নামী সংস্থার পোশাক থেকে জুতো, সবই মেলে জলের দরে! মধ্যরাতে খোলে এই বাজার, ব্যবসা হয় ‘বিশেষ’ উপায়ে
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে অর্থনীতিতে কোপ পড়লে গঠিত হয় এই বাজার। ক্রমে তার নাম বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের দেশের মানুষেরাও কেনাকাটা করতে যান এখানে।
নামী সংস্থার জিনিস ব্যবহারের ইচ্ছা অনেকেরই থাকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সে সমস্ত জিনিসের প্রতি আকর্ষণ একটু বেশিই দেখা যায়। বন্ধুরা ব্যবহার করছে যখন আমি কেন পারব না, এই চিন্তা মাথায় জেঁকে বসে তাঁদের। আগের প্রজন্মের মানুষেরাও যে এ বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছেন তা নয়। ভাল জিনিস ব্যবহারের ইচ্ছা বয়সনির্বিশেষে সকলের মধ্যেই বর্তমান।
কিন্তু শখ থাকলেই তো তা পূরণ করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন টাকার। সকলের পক্ষে তো আর লাখ টাকার জুতো পরা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে ইচ্ছা আর বাস্তবে পরিণত করা যায় না। তবে সংস্থার লক্ষাধিক টাকার জুতোটির আদলে তৈরি নকল জুতো বাজারে খুঁজলেই পাওয়া যায়। দেখতে হুবহু একই রকম। পকেটও কাঁদে না, মনও ভরানো যায়।
কলকাতার গড়িয়াহাট, এসপ্ল্যানেড, খিদিরপুর প্রভৃতি জায়গায় এমন প্রচুর দোকান রয়েছে। সেখানে কেবল নামী সংস্থার ‘ফার্স্ট কপি’ (নামী সংস্থার আদলে হুবহু তৈরি করা নকল পণ্য) ঢেলে বিক্রি হয়। তবে কখনও কি ভেবে দেখেছেন সেগুলির উৎপত্তিস্থল কোথায়? কাঁচা হাতে তো নামী সংস্থার বানানো পণ্যের নকল জিনিস বানানো সম্ভব নয়। তা হলে কারা বানায় সে সব?
দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনায় রয়েছে এর বিশাল সম্ভার। বেশির ভাগ মানুষ আর্জেন্টিনা বলতে নীল-সাদা পতাকা, মারাদোনা এবং মেসিকেই বোঝেন। তবে ফুটবলের দেশে তারকা ফুটবলার তৈরির সঙ্গেই চলে সংস্থার জাল পণ্য তৈরির কারবার। বসে বিশাল হাট। সেটিকে চোরবাজার বললেও অত্যুক্তি হবে না।
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেস। সেই শহরে চাকচিক্যের কোনও অভাব নেই। আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, সেতু, রংচঙে খাবারের দোকানে মোড়া শহরটি। কিন্তু সেখানকার শহরতলিও যে অতটা জাঁকজমকপূর্ণ, তা কিন্তু নয়। বুয়েনোস আইরেসের শহরতলিতেই গজিয়ে উঠেছে দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ অসংগঠিত বাজার।
আরও পড়ুন:
অসংগঠিত বাজার হলেও সেটির ইতিহাস বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিক। আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে দেখা যায় বিপুল পরিবর্তন। বলিভিয়া থেকে দলে দলে অভিবাসী আর্জেন্টিনায় ঢুকে পড়তে শুরু করেন। অন্য দিকে, আর্জেন্টিনার বহু কারখানা সেই সময় বন্ধ হয়ে যায়। বহু মানুষের চাকরি যায়।
উভয় পক্ষকেই পেটের টানে জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে বার করতে লেগে পড়তে হয়। বুয়েনোস আইরেসের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলা নদী মাতানজ়া-রিয়াচুয়েলোর পাশের শহরতলিতে চাকরিহারা এবং বলিভীয় অধিবাসীরা খোলা আকাশের নীচে জামাকাপড় বিক্রি করা শুরু করেন। জন্ম নেয় লা সালাদা। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অসংগঠিত বাজার।
ধীরে ধীরে সেই বাজারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। লা সালাদায় প্রধানত জামাকাপড়, জুতো এবং ক্রীড়া সরঞ্জাম বিক্রি করা হয়। যে কোনও নামী সংস্থার ‘ফার্স্ট কপি’ সেই বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। বলা হয়, কোনও সংস্থার এমন কোনও জামাকাপড়, জুতো এবং ক্রীড়া সরঞ্জামের হুবহু একই দেখতে নকল পণ্য নেই, যা লা সালাদায় গেলে পাওয়া যাবে না।
সাল ২০০১। আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে আবার বিপর্যয় দেখা যায়। দু’বেলার খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় মানুষকে। সেই অবস্থায় পয়সা খরচ করে জামা-জুতো কেনার সাধ্যি কোথায়! দেশের মানুষদের কাছে লা সালাদার জনপ্রিয়তা তখন আরও বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন:
আর্জেন্টিনার ধনবানদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লেও, বুয়েনোস আইরেসের দক্ষিণ প্রান্তের নোংরা শহরতলির বাসিন্দাদের হাসি চওড়া হতে শুরু করে। দেশ জুড়ে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষেরা লা সালাদায় জিনিস কেনার জন্য ভিড় জমাতে থাকেন।
বর্তমানে লা সালাদায় হাজার হাজার দোকান রয়েছে। বেশির ভাগই খোলা আকাশের নীচে গজিয়ে ওঠা দোকান। তবে তিনটি প্রধান বাজারও রয়েছে। পুরনো গ্যারাজকে দোকান হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে তিন অভ্যন্তরীণ বাজার। পুন্তা মোগোতে, উরকুপিনা এবং ওসান।
লা সালাদার ভিতরেই রয়েছে দর্জিদের দোকান। তাঁরাই নামী সংস্থার পণ্যের নকল করে জিনিসপত্র বানান সেখানে। কেবল লা সালাদাতেই নয়, বিশ্বের বহু প্রান্তে সেখান থেকে এ সমস্ত পণ্য সরবরাহ করা হয়। নামীদামি সংস্থার পণ্যের নকলের পাশাপাশি সাধারণ পোশাক, জুতো, ক্রীড়া সরঞ্জামও তৈরি করেন তাঁরা।
প্রধানত বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে এবং পেরু থেকে আসা অভিবাসীরাই এখানে থেকে পণ্য তৈরি এবং বিক্রি করেন। তেমনই কেবল আর্জেন্টিনা নয়, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ের মানুষেরাও লা সালাদায় গিয়ে বাজার করেন। মূলত বাজার করার জন্যই তাঁরা সেখানে ছুটে যান।
তবে যে কোনও দিন, যখন ইচ্ছা চলে গেলেই লা সালাদায় কেনাকাটা করা যাবে না। রবিবার, বুধবার এবং সোমবার করে এই বাজার খোলা হয়। সময়ের ধরনেও রয়েছে চমক। দুপুরবেলা বা সন্ধ্যাবেলা এই বাজার খোলা থাকে না। মধ্যরাতে খোলে লা সালাদা। রাত যত বাড়ে, ভিড় তত বৃদ্ধি পায়। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের ভিড়ও কমতে থাকে।
আজকাল সর্বত্র অনলাইন লেনদেনের রমরমা থাকলেও, এই বাজারে অনলাইন লেনদেনের কোনও জায়গা নেই। নগদ মূল্যে কেনাকাটা করতে হয়।
অভিবাসীদের তৈরি বাজার যখন, সরকারকে ফাঁকি দিয়েই যে এই সমস্ত কাজ চলছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই বাজারে চলে বিভিন্ন বেআইনি কাজও। সরকারের হাত যখন নেই, তাই বাজারের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিজেকে কেউকেটা মনে করেন। তাঁরাই ঠিক করেন কোন দোকানের কত ভাড়া হবে। তোলাবাজিও চলে তাঁদের মনোমতো।
তেমনই এক কেউকেটা হলেন পুন্তে মোগোর পরিচালক হোর্জ কাস্তিলো। তিনি নিজেকে ‘লা সালাদার রাজা’ বলে দাবি করেন। তোলাবাজি এবং দোকানের ভাড়া ঠিক করার পাশাপাশি কাস্তিলোর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কাজের চক্র চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
২০১৭ সালে আর্জেন্টিনার পুলিশ লা সালাদায় তল্লাশি চালায়। সেই তল্লাশিতে গ্রেফতার হন কাস্তিলো। একই সঙ্গে বেশ কয়েক জন পুলিশেরও চাকরি যায়। লা সালাদা থেকে আরও কিছু মানুষকে গ্রেফতার করে আর্জেন্টিনার প্রশাসন। পুলিশদের গ্রেফতারির পিছনে কাস্তিলোকে বেআইনি কাজে সঙ্গ দেওয়ার অভিযোগ দায়ের করা হয়।
তবে লা সালাদা যে সে কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে তা ভাবলে ভুল হবে। সেই সময় কয়েকটি রাস্তার পারের দোকানকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরও একই ছন্দে এগিয়ে চলেছে এই অসংগঠিত বাজার। রমরমিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা।