কয়েক ধরনের ওল্ড মঙ্ক, অ্যান্টিকুইটি ব্লু থেকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জ! কৃত্রিম গন্ধ যোগ করায় দেশে নিষিদ্ধ একাধিক জনপ্রিয় মদ
মহারাষ্ট্রে মোহন রকি স্প্রিংওয়াটার দ্বারা উৎপাদিত তিন ধরনের ওল্ড মঙ্কে এই নিষেধাজ্ঞা চেপেছে। সেই তিনটি হল— ওল্ড মঙ্ক দ্য লিজেন্ড, ওল্ড মঙ্ক গোল্ড রিজ়ার্ভ এবং ওল্ড মঙ্ক ট্রিপল এক্স ম্যাচিউরড রাম।
ওল্ড মঙ্ক, অ্যান্টিকুইটি ব্লু, রয়্যাল চ্যালেঞ্জ এবং ব্যাগপাইপার ডিলাক্স-সহ জনপ্রিয় কিছু মদের ব্র্যান্ডের নির্দিষ্ট কিছু ধরনের বিক্রি নিষিদ্ধ করল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই)। তেমনটাই উঠে এসেছে সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে। অভিযোগ, ওই বিশেষ মদগুলিতে কৃত্রিম গন্ধ পাওয়া গিয়েছে যা নির্ধারিত উৎপাদন মান মেনে চলে না। তার পরেই ওই সিদ্ধান্ত।
এফএসএসএআই জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে ডিয়াজিও ইন্ডিয়ার ইউনাইটেড স্পিরিটস, ইনব্রু বেভারেজেস এবং মোহন রকি স্প্রিংওয়াটারের তৈরি কিছু পণ্যে প্রাকৃতিক উপাদান এবং সঠিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর না করে, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের স্বাদ ও সুগন্ধ আনার জন্য বাহ্যিক কৃত্রিম বা প্রকৃতি-সদৃশ ফ্লেভার ব্যবহার করা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষিত পণ্যগুলি ‘নিম্ন মানের’ ছিল, কারণ এতে ‘বাইরের কৃত্রিম বা প্রকৃতির অনুরূপ ফ্লেভারের উপস্থিতি’ পাওয়া গিয়েছে।
আর সে কারণেই ওই সংস্থাগুলির নির্দিষ্ট কিছু পণ্য বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। কিন্তু কোন কোন মদ বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে এফএসএসএআই? তালিকায় রয়েছে মধ্যপ্রদেশে ইউনাইটেড স্পিরিটস দ্বারা উৎপাদিত অ্যান্টিকুইটি ব্লু এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জ হুইস্কি, মধ্যপ্রদেশে ইনব্রু বেভারেজেস দ্বারা উৎপাদিত ব্যাগপাইপার ডিলাক্স হুইস্কি এবং ওল্ড কাস্ক ডিলাক্স ট্রিপল এক্স রাম।
মহারাষ্ট্রে মোহন রকি স্প্রিংওয়াটার দ্বারা উৎপাদিত ওল্ড মঙ্কের তিনটি পণ্যেও এই নিষেধাজ্ঞা চেপেছে। সেই তিনটি হল— ওল্ড মঙ্ক দ্য লিজেন্ড, ওল্ড মঙ্ক গোল্ড রিজার্ভ এবং ওল্ড মঙ্ক ট্রিপল এক্স ম্যাচিয়োরড রাম।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় মহারাষ্ট্রের বারামতীর ইউনাইটেড স্পিরিটসের ম্যাকডাওয়েল’স নং ১ রাম এবং মধ্যপ্রদেশের অ্যাসোসিয়েটেড অ্যালকোহল অ্যান্ড ব্রুয়ারিজের সেন্ট্রাল প্রভিন্স হুইস্কি এবং ম্যাকডাওয়েল’স নং ১ সেলিব্রেশন ম্যাচিয়োরড ট্রিপল এক্স রাম আছে বলেও খবর।
আরও পড়ুন:
রয়টার্স জানিয়েছে যে, এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র এই নির্দিষ্ট কারখানাগুলিতে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, না কি অন্যত্র উৎপাদিত একই ব্র্যান্ডগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্পষ্টীকরণের জন্য রয়টার্সের করা প্রশ্নের উত্তর দেয়নি এফএসএসএআই। ডায়াজিও ইন্ডিয়া, ইনব্রু বেভারেজেস এবং মোহন রকি স্প্রিংওয়াটারও এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে যে, গোয়া-ভিত্তিক মদ প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘ম্যান্ডেক্সি ডিস্টিলারিজ় অ্যান্ড ব্রুয়ারিজ়’-এও পরিদর্শন ও নমুনা সংগ্রহের কাজ চালানো হয়েছে এবং মহারাষ্ট্রের আরও ছ’টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নোটিস জারি করা হয়েছে।
কিন্তু কেন এফএসএসএআই এই পদক্ষেপ করল? খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ভারতীয় খাদ্য সুরক্ষা বিধি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়তে প্রাকৃতিক ফ্লেভারিং পদার্থ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তবে এফএসএসএআই বলেছে, পরীক্ষাগারে দেখা গিয়েছে যে, কিছু প্রস্তুতকারক অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যেই ফ্লেভার যোগ করছিল। অর্থাৎ, রামে রাম ফ্লেভার বা হুইস্কিতে হুইস্কি ফ্লেভার যোগ করা হয়েছিল।
এফএসএসএআই স্পষ্ট করেছে যে, তারা অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়তে স্বাদবর্ধক উপাদান (ফ্লেভারিং সাবস্টেন্স) ব্যবহারের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না। যে সব ক্ষেত্রে অনুমতি রয়েছে এবং কোনও যৌক্তিক প্রযুক্তিগত প্রয়োজন মেটানো হয়, সে সব ক্ষেত্রে কফি বা ভ্যানিলার মতো প্রাকৃতিক ও প্রকৃতির অনুরূপ স্বাদবর্ধক উপাদান ব্যবহার করার আইনি অনুমতি প্রস্তুতকারকদের রয়েছে।
আরও পড়ুন:
সংস্থাটি জানিয়েছে, তদন্তাধীন বিষয়টি মূলত সংশ্লিষ্ট অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়টির নিজস্ব স্বাদই তাতে যোগ করার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি উদাহরণ হিসাবে রামে রামের স্বাদ কিংবা হুইস্কিতে হুইস্কির স্বাদ যোগ করার কথা উল্লেখ করেছে। এফএসএসএআই-এর যুক্তি, এ ধরনের স্বাদ যোগ করার কোনও যৌক্তিক প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা নেই। কারণ পানীয়টির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থেকেই স্বাভাবিক ভাবে সেই স্বাদ বা গুণাবলি আসার কথা। কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টিকে কফিতে কফির স্বাদ কিংবা চায়ে চায়ের স্বাদ যোগ করার সঙ্গে তুলনা করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘‘এমন কোনও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত উৎপাদন পদ্ধতি নেই যার মাধ্যমে রামের সঙ্গে রামের ফ্লেভার বা হুইস্কির সঙ্গে হুইস্কির ফ্লেভার যোগ করা হয়।’’
এফএসএসএআই আরও উল্লেখ করেছে যে, এ ধরনের চর্চার ফলে উৎপাদনকারীরা সঠিক পরিপক্বকরণ (ম্যাচিয়োরেশন) প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে পারে। এড়িয়ে যেতে পারে গুড়, মল্ট বা আঙুরের মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করাও।
এফএসএসএআই-এর এই পদক্ষেপের আওতায় আসা ব্র্যান্ডগুলি মূলত দেশীয় ভাবে উৎপাদিত স্পিরিট বা মদ। আমদানিকৃত হুইস্কি, স্কচ এবং প্রিমিয়াম রামের তুলনায় এগুলির দাম কম হওয়ায় সারা দেশে এগুলির ব্যাপক চাহিদা এবং ব্যবহার রয়েছে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়া মদগুলির আগে থেকেই থাকা মজুতের কী হবে? এফএসএসএআই জানিয়েছে, দু’টি প্রস্তুতকারক সংস্থা নিষেধাজ্ঞার আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করেছিল এবং শর্তসাপেক্ষে ছাড় পেয়েছে।
সংশোধিত ব্যবস্থা অনুযায়ী, পণ্যের মোড়কের সামনের অংশে যদি পণ্যটির সঠিক প্রকৃতি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা থাকে, তবে মজুত বিক্রি করা যাবে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে উৎপাদনের ক্ষেত্রে পণ্যের নিজস্ব স্বাদের সঙ্গে হুবহু একই ধরনের স্বাদ (যেমন— রামে রামের স্বাদ বা হুইস্কিতে হুইস্কির স্বাদ) যোগ করা যাবে না।
রয়টার্স অ্যালকোহল শিল্পের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি এফএসএসএআইয়ের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের ধারণা ছিল ভারতীয় বিধিমালা অনুযায়ী এ ধরনের ফ্লেভার ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালকোহল বা মদের বাজার। এই শিল্পের বার্ষিক আয় প্রায় ৪০০০ কোটি ডলার বলে মনে করা হয়। ‘ইউনাইটেড স্পিরিটস’-এর মাধ্যমে পরিচালিত ‘ডিয়াজিও ইন্ডিয়া’ দেশের বৃহত্তম মদ্যপানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থা, যা আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ‘পার্নড রিকার্ড’-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এফএসএসএআই-এর সংশ্লিষ্ট আদেশকে ইতিমধ্যেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে ডিয়াজিও ইন্ডিয়া। বম্বে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে সংস্থাটি।
খাদ্য ও পানীয় খাতে এফএসএসএআই-এর তরফে সম্প্রতি শুরু করা কঠোর নজরদারির অংশ হিসাবেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ‘এনার্জি ড্রিঙ্ক’-এর নামে বাজারজাত উচ্চ ক্যাফিনযুক্ত পানীয়গুলির বিবরণ বা নামে ‘এনার্জি ড্রিঙ্ক’ শব্দ ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। পেপসিকো এবং রেড বুল-এর মতো সংস্থাগুলি এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও সংস্থাটি তার সিদ্ধান্তে অটল বলেই জানা গিয়েছে।