আদর্শ দাউদ, পেশা তোলাবাজি! দুই ভাইয়ের তৈরি মাফিয়াদলের সঙ্গে নাম জড়াল ক্যাফেমালিকের রহস্যমৃত্যুতে অভিযুক্ত মডেলের
নাগপুরে অভিযান চালিয়ে ২০ অক্টোবর শ্রদ্ধাদের গ্রেফতার করে লখনউ পুলিশ। এ বার সামনে এল আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শ্রদ্ধাদের সঙ্গে নাকি সম্পর্ক রয়েছে মুম্বইয়ের কুখ্যাত জ়ুলফিকর বেহলিম দলের। তা জ়েড দল হিসাবেও পরিচিত।
৯ অক্টোবর। আচমকা চারতলা আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে যান শিবা শর্মা। পেশায় তিনি ছিলেন উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের এক ক্যাফের মালিক। প্রাথমিক ভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা মনে হলেও শিবার মায়ের অভিযোগে রহস্য বাড়তে থাকে। সেই আবাসনেরই বাসিন্দা শ্রদ্ধা দুবের সঙ্গে লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন শিবা। শিবার মায়ের অভিযোগ, শ্রদ্ধা এবং তাঁর বোন রশ্মি দুবেই শিবাকে খুন করেন।
শিবার মায়ের কথা অনুযায়ী শ্রদ্ধা এবং তাঁর বোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। কিন্তু এর পরই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়। শিবার মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই শ্রদ্ধা এবং রশ্মি পলাতক ছিলেন। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তাঁদের গাড়িচালকেরও। তদন্তের মাঝেই খবর পাওয়া যায়, নেপালে পালিয়ে গিয়েছেন শ্রদ্ধারা। তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যায়, উত্তরপ্রদেশে রূপঈডীহা সীমান্ত দিয়ে শ্রদ্ধারা নেপালে ঢুকেছেন। সেখানকার দু’টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ্যে আসে।
সেই খবরের ভিত্তিতে ভারত এবং নেপাল সীমান্তে তল্লাশি অভিযানও চালায় পুলিশ। পরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, নেপাল থেকে উত্তরপ্রদেশে ফিরে যান শ্রদ্ধারা। তার পরে চলে যান নাগপুরে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে নাগপুরে অভিযান চালিয়ে ২০ অক্টোবর শ্রদ্ধাদের গ্রেফতার করে লখনউ পুলিশ। এ বার সামনে এল আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শ্রদ্ধাদের সঙ্গে নাকি সম্পর্ক রয়েছে মুম্বইয়ের কুখ্যাত জ়ুলফিকর বেহলিম দলের। তা জ়েড দল হিসাবেও পরিচিত।
সেই দলের সদস্যরাই নাকি শ্রদ্ধাদের নাগপুরে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এমনকি নাগপুরের একটি খামারবাড়িতে নাকি শ্রদ্ধাদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছোনোর আগেই শ্রদ্ধাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। এখন প্রশ্ন উঠছে কী এই জ়েড দল আর এই দলকে নিয়ে পুলিশের এত মাথাব্যথাই বা কেন?
জনশ্রুতি, এই জ়েড দল নাকি পশ্চিম মুম্বইয়ের উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত অপরাধমূলক কাজকর্ম এবং তোলাবাজি পরিচালনামূলক দল। অনেকটা মুম্বইয়ের অন্ধকার জগতের পরিচিত নাম দাউদ ইব্রাহিমের দলের আদলে তৈরি করা হয়েছে এই দলটি। এই দলের মাথায় রয়েছেন দুই ভাই— জ়ুলফিকর ইয়াসিন বেহলিম এবং মোহসিন বেহলিম।
আরও পড়ুন:
মুম্বইয়ের অন্ধকার জগতের প্রভাবশালী দল হিসেবে এই সংগঠনের বেশ নামডাক রয়েছে। ব্যবসায়ীদের থেকে টাকা তোলা, খুন, লোকজনকে পেটানো, জমি সংক্রান্ত ঝামেলার নিষ্পত্তি, মাদকপাচার— এই ধরনের কাজ এই দলের সদস্যেরা অর্থের বিনিময়ে করে থাকেন।
তবে জ়েড দলের মাথার নাম এই প্রথম খবরে উঠে এল না। এর আগেও তারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য জেল খেটেছেন। ২০১৬ সালে দলের মাথা জ়ুলফিকরের নামে জোড়া খুনের মামলা দায়ের করা হয়। তোলাবাজি করতে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন জ়ুলফিকর। অভিযোগ, তার পরই খুন করেন তিনি। মুম্বই পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।
কিন্তু মামলা দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকায় এবং কোনও নিষ্পত্তি না হওয়ায় জ়ুলফিকরকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুম্বই হাই কোর্ট জ়ুলফিকরকে জামিনে মুক্তি দেয়।
তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে পুনরায় জেলে যান জ়ুলফিকর। এ বার সঙ্গী হয় ভাই-সহ দলের ১০ সদস্য। মুম্বইয়ের এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা চেয়ে বসেন তাঁরা। অন্যথায় তাঁকে বাড়ি বানাতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।
আরও পড়ুন:
অসহায় ঠিকাদার মুম্বইয়ের বান্দ্রায় এক হোটেলে তাঁদের ডেকে পাঠান। সেখানেই অর্থ লেনদেনের ঘটনা চলছিল। সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় মুম্বই পুলিশ। স্টিং অপারেশন চালিয়ে জ়েড দলের দুই মাথা-সহ ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। সকলের বিরুদ্ধে জোর করে টাকা আদার করা এবং বেআইনি ভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মামলা দায়ের করা হয়।
চলতি বছরেরই সেপ্টেম্বরে সেই দলের আরও কিছু সদস্য মুম্বই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। জ়েড দলের মোট ১৭ জন বর্তমানে মুম্বই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। পরে গ্রেফতার করা সদস্যদের মধ্যে এক জনকে পুলিশ মাদক পাচারকারী বলেও শনাক্ত করেছে।
মনে করা হচ্ছে, মুম্বইয়ের বিত্তশালীদের আসরে মাদক সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা রয়েছে এই জ়েড দলের। এই দলের সদস্যদের হাত দিয়েই সে সমস্ত পার্টিতে মাদক পৌঁছোয় বলে অনুমান করছে মুম্বই পুলিশ।
এ ছাড়াও জ়ুলফিকরের নাম জড়িয়েছিল রিয়্যাল এস্টেস সংস্থা ‘হাউজ়িং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ (এইচডিআইএল)-এ হামলার ছক কষায়। জেলে বসেই নাকি সেই সংস্থায় হামলা করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন জ়ুলফিকর। সেই সময় জ়ুলফিকরের দিন কাটছিল আর্থার জেলে। তবে সেই পরিকল্পনা পরে গিয়ে আর ফলপ্রসূ হয়নি।
জ়ুলফিকর এবং তাঁর দলের সদস্যেরা বহু বার ‘মহারাষ্ট্র কন্ট্রোল অফ অর্গানাইজ়ড ক্রাইম অ্যাক্ট’-এর অধীনে অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছেন। প্রধানত সিন্ডিকেট সম্পর্কিত অপরাধের জন্যই তাঁদের বিরুদ্ধে বারংবার অভিযোগ দায়ের হয়। চলতি বছরে মুম্বই পুলিশ সেই দলের প্রধান দুই মাথা-সহ বেশ কয়েক জনকে হেফাজতে নিলেও এখনও যে সেই দলের বহু সদস্য বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলেই অনুমান। শ্রেষ্ঠার জ়েড দলের সঙ্গে যোগ সেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
তবে মডেল শ্রেষ্ঠা বা তাঁর বোন কী ভাবে জ়েড দলের সদস্য হলেন বা আদৌ সেই সন্দেহ সত্যি কি না সে বিষয়ে এখনই হলফ করে কিছু বলা যাচ্ছে না। পুলিশ মনে করছে, সেই দলের সদস্যদের সঙ্গে ফেস টাইমে যোগাযোগ রাখতেন শ্রদ্ধা। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে তিনটি আইফোন উদ্ধার করেছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে।