Advertisement
E-Paper

নির্জন সৈকতে ঠিকানাহীন সিঁড়ি, নিশ্চুপ শয়ে শয়ে ইমারত, পথঘাট! কেন জনপ্রাণীর সাড়া মেলে না ‘ভূতুড়ে শহরে’?

মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকগুলির প্রতিটিতে শত শত অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। কিন্তু, হাতেগোনা ছ’টিতে আলো জ্বলতে দেখা যায়। বিশ্বাস করা কঠিন যে এখানে আদৌ কেউ বসবাস করেন।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:২৫
Forest City Malaysia
০১ / ১৮

বিশাল আবাসন কমপ্লেক্স। কিন্তু পয়সা দিয়েও সেখানে কেউই থাকতে চান না। কষ্ট করে দিনকয়েক থাকলেও ছুটে পালাতে চাইবেন যে কেউ। আবাসনের চারপাশ পরিষ্কার, ঝকঝকে রাস্তাঘাট। এত ভাল করে রক্ষণাবেক্ষণ করা অথচ সেগুলি উপভোগ করার মতো কেউ নেই। গোটা শহরটাই যেন প্রাণহীন। সমুদ্রের দিকে মুখ করা টাওয়ার ব্লকের এক শয্যাবিশিষ্ট ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে মনোরম প্রকৃতি ধরা দেয় ঠিকই, তবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই একাকিত্ব গ্রাস করতে পারে!

Forest City Malaysia
০২ / ১৮

দক্ষিণ মালয়েশিয়ার একেবারে প্রান্তে জোহরে অবস্থিত ‘ফরেস্ট সিটি’। চিনের তৈরি একটি বিশাল আবাসন কমপ্লেক্স। চিনের বৃহত্তম আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কান্ট্রি গার্ডেন’ ২০১৬ সালে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অধীনে ১০০,০০০,০০০,০০০ ডলার মূল্যের এই মেগা-প্রকল্প ‘ফরেস্ট সিটি’ উন্মোচন করে। প্রকল্পটি একটি ‘স্বর্গীয় শহর’ তৈরির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। জানা যায়, মালয়েশিয়ার নতুন শহরটিকে ‘ভবিষ্যতের স্মার্ট শহর’ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যা প্রকৃতি এবং স্থাপত্যের সমন্বয়ে একটি রূপকথার শহরে পরিণত হবে। তবে, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটেনি। প্রকল্পটি ব্যর্থ হয় এবং এখনও পর্যন্ত পুরো প্রকল্পের মাত্র ১৫ শতাংশ নির্মিত হয়েছে।

Forest City Malaysia
০৩ / ১৮

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, সেই সময় চিনে আবাসন ব্যবসা তুঙ্গে ছিল। নির্মাণকারীরা মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য দেশে এবং বিদেশে আবাসন নির্মাণের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করছিলেন। মালয়েশিয়ায় ‘কান্ট্রি গার্ডেনের’ পরিকল্পনা ছিল একটি পরিবেশবান্ধব মহানগরী গড়ে তোলা। সেখানে গল্‌ফ কোর্স, ওয়াটারপার্ক, অফিস, বার এবং রেস্তরাঁ রাখার পরিকল্পনা ছিল। সংস্থা দাবি করেছিল, ‘ফরেস্ট সিটি’ প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের আবাসস্থল হবে। কিন্তু, বর্তমানে এর মাত্র কয়েকটি ইউনিটে গুটিকয়েক লোক বসবাস করেন।

Forest City Malaysia
০৪ / ১৮

এক দশক পরেও প্রকল্পটি এক ঊষর নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি মনে করিয়ে দেয়, চিনের আবাসন সঙ্কটের প্রভাব বোঝার জন্য সে দেশে থাকার প্রয়োজন নেই। এমন ধারণাও করা হয়, ‘ফরেস্ট সিটি’তে সম্পত্তির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়েরা তা কিনতে পারছিলেন না, যার ফলে এলাকাটি খালি পড়ে ছিল।

Forest City Malaysia
০৫ / ১৮

‘ফরেস্ট সিটি’র প্রচার করা হয়েছিল ‘সমগ্র মানবজাতির জন্য এক স্বপ্নিল স্বর্গ’ হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে এটি সরাসরি চিনের অভ্যন্তরীণ বাজারকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রকল্প উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষদের বিদেশে সম্পত্তির মালিক হওয়ার সুযোগ দিত। কারণ হিসেবে জানা যায়, সেখানে বাড়ির বিক্রয়মূল্য সাধারণ মালয়েশীয়দের নাগালের বাইরে ছিল। চিনা ক্রেতাদের জন্য সম্পত্তিটি একটি বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা স্থানীয় মালয়েশীয়দের কাছে ভাড়া দেওয়া যেতে পারে অথবা অবকাশ যাপনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

Forest City Malaysia
০৬ / ১৮

বাস্তবে নিকটতম প্রধান শহর জোহর বাহরু থেকে অনেক দূরে পুনরুদ্ধার করা দ্বীপের উপর নির্মিত ‘ফরেস্ট সিটি’র বিচ্ছিন্ন অবস্থান ভাড়াটেদের উৎসাহ জোগাতে পারেনি। এর ফলে স্থানীয় ভাবে এটি ‘ভূতুড়ে শহর’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ‘ফরেস্ট সিটি’র পরিবেশকে বেশ অদ্ভুত বলেও উল্লেখ করেছেন ভ্রমণ ভ্লগারেরা। তাঁদের মতে, এটিকে একটি পরিত্যক্ত অবকাশকেন্দ্রের মতো মনে হয়।

Forest City Malaysia
০৭ / ১৮

এখানে নির্জন সৈকতে রয়েছে শিশুদের একটি জীর্ণ খেলার মাঠ, মরচে ধরা পুরনো গাড়ি এবং সাদা কংক্রিটের তৈরি সিঁড়ি, যা শুরু হয়ে মাঝপথেই থেমে গিয়েছে। জলের ধারে কুমিরের কারণে সাঁতার কাটতে নিষেধ করে সতর্কতামূলক চিহ্ন রয়েছে।

Forest City Malaysia
০৮ / ১৮

বিশেষ ভাবে নির্মিত শপিং মলের অনেক দোকান এবং রেস্তরাঁ বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কিছু জায়গা নির্মীয়মাণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই ‘ভৌতিক, পরাবাস্তব’ আবহে বাচ্চাদের একটি খালি ট্রেন চিনা ভাষায় একটানা একটি গান বাজাতে বাজাতে মলের চারপাশে অবিরাম চক্কর দেয়।

Forest City Malaysia
০৯ / ১৮

পাশের ‘কান্ট্রি গার্ডেনের’ শোরুমে একটি বিশাল মডেল শহর রয়েছে। সেখানে দেখানো হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ ‘ফরেস্ট সিটি’ দেখতে কেমন হবে। স্টলে বসে থাকেন দুই বিরক্ত কর্মচারী। তাঁদের মাথার উপরের সাইনবোর্ডে লেখা— ‘ফরেস্ট সিটি; যেখানে সুখের কোনও শেষ নেই।’

Forest City Malaysia
১০ / ১৮

এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এলাকাটির শুল্কমুক্ত অবস্থা। সৈকতে ফেলে দেওয়া মদের বোতলের স্তূপ এবং স্থানীয় নেশাড়ুদের ছোট ছোট দল দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরাই এই শহরের সিংহভাগ কার্যকলাপ চালান।

Forest City Malaysia
১১ / ১৮

রাত নামলে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায় ‘ফরেস্ট সিটি’। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকগুলির প্রতিটিতে শত শত অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। কিন্তু, হাতেগোনা ছ’টিতে আলো জ্বলতে দেখা যায় সেখানে। বিশ্বাস করা কঠিন যে এখানে আদৌ কেউ বসবাস করেন। এক স্থানীয়ের কথায়, “এমনকি দিনের বেলাতেও সামনের দরজা দিয়ে বেরোলে করিডরটা অন্ধকার থাকে।”

Forest City Malaysia
১২ / ১৮

ওই স্থানীয় বাসিন্দা এবং তাঁর স্বামী একটি বহুতল ভবনের ২৮তলায় থাকেন। পুরো তলাটিতে তাঁরাই একমাত্র ভাড়াটিয়া। তবে তাঁরাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, “যাঁরা এখানে বিনিয়োগ করে জায়গা কিনেছেন, তাঁদের জন্য আমার দুঃখ হয়।”

Forest City Malaysia
১৩ / ১৮

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, নির্মাণকারীদের বছরের পর বছর ধরে লাগামহীন ঋণ গ্রহণের পর, সরকার একটি বুদবুদ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করে এবং ২০২১ সালে কঠোর সীমা আরোপ করে। এই সব পদক্ষেপের ফলে কোম্পানিগুলির বিশাল বিশাল প্রকল্প শেষ করার মতো নগদ অর্থ ফুরিয়ে যায়।

Forest City Malaysia
১৪ / ১৮

‘ফরেস্ট সিটি’র বর্তমান পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক কারণও। ২০১৮ সালে, মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহথির মহম্মদ ‘বিদেশিদের জন্য নির্মিত একটি শহর’-এর প্রতি তাঁর আপত্তির কথা উল্লেখ করে চিনা ক্রেতাদের জন্য ভিসা সীমিত করেছিলেন।

Forest City Malaysia
১৫ / ১৮

রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল নয়, এমন একটি দেশে মেগা-উন্নয়ন প্রকল্প নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কিছু বিশ্লেষক। বর্তমান মালয়েশীয় সরকার এই প্রকল্পের সমর্থক হলেও, ক্রেতাদের কাছে এটি স্পষ্ট নয় যে এই সমর্থন কত দিন এবং কী পরিমাণে স্থায়ী হবে।

Forest City Malaysia
১৬ / ১৮

চিনের আবাসন সঙ্কটের ক্ষেত্রে ‘ফরেস্ট সিটি’ হল উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কিছু স্থানীয় কারণ দায়ী হতে পারে। কিন্তু তা প্রমাণ করে, জনমানবহীন কোনও স্থানে হাজার হাজার অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করাই মানুষকে সেখানে বসবাস করতে রাজি করানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

Forest City Malaysia
১৭ / ১৮

খবরে প্রকাশ, মালয়েশিয়া ছাড়া আরও অন্যান্য দেশেও চিনের এমন আবাসন প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ‘ফরেস্ট সিটি’ এবং অন্যান্য জায়গায় এমনই শত শত প্রকল্পের পরিণতি কী হবে, সেই ভাগ্য নির্ভর করছে চিনা সরকারের উপরেই। তবে যে গুটি কয়েক বাসিন্দা এই ‘ফরেস্ট সিটি’তে রয়েছেন তাঁরাও ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। আর ফিরে আসার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

Forest City Malaysia
১৮ / ১৮

অনেকের মতে, ‘ফরেস্ট সিটি’কে দেখতে শহর বলে মনে হলেও আসলে এটি একটি ফাঁপা খোলস মাত্র। জলের কাছাকাছি, সবুজের কাছাকাছি থাকতে পারলেও সেখানে নেই কোনও প্রতিবেশী। জনশূন্য যে শহর পর্যটক, ভাড়াটে এবং ট্র্যাভেল ভ্লগারদের অপেক্ষায় থাকে প্রতিটি ছুটির মরসুমেই, কিন্তু সে মরসুম আসে না কখনও।

সব ছবি: সংগৃহীত

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও গ্যালারি

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy