আল-কায়েদার জঙ্গিদের ছবি পোস্ট, ওয়েবসাইটে মৌলবাদের শিক্ষা! ফ্লাইদুবাই-কাণ্ডে ধৃতকে ঘিরে বাড়ছে রহস্য
ফ্লাইদুবাই-কাণ্ডে ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরের উপর হামলার ঘটনায় ধৃত সহকারী বিমানচালকের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে তদন্তে নেমেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সেখানেই উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ফ্লাইদুবাই-কাণ্ডে অভিযুক্ত সহকারী বিমানচালককে ঘিরে ঘনীভূত রহস্য। জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির নাম হামাম আল-হাম্মামি। সমাজমাধ্যমে কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদার সন্ত্রাসীদের বহু ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। তা ছাড়া মৌলবাদী ওয়েবসাইটেও নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল তাঁর। পাশাপাশি, হামামের ‘বিতর্কিত’ কর্মজীবনও আতশকাচের তলায় রেখেছেন তদন্তকারীরা।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হেফাজতে রয়েছেন অভিযুক্ত সহকারী বিমানচালক। সরকারি ভাবে তাঁর সম্পর্কে খুব কম তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে। সিবিএস নিউজ় এবং সিএনএন-এর মতো পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ধৃতের বাবা ওমানের বাসিন্দা এবং মা সিরীয়। তবে, আমিরশাহিতে জন্ম হয় তাঁর। জীবনের বেশির ভাগ সময় সেখানেই কাটান তিনি। এর জেরে আনুষ্ঠানিক ভাবে হামামের নাগরিকত্ব স্বীকার করেনি ওমান।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, অভিযুক্তের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। তাঁর কোনও ছবি প্রকাশ করেনি আমিরশাহি প্রশাসন। তবে, লিঙ্কডইন প্রোফাইল ঘেঁটে হামামকে ইংল্যান্ডের বাকিংহ্যামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটির প্রাক্তনী হিসেবে চিহ্নিত করেছে বহু গণমাধ্যম। ২০২৩ সালে সেখান থেকে তিন বছরের এভিয়েশন ম্যানেজ়মেন্টের ডিগ্রি পান তিনি। তার পরই যোগ দেন ওমান ও মরোক্কোর বিমানসংস্থায়।
লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ওমানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ওমান এয়ারে টানা সাত বছর কাজ করেন হামাম আল-হাম্মানি। ২০২৫ সালের জুনে মরোক্কোর জাতীয় বিমানসংস্থা রয়্যাল এয়ার মরোক-এ যোগ দেন তিনি। এ বছরের জানুয়ারিতে সেই চাকরিও ছাড়েন অভিযুক্ত। সম্ভবত, তার পরেই আমিরশাহির সরকারি উড়ান সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ে চলে আসেন ওই ব্যক্তি। যদিও লিঙ্কডইনের পেজে তার কোনও উল্লেখ নেই।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই সময়কালের সঙ্গে অভিযুক্তের ফ্লাইদুবাইয়ে কাজের মেয়াদের আশ্চর্য মিল রয়েছে। হামামের এক সহকর্মী ইজ়রায়েলি গণমাধ্যম চ্যানেল-১৬কে জানান, প্রায় আট মাস আগে আমিরশাহির উড়ান সংস্থাটিতে যোগ দেন অভিযুক্ত। সেটা এ বছরের ফেব্রুয়ারি। ফলে, মরোক্কোর চাকরি ছেড়ে সরাসরি নিজের জন্মস্থান তথা আরব রাষ্ট্রটিতে তিনি ফিরে আসেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ওমান এয়ারে কর্মরত থাকাকালীন মৌলবাদী চিন্তাভাবনার জেরে তদন্তের মুখে পড়েন আল-হাম্মানি। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে মৌলবাদী ওয়েবসাইট ঘাঁটাঘাঁটির অভিযোগ। সঙ্গে সঙ্গেই বিমান চালানোর দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয় ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত উড়ান সংস্থা। তবে ছাঁটাই না করে দফতরের প্রশাসনিক কাজে হামামকে নিযুক্ত করে তারা।
ইজ়রায়েলি টিভি চ্যানেল-১৬ জানিয়েছে, টেবিল-চেয়ার বসে কাজ করার বিষয়টি একেবারেই পছন্দ করেননি অভিযুক্ত আল-হাম্মানি। তাই গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ওমান ছেড়ে মরোক্কো চলে যান তিনি। এতে ককপিটে ফেরার রাস্তা খুলে যায় তাঁর। তবে সেখান থেকে তাঁর ফ্লাইদুবাইয়ের চাকরি পাওয়ার বিষয়টি বেশ রহস্যবৃত। এ ব্যাপারে বিশেষ কারও সুপারিশ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না কোনও ইহুদি গণমাধ্যম।
আল-হাম্মানির ব্যাপারে টাইমস অফ ইজ়রায়েলের কাছে মুখ খুলেছেন তাঁর আরও এক সহকর্মী। তিনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনে হামামকে অত্যন্ত ধার্মিক বলা যেতে পারে। তিনি দিনে বেশ কয়েক বার প্রার্থনা করতেন। মহিলাদের সঙ্গে করমর্দনে বিরত থাকতে দেখা যেত তাঁকে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বিষয়টি নাকি এড়িয়ে যেতেন ধৃত অভিযুক্ত।
সিএনএনের দাবি, ঘটনার দিন আল-হাম্মানির লিঙ্কডইন প্রোফাইল থেকে দু’টি পোস্ট করা হয়। সেগুলি আগে থেকে নির্ধারিত ছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও পরবর্তী সময়ে সরিয়ে দেওয়া হয় ওই সমস্ত পোস্ট। এর মধ্যে প্রথমটিতে একাধিক ভিডিয়ো ক্লিপ ছিল। তাতে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের ককপিট দেখানো হচ্ছিল। বিশেষ বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কি এই পোস্ট? উঠছে সেই প্রশ্নও।
আরও পড়ুন:
এ ছাড়া, সম্ভবত দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তোলা আর একটি ভিডিয়ো ঘটনার দিন পোস্ট হয় আল-হাম্মানির লিঙ্কডইন প্রোফাইলে। সেখানে আবার ইজ়রায়েলি বিমানসংস্থা এল আল-এর একটি উড়োজাহাজকে দেখানো হয়েছে। ককপিটের ভিডিয়োটি ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর তোলা বলে অনুমান। সেখানে ফ্লাইট নম্বর ওএমএ৬২৪ শব্দগুলি দেখতে পাওয়া গিয়েছে। ওই সময় ওমান এয়ারে কর্মরত ছিলেন ধৃত অভিযুক্ত।
এই ভিডিয়োগুলির একেবারে শেষ রয়েছে আল-কায়েদা নেতা তথা কুখ্যাত সন্ত্রাসী আইমান আল-জাওয়াহিরির ছবি। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন-লাদেনের মতো তিনিও ছিলেন ৯/১১ জঙ্গি হামলার অন্যতম মূলচক্রী। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে হওয়া ওই সন্ত্রাসী আক্রমণে প্রাণ হারান প্রায় ৩,০০০ নিরীহ নাগরিক। আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৬,০০০।
৯/১১ হামলার বদলা নিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে আমেরিকা। আল-কায়েদার কোমর ভাঙতে প্রথমেই সামরিক অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে মার্কিন ফৌজ। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের গোপন আস্তানায় ঢুকে লাদেনকে নিকেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনী। এর ১০ বছরের মাথায় (পড়ুন, ২০২২ সাল) কাবুলে তাঁদেরই ড্রোন হামলায় মৃত্যু হয় জাওয়াহিরির।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, হামামের লিঙ্কডইন প্রোফাইলে পোস্ট করা ভিডিয়োয় কুখ্যাত আল-কায়েদা নেতা হুমাম খলিল আবু-মুলাল আল-বালাউইয়ের ছবিও পাওয়া গিয়েছে। ২০০৯ সালে তাঁর ফিদায়েঁ হামলায় মৃত্যু হয় মার্কিন গুপ্তচরসংস্থা সিআইএ-র (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) নয় সদস্যের। এ ছাড়া, কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) সাহায্যে তৈরি একটি ভিডিয়োও ছিল সেখানে।
ওই এআই ভিডিয়োটিতে আবার পশ্চিম এশিয়ার তিনটি পবিত্র ধর্মস্থলকে দেখানো হয় বলে জানিয়েছে সিএনএন। সেগুলি হল, সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা এবং প্যালেস্টাইনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের অন্তর্গত জেরুজালেম। অন্য দিকে, ২০২১-’২২ সালের মধ্যে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা আল-হাম্মামির যাবতীয় পোস্ট কৃত্রিম মেধার সাহায্যে বিশ্লেষণ করেছে সিএনএন। সেখানে ফুটে উঠেছে তাঁর নারীবিদ্বেষী মানসিকতার পরিচয়।
সিএনএন জানিয়েছে, এক্স হ্যান্ডলের পোস্ট অনুযায়ী বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছিলেন হামাম। তবে, তাঁর সমস্ত শর্ত মানবে এমন জীবনসঙ্গিনী পেতে চেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হল নিকাব বা মুখাবরণ পরা এবং বিয়ের পর চাকরি না করা। ২০২২ সালের একটি পোস্টে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে ইজ়রায়েলের তেল আভিভ যাওয়ার পথে ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিতের উপর হামলা চালান অভিযুক্ত সহকারী বিমানচালক। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় তাঁকে। ফলে মাঝ-আকাশে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় ওই বিমান। ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই ১৪ হাজার ফুট নীচে নেমে যায় সেটি।
ওই সময় কোনও মতে ককপিটের দরজা খুলে দেন স্মিত। ফলে হুড়মুড়িয়ে সেখানে ঢুকে হামলাকারীকে কব্জা করে ফেলেন যাত্রীদের একাংশ। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েক জন ছিলেন বিমানচালক। ফলে উড়োজাহাজটির সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করতে সমস্যা হয়নি। বিমান মাটি ছুঁতেই স্মিতকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। পাশাপাশি, সহকারী পাইলটকে গ্রেফতার করে আমিরশাহির হাতে তুলে দেন রিয়াধ প্রশাসন।
স্মিতের সাহসিকতায় প্রাণে রক্ষা পান ১৮০ জন যাত্রী। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ইহুদি। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেন ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তাঁর কথায়, ‘‘অভিযুক্ত ইসলামপন্থী উগ্র মতাদর্শে দীক্ষিত। বিমানটি ধ্বংস করে ইজ়রায়েলি নাগরিকদের হত্যাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।’’ একে সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে উল্লেখ করেছে তেল আভিভ।