‘অপয়া’ বলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি মাঠে, ‘শাপমুক্ত’ হতে গোলপোস্ট পুড়িয়ে দেন বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল আটকাতে না পারা ‘খলনায়ক’!
১৯৫০ সালেও বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজ়িল। কিন্তু একটা গোলেই বদলে যায় ইতিহাস। ব্রাজ়িলবাসীদের কাছে ‘খলনায়ক’ হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক।
‘চক দে ইন্ডিয়া’ সিনেমাটির কথা মনে আছে? শাহরুখ খান অভিনয় করেছিলেন কবীর খান নামের এক হকি খেলোয়াড়ের চরিত্রে। সিনেমায় দেখানো হয়েছিল, কী ভাবে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে ভারতকে জেতাতে পারেননি বলে বিশ্বাসঘাতকের তকমা পেয়েছিলেন। যদিও জীবনের যুদ্ধে কবীর ঘুরে দাঁড়ান। ভারতের হকি দলের কোচ হয়ে দেশকে বিশ্বকাপ এনে দেন। ব্রাজ়িলের কাছেও রয়েছে এক ‘কবীর খান’, কেবল তিনি জীবনে কোনও দিনই দেশবাসীর কাছ থেকে যোগ্য সম্মান পাননি।
ব্রাজ়িলের সেই ‘বিশ্বাসঘাতকের’ নাম মোয়াসির বারবোসা। তিনি ব্রাজ়িলের জাতীয় দলে গোলকিপার হিসাবে খেলতেন। ১৯৪৫ থেকে তিনি ব্রাজ়িলের জাতীয় দলের গোলরক্ষক হিসাবে খেলা শুরু করেন।
১৯৪৯ সালে কোপা আমেরিকা জেতে ব্রাজ়িল। সেই জয়ে বারবোসার বিপরীত দলের গোল আটকানোর ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু সমস্যা ঘটে ১৯৫০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে। সেই ঘটনা বারবোসাকে ব্রাজ়িলবাসীর কাছে খলনায়ক করে তোলে।
তৎকালীন সময়ে ফুটবল বিশ্বকাপের নিয়মকানুন ছিল অনেকটাই আলাদা। ১৯৫০-এ মোট ১৩টি দেশ ফুটবল বিশ্বকাপে যোগ দিয়েছিল। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ছিল ব্রাজ়িল। চারটি গ্রুপে ভাগ করে খেলা হয়। এখনকার মতো কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনালের ঘনঘটা ছিল না তখন।
প্রতিটি গ্রুপের বিজয়ী দলদের নিয়ে তৈরি হত ‘ফাইনাল গ্রুপ’। তাদের মধ্যে রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে বাছাই করে নেওয়া হত বিজেতা। এই রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে যে দলের পয়েন্ট সর্বোচ্চ হত, তাকেই বিশ্বকাপের বিজয়ী বলে ঘোষণা করার চল ছিল। পয়েন্ট নির্ধারণ করা হত প্রতিটি দলের জেতা এবং ড্র করা ম্যাচের সংখ্যার হিসাবে।
আরও পড়ুন:
১৯৫০ সালে ফাইনাল গ্রুপে পৌঁছেছিল ব্রাজ়িল, উরুগুয়ে, স্পেন এবং সুইডেন। এদের মধ্যে পয়েন্টের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ব্রাজ়িল। আর একটি ম্যাচ ড্র করলেই তারা হয়ে যেত বিজেতা। কিন্তু ভাগ্য ব্রাজ়িলের জাতীয় দলকে সঙ্গ দেয়নি।
ব্রাজ়িলের মারকানা স্টেডিয়ামে উরুগুয়ের সঙ্গে খেলা ছিল ব্রাজ়িলের। সেই ম্যাচে ড্র করলেই বিশ্বকাপ জয়ের পালক জুড়ত ব্রাজ়িলের জাতীয় দলের মাথায়। এক লক্ষ ৫৫ হাজার দর্শক ধারণের ক্ষমতা ছিল সেই স্টেডিয়ামের। কিন্তু খেলা দেখতে আসেন প্রায় দু’লক্ষ দর্শক। দেশবাসীর সামনে বিশ্বকাপ তোলার আমোদে ফুটতে থাকেন ব্রাজ়িলের ফুটবলারেরা।
উরুগুয়ের বিরুদ্ধে প্রথম গোল করেন ব্রাজ়িলের স্ট্রাইকার ফ্রিয়াকা। ফলত তাঁদের জেতার খিদে আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ৬৬ মিনিটে গোল শোধ করে উরুগুয়ে। যদিও তা ব্রাজ়িলের ফুটবলার এবং সমর্থকদের চিন্তার কারণ হয়নি। কারণ, সেই ম্যাচ যদি ড্র-ও হত, তা হলেও ব্রাজ়িলই চলতি বিশ্বকাপের বিজয়ী দেশ হিসাবে ঘোষিত হত।
কিন্তু খেলার প্রায় অন্তিম লগ্নে এসে ঘটে বিপর্যয়। ৭৯ মিনিটে উরুগুয়ে আবার গোল করে। জালে বল ঢোকা আটকাতে ব্যর্থ হন বারবোসা। বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। উরুগুয়ে বিজয়ী হয়।
আরও পড়ুন:
এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বহু গোলরক্ষকই জালে বল ঢোকা আটকাতে পারেন না। এর বহু নজির ফুটবল দেখেছে। কিন্তু বারবোসার এই ‘ব্যর্থতা’ তাঁর জীবনে বিভীষিকা হয়ে নেমে আসে।
ব্রাজ়িলের অলি-গলিতে বারবোসার ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। দেশবাসীর কাছে চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন তিনি। ব্রাজ়িলের সংবাদমাধ্যমগুলিও বারবোসাকে ব্যঙ্গ করে তাঁর বিরুদ্ধে নানা প্রতিবেদন ছাপাতে থাকে।
বারবোসা দেশবাসীর ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ বুঝতে পারেন। স্ত্রীকে নিয়ে ঘরবন্দি জীবন কাটানো শুরু করেন তিনি। খবরের কাগজ পড়া, রেডিয়োয় খবর শোনা ছেড়ে দেন।
কিন্তু বারবোসা নিজেকে ‘বন্দি’ করে ফেললেও, তাঁর উপর দেশবাসীর রাগ কমেনি। শোনা যায়, বারবোসার বাড়িতে আগুন লাগানোর কথা ভাবতে শুরু করেন তাঁর প্রতিবেশীরা। এক সতীর্থ বারবোসাকে সে খবর দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বারবোসা সেই পরামর্শ মেনে স্ত্রীকে নিয়ে আটলান্টিকের পাড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক পত্রিকায় মুখ ঢেকে ট্রেনে চাপেন তিনি। কিন্তু সেই রেলসফরেও সমালোচনা তাঁর পিছু ছাড়ে না। তিনি শুনতে পান যে তাঁর সহযাত্রীরা তাঁকে নিয়েই নিন্দামূলক আলোচনা করছেন। মেজাজ হারান বারবোসা। তাঁদের দিকে তেড়ে যান। যদিও সৌভাগ্যক্রমে সেই ঝামেলা বেশি দূর গড়ায়নি।
জীবদ্দশায় সমালোচনা কখনওই পিছু ছাড়েনি বারবোসার। রাস্তাঘা়ট, বাজার, দোকান প্রভৃতি সমস্ত জায়গায় তাঁকে শুনতে হয় ১৯৫০ সালে কী ভাবে ব্রাজ়িল তাঁর জন্য বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। ২০০০ সালে ইএসপিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বারবোসা জানান, ব্রাজ়িলে কোনও ভুলের সাজা সর্বাধিক ৩০ বছর পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু একটি গোল না আটকাতে পারার শাস্তি তিনি ৫০ বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন।
এক পানশালায় বসে মদ্যপান করছিলেন বারবোসা। সেই সময় সেখানে তাঁর দিকে আঙুল তুলে এক মহিলা তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, ‘‘এই মানুষটির জন্য ১৯৫০ সালে সমগ্র ব্রাজ়িলবাসীর চোখে জল এসেছিল।’’ ইএসপিএনের সাংবাদিক রোবার্তো মুয়েলায়ের্তের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়ে বারবোসা জানিয়েছিলেন যে ঠিক কতটা খারাপ লেগেছিল তাঁর। যে মানুষ ১৯৫০-এর খেলার সময় জন্মায়ওনি, তার কাছেও বারবোসা খলনায়ক হিসাবে রয়ে গেলেন ভেবে কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি।
সেই ঘটনার পর বারবোসা ব্রাজ়িলের হয়ে আর একটা ম্যাচই খেলেছিলেন। ১৯৫৪ সালে বিশ্বকাপের আগে বারবোসার পা ভেঙে যায়। যদিও সেই সময় দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তিনি পেতেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। কারণ সকলের কাছে বারবোসা তখন এক খারাপ গোলরক্ষক ছাড়া আর কিছুই নন। ১৯৬২ সালে, ৪১ বছর বয়সে বারবোসা ফুটবলজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
রিওর যে স্টেডিয়ামে বারবোসা গোল আটকাতে ব্যর্থ হন বলে তাঁর জীবন বদলে যায়, সেখানে তিনি প্রায়ই ঘুরতে যেতেন। নির্দিষ্ট সেই গোলপোস্টের কাছে গিয়ে তিনি প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই স্টেডিয়ামের এক ব্যবস্থাপক অ্যাবেলার্দ ফ্রাঙ্কো বারবোসার খুব ভাল বন্ধু ছিলেন। ‘অভিশপ্ত’ সেই গোলপোস্টটি খোলা হলে ফ্রাঙ্কো সেটি বারবোসাকে দিয়ে দেন।
বারবোসা সেই গোলপোস্টের কাঠগুলি বাড়িতে নিয়ে আসেন। বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা অপরাধের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বারবোসা তাতে আগুন লাগিয়ে দেন। কিন্তু তখনও শেষ হয়নি বারবোসার দুর্দশা।
১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে, ব্রাজ়িলের জাতীয় দল তখন ১৯৯৪-এর বিশ্বকাপের জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বারবোসার বয়স তখন ৭০-এর আশপাশে। তিনি জাতীয় দলের প্র্যাকটিস ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে যান। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে ঢুকতে দেননি। দেশের জাতীয় দলের জন্য নাকি বারবোসা ‘অপয়া’। অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয় তাঁকে।
এর পর তিনি রিও ছেড়ে অন্যত্র বাস করা শুরু করেন। বারবোসা নিজের শেষ জীবন কাটান প্রাইয়ো গ্রান্দেতে। সেখানেও যে অপমান তাঁকে তাড়া করেনি তা নয়। কিন্তু এত দিনে তা তাঁর গা-সওয়া হয়ে যায়। প্রাইয়োতে বারবোসা এমন বহু মানুষ খুঁজে পান যাঁরা তাঁকে ১৯৫০-এর সেই আটকাতে না পারা গোলের বাইরেও চিনতেন। ৭৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু ব্রাজ়িলের মানুষের মনে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ক্ষোভ হয়তো আজও পুরোপুরি মেটেনি।