পিছিয়ে ছিল ভারতের চেয়ে, বর্তমানে মাথাপিছু আয় ৩৭ হাজার ডলার! দক্ষিণ কোরিয়ার ‘অলৌকিক’ উত্থানের নেপথ্যে হাল্লিউ আর চ্যাবল?
দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের গল্পকে বিশ্বের অন্যতম সফল অর্থনৈতিক রূপান্তর হিসাবে ধরা হয়। ১৯৫০-’৫৩ সালের যুদ্ধের পর দেশটি ছিল হতদরিদ্র। প্রায় পুরোপুরি বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়া ফিনিক্সের মতো আবির্ভূত হয় বিশ্বের দরবারে।
দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) নামটি শুনলেই সকলের আগে মনে আসে কোরিয়ান ব্যান্ড, বিটিএস, কে পপ, কোরীয় সিরিয়াল, সিরিজ়, স্যামস্যাং, এলজি, হুন্ডাইয়ের মতো সংস্থার নাম। এ ছাড়াও কোরিয়ার সৌন্দর্যপ্রণালী ও পণ্যের খ্যাতি জগৎজোড়া। গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য হোক বা দৈনন্দিন জীবনের নানা পণ্য থেকে শুরু করে বিনোদনের রসদ, গোটা পৃথিবীকে জুগিয়ে চলেছে কিমের পড়শি দেশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন জগতের খ্যাতি গোটা বিশ্ব জুড়ে। তাবড় দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় অংশ নেন বিটিএসের কলাকুশলীরা। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপে হাজির হতে দেখা গিয়েছে দক্ষিণ কোরীয় ব্যান্ডটিকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের গল্পকে বিশ্বের অন্যতম সফল অর্থনৈতিক রূপান্তর হিসাবে ধরা হয়। অথচ ’৫০-এর দশকে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলির মধ্যে একটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে। ’৮০-এর দশক থেকে দেশটি উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পে বিনিয়োগ শুরু করে। আজ দক্ষিণ কোরিয়া সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্টফোন, গাড়ি, ব্যাটারি ও জাহাজ নির্মাণে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলির একটি।
১৯৫৩ সালে নর্থ কোরিয়া (ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কোরিয়া)-এর সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া ছিল অত্যন্ত সঙ্কটে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল দেশটি। অর্থনীতি তলানিতে ঠেকে ছিল। ১৯৫০ সালে দেশটির মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৭ ডলার। সেখানে ভারতের মতো দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১২২ ডলার।
১৯৫০-’৫৩ সালের যুদ্ধের পর দেশটির হতদরিদ্র দশা হয়। প্রায় পুরোপুরি বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়া ফিনিক্সের মতো আবির্ভূত হয় বিশ্বের দরবারে। ১৯৬১ সালে পার্ক চুং হি-এর সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকার রফতানিমুখী শিল্পনীতি গ্রহণ করে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন:
দক্ষিণ কোরিয়া দেশটি আয়তনে ক্ষুদ্র। তার ভারতের মতো কৃষিজমির আধিক্য যেমন ছিল না, তেমনই সৌদি আরবের মতো অফুরন্ত তেলের ভান্ডার কিংবা অষ্ট্রেলিয়ার মতো খনিজসম্ভারও নেই। দক্ষিণ কোরিয়া বুঝতে পেরেছিল যে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার ছোট। তাই তারা বিদেশে পণ্য বিক্রির উপর জোর দেয়।
যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া বিপুল পরিমাণ মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পায়। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা লাভের পথ সুগম হয়। আমেরিকার দাক্ষিণ্যে পায়ের তলার জমি শক্ত হতেই দক্ষিণ কোরিয়া ব্যাপক ভাবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করে। স্বাক্ষরতার হার দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয় তৎকালীন সরকার।
শুরুতে পোশাক, জুতো ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রফতানি করলেও পরে ইস্পাত, জাহাজ, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্সে এগিয়ে যায় সোল। সরকার বিশেষ সুবিধা দিয়ে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলিকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কোরীয় ভাষায় এই ধরনের সংস্থাগুলিকে ‘চ্যাবল’ বলে ডাকা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘চ্যাবল’ নামে পরিচিত বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলি। ‘চ্যাবল’ শব্দটি কোরীয় ভাষার ‘চায়ে’ (সম্পদ) এবং ‘বল’ (গোষ্ঠী বা দল) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলি মূলত পরিবার নিয়ন্ত্রিত বিশাল ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। এদের অধীনেই বৈদ্যুতিন জিনিস, গাড়ি, জাহাজ নির্মাণ, রাসায়নিক, আর্থিক পরিষেবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতের অসংখ্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়।
আরও পড়ুন:
১৯৬০ ও ১৯৭০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার শিল্পায়ন ও রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ সব শিল্পগোষ্ঠীকে ঋণ, করে সুবিধা এবং নীতিগত সহায়তা দেওয়া শুরু করে। এর ফলে স্যামসাং, হুন্ডাই, এলজি কর্পোরেশন, এসকে গ্রুপের মতো চ্যাবলগুলি দ্রুত বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। বর্তমানে এ সব প্রতিষ্ঠান শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি, উৎপাদন ও রফতানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছে।
বর্তমানে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলির একটি বলে গণ্য করা হয় দক্ষিণ কোরিয়াকে। স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশের পর সেই দরিদ্র দেশের মাথাপিছু আয় কয়েক ডলার থেকে বেড়ে ৩৭ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। রাজধানী শহর সোল আজ বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শহর। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে দক্ষিণ কোরিয়ার এই রূপান্তরকে অর্থনীতির ইতিহাসে ‘হান নদীর অলৌকিক উত্থান’ বলে উল্লেখ করা হয়।
শুধু শিল্প বা পণ্য নয়, দেশীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে বেচার সুচতুর কৌশল বার করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সঙ্কটের পর দক্ষিণ কোরিয়া উপলব্ধি করে যে, শুধু শিল্প ও প্রযুক্তির উপর নির্ভর করলে চলবে না। তাই সরকার চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সঙ্গীত, অ্যানিমেশন, গেমিং এবং সাংস্কৃতিক শিল্পকে নতুন অর্থনৈতিক খাত হিসাবে গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্যোগী হয়। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক স্টুডিয়ো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারে সহায়তা দেওয়া হয়।
শিল্পক্ষেত্রে এই জোয়ারকে ‘কোরিয়ান ওয়েভ’ (হাল্লিউ) বলে ডাকা হয়। এই জোয়ার কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল সরকার, বিনোদন শিল্প এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ফসল। এশিয়ায় ও বাকি বিশ্বে কোরিয়ান টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয়তার মাধ্যমে এর সূচনা হয়। পরে কে-পপ, কে-ড্রামা, চলচ্চিত্র, অনলাইন গেম, কে-বিউটি এবং কোরিয়ার খাবার বিশ্ব জুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
২০১০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইন্টারনেট গতি এবং ব্রডব্যান্ড নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য পশ্চিমি দেশগুলির তুলনায় প্রায় ৪-৫ বছর এগিয়ে ছিল। দেশটিতে ওয়াইফাই হটস্পটের সংখ্যা ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ২০১০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রায় ৬৬,০০০ হটস্পট চালু করা হয়েছিল। মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি থ্রিজি প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য আনলিমিটেড বা সীমাহীন ডেটা প্ল্যান চালু করেছিল। এর সুফল পেতে শুরু করে দেশের অর্থনীতি।
’৯০-এর দশকের শেষ দিকে শুরু হওয়া কোরিয়ার সাংস্কৃতিক ঢেউ সুলভ ইন্টারনেটের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের অনেকেই হয়তো ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ গানটিকে মনে রেখেছি। ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ এমনই একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা, যা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোরিয়ান ওয়েভ’ (হাল্লিউ)-কে বিশ্বব্যাপী নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ২০১২ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত হয় গানটি। গানটির আকর্ষণীয় সুর, ব্যতিক্রমী নাচের ভঙ্গি এবং ভিডিয়োটি অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। ১০০ কোটি বার দেখা হয়েছিল ভিডিয়োটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান ওয়েভ (হাল্লিউ)-এর অন্যতম প্রধান মুখ বিটিএস। ২০১৩ সালে আত্মপ্রকাশের পর বিটিএস ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডের তকমা পায়। অ্যালবাম বিক্রি, বিশ্বসফর, অনলাইন স্ট্রিমিং, বিজ্ঞাপন এবং লাইসেন্সিং থেকে বিপুল আয় হয়েছে তাদের। তবে এর চেয়েও বড় প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বিটিএসের জনপ্রিয়তায় প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বিদেশি ভক্ত দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ করেন। তাঁরা কনসার্টে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিটিএস সংক্রান্ত স্থানও ঘুরে দেখেন। ফলে হোটেল, বিমান, রেস্তরাঁ ও খুচরো ব্যবসায় আয় বাড়ে। অ্যালবাম বিক্রি, ডিজিটাল স্ট্রিমিং, সঙ্গীতের অনুষ্ঠান, স্বত্ব বিক্রি করে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন শিল্পে কয়েক হাজার কোটি ডলারের লেনদেন হয় প্রতি বছর।
বিটিএসের প্রভাব শুধু সাংস্কৃতিক আবহেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাবে কোরীয় প্রসাধনী ফ্যাশন, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদা বেড়েছে। বিটিএসের কারণে সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্পের দেশ হিসাবেও বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক আগ্রহও বেড়েছে।
বিটিএসের তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে দেশ-বিদেশে বাড়ছে কোরীয় ভাষা শেখার আগ্রহ। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতে। বিটিএসের বার্ষিক অর্থনৈতিক অবদান কয়েকশো কোটি ডলারের সমতুল্য বলে দাবি উঠেছে অর্থনৈতিক মহলে। কিছু বিশ্লেষণে এই ব্যান্ডটির প্রভাবকে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি মাঝারি আকারের শিল্পখাতের সমান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
একদা দারিদ্রক্লিষ্ট ক্ষুদ্র দেশটি আজ মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। কারণ তুলনামূলক ভাবে কম জনসংখ্যা নিয়েও উচ্চমূল্যের শিল্প ও প্রযুক্তি, বিনোদন, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বাণিজ্যসফল এক দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। গান, বিনোদন ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে কী ভাবে একটি দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, পর্যটন এবং বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে পারে তার সফল উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া।