হ্যাকার হানায় ‘অগ্নিকুণ্ডে’ বদলাল শয়ে শয়ে ফ্রিজ, পারদ উঠল ৫০-এ! ফ্রান্সের বিপদ দেখে আতঙ্কে ভারত
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হওয়া সাইবার হামলায় বিপর্যস্ত ফ্রান্স। সুপার মার্কেটের শ’য়ে শ’য়ে রেফ্রিজ়ারেটরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ৫০ ডিগ্রি করে দেয় সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। এই ধরনের আক্রমণ হলে কী ভাবে সামলাবে ভারত?
এ যেন শনির সাড়ে সাতি! দেশ জুড়ে প্রবল পড়ুয়া বিক্ষোভের তীব্রতা স্তিমিত হতে না হতেই ‘নেপোলিয়ানের দেশে’ বড়সড় সাইবার হামলা। যাতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বসে দোকান-বাজার ও শপিং মলের রেফ্রিজ়ারেটরের তাপমাত্রা হু-হু করে বাড়িয়ে দিল হ্যাকারের দল। ফলে, নষ্ট হয়েছে কয়েক লক্ষ ইউরো মূল্যের খাদ্যদ্রব্য। ইউরোপের এই ঘটনায় নয়াদিল্লির কপালেও পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
চলতি বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আচমকাই ফ্রান্সের কয়েকশো সুপার মার্কেটে সাইবার হামলা চালায় হ্যাকার-গ্যাং। যার জেরে মুহূর্তের মধ্যে চড়তে থাকে সেখানকার রেফ্রিজ়ারেটরগুলির তাপমাত্রার পারদ। এতে সেগুলিতে রাখা খাবার যে নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। গোয়েন্দাদের অনুমান, ইন্টারনেট ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণেই এত বড় মাপের ডিজিটাল আক্রমণ শানাতে সক্ষম হয়েছে হ্যাকাররা।
এহেন হ্যাকার হামলার পরই দেশবাসীকে সতর্ক করে বিবৃতি দেয় ফ্রান্সের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা। তাদের বক্তব্য, আক্রমণ থেমে গিয়েছে, এটি ভাবার কোনও কারণ নেই। ফের নিত্য দিনের ব্যবহার্য নতুন কোনও ডিভাইসকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে তারা। বিশেষত, যাতে এখনও পুরনো সফটওয়্যার ব্যবহার হচ্ছে। ফলে, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট যে কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ফরাসি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমে রেফ্রিজ়ারেটরের কন্ট্রোল সিস্টেমে থাবা বসায় হ্যাকার-গ্যাং। এর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতে চলে আসার পর ডিভাইসের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকে তারা। পাশাপাশি, পাল্টে দেয় ‘ডিফ্রস্ট’ সেটিং। ফলে, রাতভর উপরের দিকে উঠতে থাকে তাপমাত্রার পারদ। ভোরে দোকান খোলার সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছোয় সেটি। ফলে নষ্ট হয়ে যায় প্রচুর খাদ্যদ্রব্য।
গত ১৩ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ সরকারের মন্ত্রী রোলান্ড লেস্কুর। পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ‘‘সাইবার হামলায় সারা দেশের ১০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইটের মধ্যে ৭০০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হ্যাকাররা সেগুলির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।’’ এর পাশাপাশি, কোন কোন সংস্থার তৈরি ডিভাইস আক্রান্ত হয়েছে, সেই তালিকাও ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে তদন্তকারী দল।
আরও পড়ুন:
দেশ জুড়ে হ্যাকার হানার পর ১২ ও ১৩ অক্টোবর বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করে ফ্রান্সের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের ‘কম্পিউটার এমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’। মূলত তিনটি সংস্থার তৈরি ডিভাইস ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। সেগুলি হল, ডেনমার্কের ড্যানফস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোপল্যান্ড এবং ইটালির ডিক্সেল। দুনিয়াব্যাপী এই সংস্থাগুলির প্রযুক্তি রেফ্রিজ়ারেটরে ব্যবহার হয়ে থাকে।
যদিও ঠিক কোন পথে সাইবার হামলা হয়েছে, তা এখনও ফরাসি তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট নয়। দেশটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের এক পদস্থ আধিকারিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘‘আমাদের ধারণা, ড্যানফসের সফটওয়্যার আপডেটের সময় ডিভাইসে হ্যাকার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ইন্টারফেস ইন্টারনেট উন্মুক্ত করে দেওয়ার ফলে সেটি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।’’
সাধারণত এই ধরনের ক্ষেত্রে ঘটনার দায় স্বীকার করে মোটা অঙ্কের টাকা চেয়ে থাকে হ্যাকার-গ্যাং। কিন্তু, এ বার সেটা না হওয়ায় বেশ বিস্মিত ফরাসি প্রশাসন। তবে, আগামীতে যাতে আর কোনও লোকসান না হয়, তার জন্য বিশেষ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশটির ‘কম্পিউটার এমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’। ক্ষতি না হওয়া সুপার মার্কেটগুলিকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে হ্যাকার হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া রেফ্রিজ়ারেটের ইন্টারনেট অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে সেগুলির সেটিংস পরীক্ষা করবেন কোনও সাইবার বিশেষজ্ঞ। তিনি ‘ক্লিনচিট’ দিলে তবেই সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের সঙ্গে ফের ইন্টারনেট সংযোগের পরামর্শ দিয়েছে ফরাসি প্রশাসন। নির্দেশিকায় ভিপিএন বা সুরক্ষিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিষেবা পুনরুদ্ধারের কথা বলেছ ‘কম্পিউটার এমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’।
আরও পড়ুন:
ফরাসি সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের কথায়, জরুরি ভিত্তিতে ফায়ারওয়াল ফিল্টারিংয়ের সময় আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, এটি কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এ ছাড়া, ক্ষতিগ্রস্ত রেফ্রিজ়ারেটগুলির ইন্টারনেটও বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, সেগুলিকে রিসেট করা ও পুনরায় ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত করার আগে কনফিগারেশন ঠিক করার পরামর্শ ইতিমধ্যেই পেয়েছেন সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
ফ্রান্সের এই ঘটনা ভারতকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, গত কয়েক বছরে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের নেতৃত্বে দেশ জুড়ে ব্যাপক ভাবে প্রসার লাভ করেছে ডিজিটাল পরিষেবা। কী নেই তাতে? বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, গণপরিবহণ (যেমন, মেট্রো রেল বা বিমান) থেকে হাসপাতাল। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় জোর কদমে চলছে স্মার্টসিটি তৈরির কাজও। ফলে হ্যাকার হামলার আশঙ্কা যে দিন দিন বাড়ছে, তা বলাই বাহুল্য।
বিশ্লেষকদের দাবি, সাইবার হামলায় ট্র্যাফিক সিগন্যাল, জল পরিশোধন ব্যবস্থা এবং বহু ক্ষেত্রে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। ফ্রান্সের মতো ঘটনা ঘটলে তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে কোটি টাকা মূল্যের ওষুধ ও ব্লাড ব্যাঙ্কের সংগৃহীত রক্ত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে, হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই প্রশাসন। হ্যাকার হানা সামলাতে সর্বক্ষণ সজাগ রয়েছে সাইবার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সরকারের দু’টি বিভাগ।
উল্লেখ্য, বছরভর প্রশাসন ও আমজনতাকে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ দিয়ে থাকে ‘ইন্ডিয়ান কম্পিউটার রেসপন্স টিম’ বা সিইআরটি-ইন। এ ছাড়া, হ্যাকার হামলা থেকে পরিকাঠামোগত সুরক্ষা দিতে রয়েছে ‘ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রোটেকশন সেন্টার’। নিরাপত্তা আঁটসাঁটো করতে দীর্ঘদিন ধরে পুরনো ডিভাইস ও থার্ড পার্টি সিস্টেম ব্যবহারে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছে তারা।
ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের এক অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের কথায়, ‘‘সরকারি-বেসরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখা উচিত। তা ছাড়া, নির্ধারিত সময় পর পর গোটা সিস্টেমকে আপডেট করতে হবে। ফ্রান্সের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, যে কোনও ডিভাইসেই হ্যাকার হামলা হতে পারে। ফলে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগোতে হবে।’’
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারতে বড় আকারের সাইবার হামলা হলে, তা শুধু মাত্র সুপার মার্কেটের মধ্যে সীমাবন্ধ থাকবে না। এখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, বহু মানুষের এখনও হ্যাকিংয়ের বিষয়ে কোনও সচেতনতাই নেই। ফলে ব্যক্তিগত স্তরে ছোটখাটো ঘটনা ঘটতেই থাকে। আর তাই সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি প্রচার ও শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।