সমুদ্রতলে অবস্থিত হয়েও বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র! মিথেনে পরিপূর্ণ অতি লবণাক্ত বিষাক্ত ‘হতাশার হ্রদে’ বাঁচে না কোনও প্রাণ
যে কোনও সমুদ্রই সামুদ্রিক বহু প্রাণীর বাসস্থান। তবে বিশেষ এক উপসাগরের এই স্থানে কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। কোনও সামুদ্রিক প্রাণী যদি ভুল করে সাঁতরে সেই অংশে পৌঁছেও যায়, সেখান থেকে ফেরে না আর।
সাধারণত জলাশয় মানেই নানা জীবের বাসস্থান বোঝায়। এমন বহু প্রাণীই রয়েছে যারা জলেই বসবাস করে। ডাঙায় বাঁচে না সেগুলি। কিন্তু এমন এক জলাশয় রয়েছে যেখানে কোনও জলজ প্রাণীও বাঁচতে পারে না। সেখানে এক বার যদি কোনও প্রাণী ভুল করেও পৌঁছোয়, তা হলে সেটির মৃত্যু অবধারিত।
তেমনই এক লবণাক্ত জলের ডুবো হ্রদ বা ‘ব্রাইন পুল’ রয়েছে মেক্সিকো উপসাগরের তলদেশে। সেটি ‘জাকুজ়ি অফ ডিসপেয়ার’ হিসেবেও পরিচিত। ইংরেজিতে ‘ডিসপেয়ার’ শব্দটির অর্থ হল হতাশা। মেক্সিকো উপসাগরের গহীনে অবস্থিত এই হ্রদকে হতাশার সঙ্গে তুলনা করার নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ কারণ।
এমনিতে মেক্সিকো উপসাগর বহু সামুদ্রিক প্রাণীর বাসস্থান। তবে সাগরের এই স্থানে কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। কোনও সামুদ্রিক প্রাণী যদি ভুল করে সাঁতরে সেই অংশে পৌঁছেও যায়, সেখান থেকে ফেরে না আর। সেখানেই মৃত্যু ঘটে তার।
মেক্সিকো উপসাগরের তলদেশে প্রায় তিন হাজার তিনশো থেকে চার হাজার দুশো ফুট গভীরতায় এই হ্রদটি অবস্থিত। পরিধিতে এটি প্রায় ৩০ মিটার চও়ড়া। হ্রদটি প্রায় চার মিটার গভীর।
মেক্সিকো উপসাগরের জলের থেকে এই হ্রদের জল প্রায় পাঁচ গুণ বেশি লবণাক্ত। ঘনত্বও অনেক বেশি। লবণাক্ত এবং ঘনত্বে বেশি হওয়ায় সমুদ্রের তলদেশে এই জল একটি স্বতন্ত্র উপকূলরেখা তৈরি করেছে। সেই কারণে এই হ্রদের জল বাকি সমুদ্রের জলের সঙ্গে মিশে যায় না।
আরও পড়ুন:
গভীর সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা সাধারণত চার ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। কিন্তু ভূ-তাপীয় শক্তির প্রভাবে মেক্সিকো উপসাগরের এই লবণাক্ত হ্রদের জলের উষ্ণতা প্রায় ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সেই কারণে এর ডাকনামে ‘জাকুজ়ি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু সমুদ্রের বাকি অংশের তুলনায় এখানকার জল এতটা বেশি লবণাক্ত হল কী করে? সেই কারণ জানার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে কয়েক লক্ষ বছর আগে। সেই সময় মেক্সিকো উপসাগর এত বেশি গভীর ছিল না। অগভীর উপসাগের জল বাষ্পীভূত হয়ে উপরে উঠে গেলেও, তাতে মিশ্রিত নুন তলদেশে মাটির নিচে চাপা পড়ে যেতে থাকে।
লবণের স্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটিতে চাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে স্তরগুলিতে ফাটল ধরতে শুরু করে। মাটি ফেটে বেরিয়ে আসে লবণ। যা সেই অংশের জলের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে সেখানকার জলকে বাকি অংশের জলের তুলনায় অতিরিক্ত নোনতা করে তোলে।
মেক্সিকো উপসাগরের তলদেশে অবস্থিত লবণাক্ত হ্রদের জলে অক্সিজেন প্রায় নেই বললেই চলে। বদলে তাতে মিশে রয়েছে ক্ষতিকারক মিথেন গ্যাস এবং হাইড্রোজ়েন সালফাইড। সেই কারণে এখানকার জল কেবলই লবণাক্ত নয়, বিষাক্তও বটে। কোনও প্রাণী এখানে ঢুকে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে সেটির মৃত্যু ঘটে।
আরও পড়ুন:
প্রধানত কাঁকড়া এবং মাছই এই হ্রদে ভুলবশত প্রবেশ করে ফেলে। মৃত্যুর পর সেগুলির দেহ সেই হ্রদের তলদেশ বা প্রাচীরে আটকে রয়ে যায়।
এমনকি এই জল দিয়ে তৈরি হওয়ার বরফও মারাত্মক প্রকৃতির। সেগুলি ‘ব্রিনিকল’ হিসাবে পরিচিত। স্বাভাবিক বরফের তুলনায় এই জলের বরফ দ্রুত জমে যায়। এখানেই শেষ নয়, সেই বরফ খণ্ডের ভেসে বেড়ানোর পথে যদি কোনও জীব ভুল করেও চলে আসে, সেগুলি বরফের গায়ে আটকে যায় এবং মৃত্যু ঘটে।
লবণাক্ত এই জলাশয়ের বাইরের প্রাচীরটি বিভিন্ন খনিজ পদার্থ এবং গভীর সমুদ্রের ঝিনুক দিয়ে তৈরি। এই ঝিনুকগুলির ভিতরে বসবাসকারী মিথোজীবী ব্যকটেরিয়া হ্রদ থেকে মিথেন সংগ্রহ করে কেমোসিন্থেসিস পদ্ধতিতে শক্তিতে রূপান্তিত করে। সেই শক্তির প্রভাবে হ্রদের বর্হিভাগের প্রাচীরটি সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হচ্ছে।
স্বাভাবিক ভাবেই আজ পর্যন্ত কোনও মানুষ এই হ্রদের নিকট পৌঁছতে পারেননি। ‘রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল’ ব্যবহার করে স্থানটির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সেখানকার চরম পরিবেশে বসবাসকারী বিশেষ ধরনের অনুজীবদের (এক্সট্রিমোফাইল) নিয়ে গবেষণা করছেন।