‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা উপড়োতে’ হুথিদের ইন্ধন, ‘পুরনো ঝাল’ মেটাতে আরবদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে অন্য আরব রাষ্ট্র?
শত্রুতা ভুলে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের নাকি গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে অন্য এক আরব রাষ্ট্র! মার্কিন গণমাধ্যম ‘ড্রপ নিউজ়’-এর প্রতিবেদনে রক্তচাপ বাড়ছে রিয়াধের।
শত্রুতা ভুলে ‘বন্ধুত্বের’ ডাক। পর্দার আড়ালে থেকে বিপদের দিনে সাহায্য। হুথি ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই)-এর এহেন নতুন ‘রসায়নে’ হতচকিত বিশ্ব! ‘প্রেম’ এতটাই গভীর যে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সৌদি আরব সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের নাকি গোয়েন্দা তথ্যও সরবরাহ করছে আবু ধাবি। রিয়াধের ‘চক্ষুশূল’ হতে হবে জেনেও কেন এই সাহায্য? জবাব খুঁজছে বিশেষজ্ঞ মহল।
সম্প্রতি, হুথি-আমিরশাহি ‘গোপন আঁতাঁতের’ খবর প্রকাশ্যে আনে ‘ড্রপ নিউজ়’। উল্লেখ্য, সৌদির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে গত জানুয়ারিতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে রিয়াধ সমর্থিত বাহিনীর সাহায্য বন্ধ করে আবু ধাবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধানী গণমাধ্যমটির দাবি, এর পরই ১৮০ ডিগ্রি বেঁকে হুথিদের সঙ্গে ‘হাত মেলায়’ তারা। একে পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে ‘খেলা ঘোরানো’ পদক্ষেপ বললে অত্যুক্তি হবে না।
‘ড্রপ নিউজ়’-এর দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণেও হুথিদের সাহায্য করছে আমিরশাহি। তবে, এই সহায়তা ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গত সেপ্টেম্বর থেকে সৌদির বিভিন্ন শহর ও কৌশলগত পরিকাঠামোতে লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান মদতপুষ্ট এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এ ব্যাপারে অবশ্য আবু ধাবির কোনও সহযোগিতা তারা পায়নি বলেই ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মজার বিষয় হল, ধর্মীয় ও ভূ-রাজনীতি, দু’দিক থেকেই হুথিদের সঙ্গে আমিরশাহির ‘চরম শত্রুতা’ রয়েছে। ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি শিয়া ধর্মাবলম্বী। অন্য দিকে, সুন্নি ইসলামকে মেনে চলে আবু ধাবি। তা ছাড়া, দীর্ঘ দিন ধরেই ইরান মদতপুষ্ট গোষ্ঠীটির ধ্বংস চেয়ে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল। কিন্তু, জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্কে শান দিচ্ছে ইউএই।
তা হলে কেন শত্রুতা ভুলে হুথিদের সঙ্গে হাত মেলাতে চাইছে আবু ধাবি? এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমানে ইয়েমেনে নিজেদের ‘কৌশলগত অবস্থান’ পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে আমিরশাহি। কারণ, চলতি বছরের শুরু থেকেই সেখানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তারা। আর তাই কিছুটা বাধ্য হয়েই ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের পর্দার আড়াল থেকে সাহায্য করতে হচ্ছে তাদের।
আরও পড়ুন:
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে জ্বলে ওঠে গৃহযুদ্ধের আগুন। পরের বছর (পড়ুন, ২০১৫ সাল) রাজধানী সানা দখল করে হুথি গোষ্ঠী। এর পর আর সৌদি ও আমিরশাহির মতো আশপাশের আরব রাষ্ট্রগুলির পক্ষে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের বাড়বাড়ন্ত বন্ধ করতে সেখানকার আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করতে থাকে তারা।
প্রসঙ্গত, হুথি প্রশ্নে অভিন্ন বিরোধিতা সত্ত্বেও গোড়া থেকেই ইয়েমেনের আলাদা আলাদা গোষ্ঠীকে সাহায্য করে আসছে আবু ধাবি ও রিয়াধ। সানার বিতাড়িত কিন্তু আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সরকারের দিকে ঝুঁকে আছে সৌদির সমর্থন। অন্য দিকে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রটির দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘সাউদার্ন ট্রানজ়িশনাল কাউন্সিল’-এর (এসটিসি) গোপন আঁতাঁত গড়ে তুলতে দেখা গিয়েছে আমিরশাহিকে।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, আমিরশাহি ও রিয়াধ পৃথক পৃথক গোষ্ঠীকে সাহায্য করায় আখেরে লাভবান হয়েছে হুথিরা। কারণ, এর জেরে অচিরেই দুই আরব রাষ্ট্রের সম্পর্কে তৈরি হয় অদ্ভুত জটিলতা। সেটা পরবর্তী দশকগুলিতে সরাসরি অন্তর্দ্বন্দ্বের চেহারা নিয়ে ফেলে। গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে এসটিসিকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে ইউএই-র সঙ্গে চরমে ওঠে সৌদির বিবাদ।
এর পরই রিয়াধের ‘নির্দেশে’ আমিরশাহিকে বাহিনী প্রত্যাহারে চাপ দেয় সানা থেকে বিতাড়িত আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের সরকার। ফলে, এ বছরের জানুয়ারিতে ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি থেকে ফৌজকে ঘরে ফেরাতে বাধ্য হয় আবু ধাবি। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এই ‘অপমান’ হজম করতে পারেনি তারা। আর তাই হুথিদের হাত ধরে উপসাগরীয় রাষ্ট্রটিতে নতুন করে পা জমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে ইউএই।
আরও পড়ুন:
আমিরশাহি সম্পর্কিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মোট চারটি সূত্রের উল্লেখ করেছে ‘ড্রপ নিউজ়’। এর মধ্যে দু’টি সূত্রের বরাত দিয়ে তারা লিখেছে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে বিরোধীদের নিশানা করতে হুথিদের ‘বোড়ে’র মতো কাজে লাগাচ্ছে আবু ধাবি। সেই কারণেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটিকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে তাদের। তবে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রটির গৃহযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার কোনও ইচ্ছা নেই ইউএই-র।
ওই প্রতিবেদনেই আবার বাকি দুই সূত্রকে উদ্ধৃত করে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলা হয়েছে। সেটা হল, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে আমিরশাহি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সৌদি মদতপুষ্ট সরকারি ফৌজের সরাসরি লড়াই চলছে। এই সংঘর্ষের ফায়দা নিতে চাইছে হুথি গোষ্ঠী। আর তাই, আবু ধাবির বাহিনীকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। সেই কারণে, ইউএই-র গোয়েন্দা তথ্য হাতে চলে আসছে তাদের।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, আলাদা আলাদা তত্ত্ব সামনে এলেও ‘ড্রপ নিউজ়’-এর এই প্রতিবেদনে একটি বিষয় স্পষ্ট। আমিরশাহির কাছে হুথিরা ‘অচ্ছুৎ’ নয়। বরং, সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সঙ্গে আবু ধাবি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে চলছে। ফলে, তাদের গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য সামরিক সাহায্য পেতে সমস্যা হচ্ছে না সানার ইরান মদতপুষ্ট সংগঠনটির সশস্ত্র নেতাদের।
সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে গুপ্তচরবৃত্তিতে হাত পাকাতে থাকে আমিরশাহি। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ওই বছরই একটি গোপন নজরদারি প্রকল্প চালু করে আবু ধাবি, নাম ‘রেভেন’। এতে সাফল্য পেতে বেশ কিছু অফিসার ও কর্মীকে প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠায় তারা। পরবর্তীকালে অবশ্য মানবাধিকার কর্মী ও সরকার বিরোধীদের অন্দরমহলে উঁকিঝুঁকি মারার অভিযোগে বিদ্ধ হয় ইউএই।
পশ্চিমি গণমাধ্যমের দাবি, বর্তমানে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর গতিবিধি সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য হুথিদের সরবরাহ করছে আমিরশাহি। এর ভিত্তিতে তাদের উপর হামলার ছক কষতে দেখা গিয়েছে সংশ্লিষ্ট ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে। উদাহরণ হিসাবে, গত ২ ও ৭ অক্টোবর এডেন সাগর সংলগ্ন একটি সামরিক ঘাঁটিতে তাদের দু’দফায় আক্রমণের কথা বলা যেতে পারে।
‘ড্রপ নিউজ়’-এর দাবি, হুথি-আমিরশাহি এই ‘গোপন আঁতাঁতের’ বিষয়টি আমেরিকার অজানা নয়। সম্প্রতি, এ বিষয় আবু ধাবিকে নাকি সতর্ক করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তার পরেই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলে ইউএই। আনুষ্ঠানিক ভাবে ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের সাহায্য করার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে তারা।
অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ‘ড্রপ নিউজ়’কে রহস্যময় জবাব দিয়েছেন হুথি শীর্ষকর্তা মহম্মদ আল-বুখাইতি। তিনি বলেন, ‘‘সৌদি আরবের উপর প্রতিশোধ নিতে ইয়েমেনের কোনও বিদ্রোহী জোটকে সরাসরি সমর্থন করছে না আমিরশাহি। এই লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকতে আবু ধাবি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’ তবে কি অপ্রত্যক্ষ ভাবে মিলছে সাহায্য? সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন আল-বুখাইতি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত কয়েক বছরে নানা ইস্যুতে সৌদির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে আমিরশাহি। ২০২০ সালে ইজ়রায়েলকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেয় তারা। চলতি বছরের ১ মে খনিজ তেল রফতানিকারী দেশগুলির সংগঠন ‘ওপেক’ (অর্গানাইজ়েশন অফ পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ়) ত্যাগ করে আবু ধাবি। গত কয়েক দশক ধরে এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছে রিয়াধ।
তবে, চুপ করে বসে নেই সৌদি প্রশাসনও। সম্প্রতি ইরান সফর করেন রিয়াধের রাজপুত্র তথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সলমন। সূত্রের খবর, তেহরানের মাধ্যমে গোপন সমঝোতা করতে হুথিদের হাতে ১০০ কোটি ডলার তুলে দিয়েছেন তিনি। ফলে, ভূ-রাজনীতির এই দাবা খেলায় ইয়েমেনের মাটিতে দুই আরব রাষ্ট্রের মধ্যে কে পা জমাতে পারে, সেটাই এখন দেখার।