দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের মতে, সে সমস্ত গ্রহের মহাকর্ষ বল এবং কেন্দ্রে অবস্থিত চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি পৃথিবীর তুলনায় বেশি। সেই কারণে এখানকার বায়ুমণ্ডলের প্রকৃতি নাকি পৃথিবীর থেকে বেশি ভাল। যার ফলে এ সকল গ্রহের জলবায়ু পৃথিবীর তুলনায় অধিক উষ্ণ, মনোরম এবং স্থিতিশীল। একই সঙ্গে চৌম্বক ক্ষেত্র শক্তিশালী হওয়ায় ক্ষতিকারক বিকিরণের বিরুদ্ধে অধিক সুরক্ষা প্রদান করে।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীতে অবস্থিত ক্রান্তীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং অগভীর জলাশয়গুলির বাস্তুতন্ত্র বৈটিত্রময় এবং সমৃদ্ধ। ঠিক তেমনই সে সমস্ত গ্রহেও বিশাল অগভীর সমুদ্র, হ্রদ এবং দ্বীপ থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সেগুলি আরও বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত। সেই কারণে এ সমস্ত গ্রহে প্রাণের বৈচিত্র আরও বেশি দেখা যেতে পারে বলে অনুমান করছেন বিজ্ঞানীরা।
তবে পৃথিবী যে বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে সর্বোত্তম নয়, তা নিয়ে আজ থেকে বহু দিন আগেই আলোচনা শুরু হয়েছিল। ২০১০ সালে জ্যোর্তিবিজ্ঞানী রেনে হেলার এবং জন আর্মস্ট্রং সর্বপ্রথম এ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। ২০১৪ সালে তাঁরা একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন।
সেখানে জানানো হয়েছিল, পৃথিবী বিপুল জীববৈচিত্রের ধারক এবং বাহক ঠিকই, কিন্তু পুরোটাই টিকে রয়েছে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর। পৃথিবী যদি সূর্যের আর একটু কাছে থাকত, তা হলে বিষয়টা নাকি অন্য রকম হলেও হতে পারত। পৃথিবীর বুকে বয়ে চলা মহাসাগরগুলির গঠনেও দেখা যেত পরিবর্তন।
আরও পড়ুন:
সূর্যের তাপমাত্রা যেহেতু দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই কারণে পৃথিবীর ঝুঁকিও নাকি উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের অনুমান, প্রায় ৫০ কোটি বছরের মধ্যে পৃথিবী এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর থেকে অধিক বাসযোগ্য গ্রহগুলির তালিকায় সবার প্রথমে রয়েছে কে-ডোয়ার্ফ নামের নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে চলা গ্রহগুলি। এই নক্ষত্রগুলি আকৃতিতে সূর্যের থেকে ছোট এবং শীতল। এ ছাড়াও সূর্যের মতো এগুলির প্রাণশক্তি ফুরিয়ে আসছে না। এ সমস্ত তারা অনেক ধীরে ধীরে জ্বলে বলে দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। এগুলি কয়েক হাজার কোটি বছর ধরে একনাগাড়ে জ্বলতে পারে।
তবে এখনই বিজ্ঞানীরা এমন কোনও গ্রহের সন্ধান পাননি, যেখানে জীবকুলের অস্তিত্ব বর্তমান। কোনও গ্রহের পরিবেশ অনুকূল মানেই যে সেখানে প্রাণের অস্তিত্বও বর্তমান, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তেমনটি আদৌ রয়েছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
সম্ভাব্য অতিবাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীন ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা প্ল্যাটো (প্ল্যানেটারি ট্রানজিট্স অ্যান্ড অসকিলেশনস অফ স্টারস) নামের একটি মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা করছে। সম্ভবত ২০২৭ সালের মার্চে এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত করা হবে। মনে করা হচ্ছে, এই অভিযানের মাধ্যমে বসবাসযোগ্য অন্যান্য গ্রহের খোঁজ পাওয়া গেলেও যেতে পারে।
এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী হেলার জানিয়েছেন, এই অভিযান হয়তো তাঁদের হতাশ করবে না। তবে গ্রহের সন্ধান পেলেই যে ব্যগপত্তর নিয়ে সেখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করা যাবে, তা অবশ্যই নয়। নতুন গ্রহ খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে বিকল্প বসতের প্রথম ধাপ পেরোনো হবে। এর পর শুরু হবে আসল পরীক্ষা। প্রথমেই সেখানকার বায়ু পরীক্ষা করে দেখা হবে।
এর পাশাপাশি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাও ২০৪০ সালে একটি অভিযান শুরু করার কথা বলেছে। সেটির মাধ্যমে বাসযোগ্য অন্য গ্রহগুলির সন্ধান পাওয়া আরও সহজ হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, যদি কিছু গ্রহে আরও স্থিতিশীল জলবায়ু, উপযুক্ত পরিবেশ এবং বিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত কয়েকশো কোটি বছর থাকে, তবে সেগুলি জটিল প্রাণের বিকাশের জন্য অনুকূল সুযোগ দিতে পারে।