পলকে ধ্বংস জেট-ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন! ১১টি বর্মে শরীর ঢেকেছে ভারত, তালিকায় কুশ, পৃথ্বী ছাড়া আর কী?
‘অপারেশন সিঁদুরে’ মার খেয়েও বার বার ভারতকে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে পাকিস্তান। ফলে সম্ভাব্য সংঘাতের কথা মাথায় রেখে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মজবুত রেখেছে নয়াদিল্লি। এতে রয়েছে ১১টি স্তর!
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর এক বছর পার। ভারতের হাতে মার খেয়েও শিক্ষা হয়নি পাকিস্তানের। উল্টে ‘যুদ্ধ’ বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ক্রমাগত পরমাণু হামলার হুমকি দিচ্ছে ইসলামাবাদ। ফলে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। আর তাই রাওয়ালপিন্ডির আচমকা সামরিক অভিযানের কথা মাথায় রেখে আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাকে নতুন ভাবে সাজিয়েছে দিল্লি। এর ১১টি স্তরের পুরু বর্ম ভেদ করা শত্রুর পক্ষে অসম্ভব।
আধুনিক যুদ্ধে আকাশপথে হামলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং লড়াকু জেটের ত্রিফলা আক্রমণে শত্রুর বুকে আতঙ্ক তৈরির রণকৌশল নিতে দেখা যায় দুর্ধর্ষ কমান্ডারদের। এগুলি প্রতিহত করতে দেশি-বিদেশি দু’রকম মিলিয়ে মোট ১১টি এয়ার ডিফেন্স ব্যবহার করছে ভারতীয় ফৌজ। গত বছর (২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন পাক হাতিয়ার ধ্বংসের মাধ্যমে সেই ঢাল নিজের জাত চিনিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
এ দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথমেই আসবে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফের নাম। রাশিয়ার তৈরি এই হাতিয়ারকে দুনিয়ার আধুনিকতম ‘ভূমি থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম) বলে গণ্য করা হয়। ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন পাকিস্তানের পাঁচটি লড়াকু জেট, একটি নজরদারি বিমান এবং একগুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করে ভারতীয় সেনা। সেই সাফল্যের অন্যতম কারিগর হল এস-৪০০।
ভারতের আকাশকে সুরক্ষিত করতে ২০২১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’-এর প্রতিরক্ষা চুক্তি করে নয়াদিল্লি। এ দেশের বায়ুসেনার হাতে এই হাতিয়ার তুলে দিতে ৫৪০ কোটি ডলার খরচ করেছে কেন্দ্র। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমটির মোট পাঁচটি ব্যাটারি সরবরাহের কথা রয়েছে। কিন্তু, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা দিতে পারেনি ক্রেমলিন। এখনও পর্যন্ত মস্কোর পাঠানো চারটি ‘এস-৪০০’ হাতে পেয়েছে ভারতীয় বিমানবাহিনী।
রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটিতে মোট তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। সেগুলির পাল্লা ৪০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার। এ ছাড়া ‘এস-৪০০’-এর সঙ্গে জুড়ে আছে অত্যাধুনিক রেডার। তার নজর এড়িয়ে শত্রুর পক্ষে ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ শানানো বেশ কঠিন। সূত্রের খবর, চলতি বছরের শেষের দিকে এই এয়ার ডিফেন্সের সর্বশেষ ব্যাটারি নয়াদিল্লির বিমানবাহিনীকে সরবরাহ করবে মস্কো। সেটা চিন সীমান্তে মোতায়েন করতে পারে বায়ুসেনা।
আরও পড়ুন:
ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষায় দ্বিতীয় স্তরের পোশাকি নাম ‘পৃথ্বী ডিফেন্স ভেহিকল মার্ক-২’। এটি প্রকৃতপক্ষে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ এর সফল পরীক্ষা চালায় কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)। এর সাঙ্কেতিক নাম রাখা হয় ‘মিশন শক্তি’। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র চারটি দেশের আছে এই প্রযুক্তি। দিল্লি বাদে বাকিরা হল আমেরিকা, রাশিয়া ও চিন।
ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের সাহায্যে নিখুঁত নিশানায় হামলা করতে চাই কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক শক্তিশালী দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা। ‘সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে এর প্রয়োজনীয়তা ভালই অনুভব করেছে পাক ফৌজ। ফলে চিনের সহায়তায় কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণে জোর দিচ্ছে ইসলামাবাদ। তা ছাড়া আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এ ব্যাপারে বেজিঙের খোলা সমর্থন পাওয়া রাওয়ালপিন্ডির জন্য একেবারেই অসম্ভব নয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সেই কারণেই এস্যাট (অ্যান্টি স্যাটেলাইট) ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার দৌলতে কৌশলগত দিক থেকে এগিয়ে আছে ভারত। যুদ্ধ পরিস্থিততে এর সাহায্যে অনায়াসেই পাক কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাশূন্যে ওড়াতে পারবে নয়াদিল্লি। এতে মুহূর্তে ভেঙে পড়বে দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা। তখন ইসলামাবাদের পক্ষে নিখুঁত নিশানায় হামলা করা যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য। অন্য দিকে, মহাকাশে হামলার ভয়ে রাওয়ালপিন্ডিকে সাহায্য না করতেও পারে বেজিং।
রুশ ‘এস-৪০০’র আদলে ‘কুশ ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা’ (সারফেস টু এয়ার মিসাইল) তৈরি করেছে ডিআরডিও। একে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার তৃতীয় স্তর বলা যেতে পারে। তিন ধরনের ইন্টারসেপ্টর রকেটের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই কুশ প্রকল্প। সেগুলির পাল্লা যথাক্রমে ১৫০, ২৫০ এবং ৩৫০ কিলোমিটার। মূলত, শত্রুর লড়াকু জেট, ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ধ্বংসের কথা মাথায় রেখে এর নকশা তৈরি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
এ-হেন কুশ প্রকল্পকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে ডিআরডিওর। সেই লক্ষ্যে চলছে গবেষণা। এ দেশের আকাশ প্রতিরক্ষার চতুর্থ স্তরে আছে মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘এমআর-স্যাম’ (মিড রেঞ্জ-সারফেস টু এয়ার মিসাইল)। সেটা ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড। ৭০-১৫০ কিমি পাল্লার এই হাতিয়ারের পোশাকি নাম ‘বারাক-৮’।
আকাশ প্রতিরক্ষার পঞ্চম স্তরে ‘কিউআর-স্যাম’কে (কুইক রিঅ্যাকশান সারফেস টু এয়ার মিসাইল) রেখেছে ভারতীয় বিমানবাহিনী। ডিআরডিওর তৈরি এই হাতিয়ারের পাল্লা ৫-৩০ কিলোমিটার। ৪,৩৬৪ মিলিমিটার লম্বা এর ইন্টারসেপ্টর রকেটের ওজন ২৭০ কেজি। উৎক্ষেপণের পর ছ’কিমি পর্যন্ত ওড়ার ক্ষমতা আছে তার। একসঙ্গে ছ’টি লক্ষ্যবস্তুকে মাঝ-আকাশে ওড়াতে পারে ‘কিউআর-স্যাম’। ড্রোন হামলা ঠেকাতে এটি বেশ কার্যকর।
ছয় ও সাত নম্বরে স্তরে রয়েছে ‘আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বল্প পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ভেরি শর্ট রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম)। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আটকে খবরের শিরোনামে উঠে আসে এগুলি। এর মধ্যে ‘আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২৫-৪৫ কিলোমিটার। এর তিন-চার রকমের শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে আকাশ ১এস, আকাশ প্রাইম এবং আকাশ নিউ জেনারেশন (এনজি) উল্লেখযোগ্য।
অষ্টম স্তরে রাশিয়া থেকে আমদানি করা ‘ইগলা-এস’ ক্ষেপণাস্ত্রকে রাখা হয়েছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরুর মুখে এই হাতিয়ারের ২৪টি লঞ্চার নয়াদিল্লিকে সরবরাহ করে ‘বন্ধু’ মস্কো। সেই সঙ্গে পাঠায় ১০০ ক্ষেপণাস্ত্রও। গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকে আফগানিস্তান যুদ্ধে সোভিয়েত যুদ্ধবিমান ধ্বংস করতে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল আমেরিকার তৈরি স্ট্রিংগার মিসাইল। ‘ইগলা-এস’কে তারই রুশ সংস্করণ বলা যেতে পারে।
রুশ হাতিয়ারটিতে ব্যবহৃত পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে নিমেষে ধ্বংস করা যায় শত্রুর যুদ্ধবিমান। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫০০ মিটার থেকে ছ’কিলোমিটার। থার্মাল সেন্সরের সাহায্যে নিচু দিয়ে ওড়া জেট এবং হেলিকপ্টার খুঁজে বার করে মাঝ-আকাশে তা উড়িয়ে থাকে ‘ইগলা-এস’। মাত্র একজন সৈনিক কাঁধে নিয়ে ছুড়তে পারেন এটি। আগামী দিনে অস্ত্রটিকে ঘরের মাটিতে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে নয়াদিল্লির।
আকাশ প্রতিরক্ষার নবম ও দশম স্তরে তিনটি হাতিয়ারকে রেখেছে ভারতীয় বিমানবাহিনী। সেগুলি হল, জ়ু-২৩এমএম অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট বন্দুক, জ়েডএসইউ-২৩-৪ শিল্কা এবং এল-৭০। এর মধ্যে প্রথম দু’টি ‘ঠান্ডা যুদ্ধের’ (কোল্ড ওয়ার) সময় তৈরি করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। শেষেরটির নির্মাণকারী সংস্থা সুইডেনের বফোর্স। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাক ড্রোনের ঝাঁককে গুলি করে নামাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে এই তিন অস্ত্র।
জ়ু-২৩এমএম অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট বন্দুকে রয়েছে ২৩ মিলিমিটারের দু’টি অটোকামান। এর মাধ্যমে আকাশে ২.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করা যায়। মাটিতে এর পাল্লা দু’কিলোমিটার। ১৯৬০ সালে জন্ম হওয়া এর নির্মাণকারী সংস্থা হল কেবিপি ইনস্ট্রুমেন্ট ডিজাইন ব্যুরো। অন্য দিকে শিল্কা তৈরি করেছে উলিয়ানভস্ক মেকানিক্যাল প্ল্যান্ট। এতে রয়েছে মোট চারটি ২৩ মিলিমিটারের কামান। ট্যাঙ্ক আকারের ছোট গাড়ির উপর বসানো থাকে সেগুলি।
মিনিটে চার হাজার রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে রুশ শিল্কা। হাতিয়ারটির সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে ২০ কিলোমিটার পাল্লার একটি রেডার। অন্য দিকে, এটি ৪০ মিলিমিটারের বন্দুক বিশিষ্ট সুইডিশ এল-৭০-এর জন্ম ১৯৫২ সালে। মিনিটে ২৫০ থেকে ৩৩০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে এটি। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ার পাল্লা চার কিলোমিটার।
আকাশ প্রতিরক্ষার একেবারে শেষ স্তরে ৩০ কিলোওয়াটের এমকে-টু(এ) লেজ়ার হাতিয়ার মোতায়েন রাখছে ভারতীয় বায়ুসেনা। এটিও তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও। সংশ্লিষ্ট অস্ত্রের পাল্লা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব ক’টি এয়ার ডিফেন্সের মধ্যে সমন্বয় সাধনে ‘ইন্টিগ্রেটেড এয়ার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম’ (আইএসিসিএস) গঠন করেছে এ দেশের বিমানবাহিনী। ফলে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে সমস্ত হাতিয়ার।