জ্বলছে প্যারিস, পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় মেতে সরকার! উত্তাল তরুণদের ‘শিক্ষা’ দিতে যুদ্ধের জিগির তুলল ফ্রান্স?
শিক্ষাখাতে কাটছাঁটের প্রতিবাদে তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। আন্দোলন সামলাতে পুলিশ যখন হিমসিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই রাজধানী থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা প্রত্যক্ষ করলেন ফরাসি প্রেসি়ডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ।
তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনে উত্তাল গোটা দেশ। ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সামনে আগুন জ্বালিয়ে চলছে বিক্ষোভ। শুধু তা-ই নয়, উত্তাল আন্দোলনকারীদের হাতে মার খাচ্ছেন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা। তাঁদের রোষ থেকে রেহাই পায়নি দোকান-বাজার-শপিং মল। একের পর এক গাড়িতে চলেছে ভাঙচুর। এ-হেন পরিস্থিতিতে সবাইকে চমকে দিয়ে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল সেখানকার সরকার। তাতে বেশ উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক মহল।
ঘরোয়া কোন্দল সামাল দেওয়ার বদলে আণবিক হাতিয়ারের পরীক্ষায় মজে থাকা দেশটি হল ফ্রান্স। চলতি বছরের ৬ অক্টোবর আটলান্টিক মহাসাগর সংলগ্ন ব্রিটানি উপকূলে দূরপাল্লার পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে তারা। পরে প্রকাশ্যে আসে সেই সংক্রান্ত একটি ভিডিয়ো। তাতে খোদ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। হাজির ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পদস্থ কর্তা ও সেনা কমান্ডারদের একাংশও।
প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর উপস্থিতিতে ছোড়া সংশ্লিষ্ট পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রটির পোশাকি নাম ‘এম৫১.৩’। আণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ ‘লে ভিজিলাঁ’ থেকে এর সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করে ফরাসি ফৌজ। পরীক্ষার সময় অবশ্য তাতে কোনও বিস্ফোরক বা ওয়ারহেড ছিল না। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেয় ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। তাতে রাশিয়াকে নিয়ে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিতে দেখা গিয়েছে তাদের।
ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, ‘এম৫১.৩’ তাদের সর্বশেষ প্রজন্মের ডুবোজাহাজভিত্তিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। প্রথম পরীক্ষায় দুর্দান্ত কাজ করেছে সেটি। এই হাতিয়ারের অধিকাংশ তথ্যই গোপন রেখেছে প্যারিস। সামরিক বিশ্লেষকদের অনুমান, ক্ষেপণাস্ত্রটির নতুন সংস্করণের পাল্লা ৯,০০০-৯,৫০০ কিলোমিটার। বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের ফলে এর গতিবেগ দাঁড়ায় ২০-২৫ ম্যাক, অর্থাৎ শব্দের ২০-২৫ গুণ।
ত্রিস্তরীয় সলিড প্রোপেল্যান্ট বিশিষ্ট ফরাসি ক্ষেপণাস্ত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ মিটার এবং ওজন ৫২ টন। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি ফ্রান্সের নতুন ‘টিএনও-২’ মহাসাগরীয় পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম। একটি যুদ্ধজাহাজে সওয়ার হয়ে যার সফল উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। সম্ভাব্য রুশ আক্রমণের ভয়ে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে প্যারিস? তাঁর এ-হেন পদক্ষেপে উঠছে সেই প্রশ্নও।
আরও পড়ুন:
গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত ফ্রান্সকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে চলেছেন মাক্রোঁ। ২০২৫ সালে দেশের ছোট-বড় সমস্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকে সংঘাত পরিস্থিতির জন্য তৈরি হওয়ার নির্দেশ দেয় তাঁর সরকার। কিছু দিন সেখানে চলে মহড়াও। এ বছরের মার্চে ঐতিহাসিক ‘ইলে লংগুয়ে’ পরমাণু ডুবোজাহাজের ঘাঁটি পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানেই আণবিক হাতিয়ারের সংখ্যাবৃদ্ধির ঘোষণা করতে শোনা যায় তাঁকে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের মনে যুদ্ধের আতঙ্ক ঢুকে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, ২০২২ সাল থেকে চলা রুশ-ইউক্রেন সংঘর্ষের গোড়া থেকেই কিভকে লাগাতার হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহ করছেন তিনি। ফলে, পশ্চিমের প্রতিবেশীকে ‘গিলতে’ যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে মস্কোকে। এ ব্যাপারে প্যারিসকে বার বার হুমকি দিয়েও কোনও লাভ হয়নি। বরং ক্রেমলিন সংঘাতে জড়িয়ে থাকুক, বকলমে সেটাই চাইছেন মাক্রোঁ।
দ্বিতীয়ত, রুশ এলাকা কালিনিনগ্রাদকে নিয়েও ইউরোপে চড়ছে পারদ। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটো-র (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) বেশ কিছু সদস্য আবার ঝটিতি আক্রমণে ওই এলাকা কব্জা করার পক্ষপাতী। তাঁদের যুক্তি, এতে চাপে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হবে মস্কো। তখন ইউক্রেন থেকেও সৈন্য প্রত্যাহার করতে পারে ক্রেমলিন। এ-হেন বিপজ্জনক পরিকল্পনার অন্যতম সমর্থক হলেন মাক্রোঁ।
রুশ ভূখণ্ড কালিনিনগ্রাদ পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়ার ঠিক মাঝে অবস্থিত। এই দুই দেশের আবার নেটোর সদস্যপদ রয়েছে। ফলে, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অভিসন্ধি আঁচ করে সম্প্রতি চরম হুঁশিয়ারি দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বলেন, ‘‘ওই এলাকা দখলের চেষ্টা হলে চুপ করে বসে থাকবে না মস্কো।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পরই ইউরোপে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরমাণু হাতিয়ার ব্যবহারের মহড়া চালায় ক্রেমলিনের ফৌজ।
আরও পড়ুন:
যদিও বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাননি মাক্রোঁ। বরং নব্য প্রজন্মের বিক্ষোভ থেকে আপামর ফরাসিবাসীর নজর ঘোরাতেই এই পদক্ষেপ করেছে তাঁর সরকার। তা ছাড়া, ইউরোপের দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও যথেষ্ট বেহাল। ডলারের নিরিখে ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে সেখানকার স্থানীয় মুদ্রা ইউরো। এতে হু-হু করে বাড়ছে প্যারিসের আমদানি খরচ।
গত ১ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসে ফরাসি সরকারের খসড়া বাজেট। তাতে দেখা যায় শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অনেকটাই কাটছাঁট করতে চলেছে মাক্রোঁ প্রশাসন। এর পিছনে ৬,৫৫৩ কোটি ইউরো খরচের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। অন্য দিকে, সামরিক ও জ্বালানি-সহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে ওই খসড়া বাজেটে। বিষয়টি জানাজানি হতেই ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে ‘নেপোলিয়নের দেশের’ তরুণ-তরুণীরা।
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে দক্ষ শ্রমিকের অভাবে ভুগছিল ফ্রান্স। ওই সময় অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটায় প্যারিস। পরবর্তী বছরগুলিতে আলজিরিয়া, মরক্কো-সহ আফ্রিকার একাধিক দেশ থেকে হাজার হাজার শরণার্থী ঢোকে পশ্চিম ইউরোপের ওই দেশে। তাঁদের বড় অংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ‘নেপোলিয়নের দেশে’ পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন তাঁরা।
শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ফ্রান্সকে কখনওই নিজের দেশ বলে মেনে নিতে পারেননি তাঁরা। অন্য দিকে, তাঁদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে প্রশাসন। আর তাই অভিবাসীদের জন্য পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে। আর্থিক দিক থেকে সেগুলি বেশ দুর্বল। আন্দোলনকারী নব্য প্রজন্মের বক্তব্য, পর্যাপ্ত সরকারি অনুদান ছাড়া যে কোনও দিন বন্ধ হতে পারে ওই সমস্ত স্কুল। অথচ সে দিকে নজরই দিচ্ছে না মাক্রোঁ প্রশাসন।
গত সেপ্টেম্বরে জরাজীর্ণ ক্লাসরুম সংস্কার এবং শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে পথে নামে তরুণ প্রজন্মের একাংশ। গত ৬ সেপ্টেম্বর নজিরবিহীন ভাবে জনসমুদ্রে পরিণত হয় সেই আন্দোলন। ঐতিহ্যবাহী আইফেল টাওয়ারের সামনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছোলে দু’পক্ষে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। অচিরেই সেটা আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
এর পরই আন্দোলনকারীরা ভাঙচুর শুরু করলে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় ফরাসি পুলিশ। ছোড়ে রবার বুলেট ও স্টান গ্রেনেড। মাক্রোঁ প্রশাসনের দাবি, ওই দিন দেশ জুড়ে পথে নামেন মোট ২ লক্ষ ৬৬ হাজার মানুষ। রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভে শামিল হন ৫৬ হাজার আন্দোলনকারী। পাশাপাশি, মার্সেই, স্ত্রাসবুর ও লিলের মতো শহরগুলিতেও ব্যানার-পোস্টার নিয়ে হাজার হাজার জনতাকে প্রতিবাদ করতে দেখা গিয়েছে।
৬ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ চলাকালীন আইন ভাঙায় মোট ৬০০ জনকে গ্রেফতার করে ফরাসি পুলিশ। সব মিলিয়ে গত দু’সপ্তাহে ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,৫০০। তাঁদের সিংহভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলপড়ুয়া বলে জানা গিয়েছে। এই আন্দোলন চলাকালীন প্যারিস থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা প্রত্যক্ষ করেন মাক্রোঁ। দু’টি ঘটনার সময় একই হওয়ায় একে কাকতালীয় বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আন্দোলনদমনে ফরাসি প্রশাসনের অতি-সক্রিয়তা ও মারাত্মক হাতিয়ারের ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ফরাসি অভিভাবকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, পুলিশের ছোড়া গ্রেনেডে গুরুতর জখম হয়েছে বছর ১৫-এর এক কিশোর। একটি হাত খোয়াতে হয়েছে তাকে। সেটা নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি মাক্রোঁ।
উল্টে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘আজ আমরা আরও শক্তিশালী। এই বার্তা যেখানে দেওয়ার প্রয়োজন, সেখানে তা পৌঁছে দেওয়া গিয়েছে।’’ যদিও ওই পোস্টে কোথাও রাশিয়া বা পুতিনের নাম করতে দেখা যায়নি তাঁকে।
মাক্রোঁর এই মন্তব্যের পরই পাল্টা বিবৃতি দেয় মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভের কথায়, ‘‘ইচ্ছাকৃত ভাবে অচলাবস্থা তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। এতে আরও জটিল হবে পরিস্থিতি।’’ তবে ইউক্রেন সমস্যা সমাধানে ফের এক বার আলোচনার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
গত চার বছরে ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ফ্রান্স। ২০২২-’২৫ সালের মধ্যে পাঁচ বার প্রধানমন্ত্রী বদল করেছেন মাক্রোঁ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু-কে ওই দায়িত্ব দেন তিনি। তবে বেহাল অর্থনীতি ও রাজনৈতিক আকচাআকচি থেকে নজর ঘোরাতে তিনি যুদ্ধের জিগির তুলছেন কি না, তার উত্তর দেবে সময়।