সৈকত জুড়ে পোশাকের পাহাড়, সমুদ্র থেকেও ওঠে জামাকাপড়! ‘অন্ধকার মহাদেশের’ বাস্তুতন্ত্র ভাঙছে ‘ওব্রোনি ওয়াউ’
গরিব দেশ ঘানা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যবহৃত পোশাক আমদানিকারক দেশ হিসাবে পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় সেগুলিকে ‘ওব্রোনি ওয়াউ’ বলা হয়। এর অর্থ মৃত শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির পোশাক।
আজকাল বহু মানুষই এক জামা বার বার পরেন না। ছবি তুললে যে ধরা পড়ে যাবে তিনি একই জামা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরেন! ফলত পোশাক কেনার হিড়িকেরও শেষ নেই। পুরনো বাতিল জামাগুলি কোথায় যায়, সে বিষয়ে কখনও ভেবে দেখেছেন?
বিশ্বের বুকে থাকা কিছু সৈকত হল বাতিল সে সমস্ত পোশাকের ঠিকানা। সে সমস্ত সৈকতে বালির কণার থেকে কাপড়ের টুকরোর পরিমাণ বেশি বললে অত্যুক্তি করা হবে না। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সৈকতের বুকে গজিয়ে উঠেছে পাহাড়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, সেগুলি আসলে ডাঁই করা পোশাক।
আফ্রিকার ঘানার আক্রায় বেশ কিছু সৈকতে এই চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে, আক্রার জেমসটাউন এবং কোর্লে লাগুনের সৈকত পুরনো পোশাকের পাহাড়ে ঢেকে থাকার বিষয়ে এগিয়ে। সেখানকার সৈকতে বালি চোখে পড়াই দুষ্কর। প্রায় সমস্ত সৈকত জুড়ে রয়েছে পুরনো পোশাকের মেলা।
গরিব দেশ ঘানা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যবহৃত পোশাক আমদানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় সেগুলিকে ‘ওব্রোনি ওয়াউ’ বলা হয়। এর অর্থ মৃত শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির পোশাক।
প্রতি সপ্তাহে আমেরিকার একাংশ, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত পোশাক ঘানায় পৌঁছোয়। এই পোশাকগুলি এর পর ঘানার বাজার ছেয়ে ফেলে।
আরও পড়ুন:
ঘানার কান্টামান্টো মার্কেট এ সমস্ত পোশাক বিক্রির জন্য বিখ্যাত। তবে সে সমস্ত পোশাক যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ নেই। পুঁটলি ধরে পোশাকগুলি বিক্রি হয়। স্থানীয় অর্থের বিনিময়ে পুঁটলি কিনতে হয়। এর পর সেটির মধ্যে ছেঁড়া, ফাটা যা থাকে, সেগুলি নিয়েই খুশি থাকতে হয়। পরে দোকানে গিয়ে মেজাজ দেখিয়ে সেগুলি বদলে আনারও কোনও উপায় নেই।
বর্তমানে ‘ফার্স্ট ফ্যাশন’ বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকের কাপড়ের মানও হ্রাস পেয়েছে। সুতির পোশাক সেই তালিকায় প্রায় নেই বললেই চলে। বেশির ভাগই পলিয়েস্টারের তৈরি নিম্ন মানের পোশাক। ফলত সেগুলি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কোনও অস্বাভাবিক বিষয় নয়।
আজকাল তাই পুঁটলিতে বাঁধা প্রায় ৪০ শতাংশ পোশাকই দাগযুক্ত, ছেঁড়া বা ব্যবহারের অযোগ্য হয়। সেই কারণে সেগুলি বর্জ্য ফেলার জায়গায় স্থান পায়। প্রতি মাসে এ ভাবেই টন টন পোশাক আক্রার আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিত্যক্ত হয়।
আক্রার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো অত উন্নত নয়। ফলত সেগুলির বেশির ভাগই নর্দমা এবং অননুমোদিত আবর্জনার স্তূপে ফেলা হয়। এর বড় অংশ সমুদ্রের ধারে অবস্থিত। ফলস্বরূপ সমুদ্রের জলের সঙ্গে ভেসে গিয়ে সেগুলি আক্রার বিভিন্ন সৈকতে স্থান পায়। এ ভাবেই সৃষ্টি হয় পোশাকের পাহাড়।
আরও পড়ুন:
এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেই, একই সঙ্গে ঘানার মৎস্যজীবীদেরও পড়তে হচ্ছে বিভিন্ন সমস্যার মুখে। এমনকি ঘানার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যও এই কারণে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে মত বিভিন্ন পরিবেশবিদের।
এ সমস্ত পোশাকের অধিকাংশই তৈরি হয়েছে পলিয়েস্টার, নাইলন বা অ্যাক্রিলিকের মতো কাপড় দিয়ে। সেগুলি সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেঙে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক সৃষ্টি করে। ওই মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্রের জলের সঙ্গে মেশার ফলে জলদূষণের মাত্রা তো বৃদ্ধি পাচ্ছেই, একই সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণীদের শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। এককথায়, সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
আক্রার মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার ক্ষেত্রেও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাঁদের দাবি, অনেক সময়ই সমুদ্রে জাল ফেলার পর মাছের বদলে কেবল কয়েক দলা পোশাক উঠে আসে। সেগুলিও বালিতে ভরা থাকে। ফলত জেলেদের আগে থেকে কিছু বোঝার উপায়ও থাকে না।
পোশাকের সঙ্গে বালি মিশে আক্রার সৈকতগুলিরও বারোটা বাজছে। বালিতে পোশাকের কণা মিশে যাওয়ায় আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বন্যা, মাশা-মাছির উপদ্রব প্রভৃতি বেড়ে যাচ্ছে।
সেখানকার সৈকতে শিশুদেরও পোশাকের পাহাড়ের উপর খেলে বেড়াতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে বালির তলায় পোশাক চাপা পড়ে দড়ির মতো এক বদখত জিনিস তৈরি হয়। তাতে এক বার পা আটকালে সেখান থেকে মুক্তি পেতে কালঘাম ছুটে যায়। এ ক্ষেত্রে সমুদ্রের কাছে, যেখানে ঢেউ পৌঁছোয়, সেখানে এমনটা হলে প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে যেতে পারে বইকি।
বহু অসরকারি সংস্থা থেকে ঘানার সরকারকে পুরনো বস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পুরনো বস্ত্র আমদানির পরিমাণও কমাতে বলা হয়েছে। বেশ কিছু অসরকারি সংস্থা সৈকতে জমে থাকা পুরনো জামার সুতো কাজে লাগিয়ে পুনরায় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরির চেষ্টায় কাজে লেগেছন। তবে এই পাহাড় পাকাপাকি ভাবে কবে সরবে তা নিয়ে ধন্দের মেঘ সহজে কাটার নয়।