সেউতায় অনুপ্রবেশের নেপথ্যেও ট্রাম্প? প্রেসিডেন্টকে চটিয়েই ‘শাস্তি’ পেল স্পেন? কোন ভূরাজনীতির শিকার ফুটবলের দেশ?
হঠাৎ করে মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতায় দলে দলে শরণার্থী কেন আশ্রয় নিতে চাইছেন? সেউতায় হাজার হাজার মানুষের ঢল, মরক্কো-আলজ়েরিয়া দ্বন্দ্বে কি নতুন ভূরাজনৈতিক খেলার শিকার স্পেন?
জুলাই মাসের শেষাশেষি কাতারে কাতারে অনুপ্রবেশকারীর ঢল নামে স্পেনের শান্ত শহরে। স্পেনের অধীনস্থ শহর সেউতা। মাইলের পর মাইল পথ উজিয়ে, সমুদ্র সাঁতরে, সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকেছেন শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে প্রবীণ নাগরিক। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা অন্তত ৬০ হাজার। প্রতিকূলতা কাটিয়ে সেউতায় পৌঁছোতে গিয়ে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে। স্পেনের উপকূলীয় শহর সেউতায় ঘটা সেই অনুপ্রবেশের ঘটনায় বিস্মিত গোটা বিশ্ব।
১৫৮০ সাল থেকে মরক্কোর উত্তর উপকূলের সেউতা স্পেনের অধীনে। উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট স্প্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত শহর ও ছিটমহল সেউতা। এটি মরক্কোর ভূখণ্ডের মধ্যে ঢুকে থাকা স্পেনের অংশ। মাত্র ১৮.৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে ৮৩–৮৪ হাজার মানুষ বাস করেন।
সেউতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ, কিন্তু ভৌগোলিক ভাবে আফ্রিকায়। ফলে এটি কার্যত আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের একটি স্থলপথ। আফ্রিকা মহাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যে দু’টি স্থলসীমান্ত রয়েছে তার একটি হল এই সেউতা, অন্যটি মেলিয়া। ফলে আফ্রিকা থেকে ইউরোপ আসার জন্য বহু নাগরিকই এই সীমান্ত ব্যবহার করে থাকেন।
উন্নত জীবনযাত্রার আকর্ষণে ও রোজগারের আশায় মরক্কো থেকে উত্তর আফ্রিকার সেউতায় পাড়ি দেন আফ্রিকাবাসীদের অনেকেই। মরক্কো ভৌগোলিক ভাবে সেউতাকে ঘিরে রাখলেও ছিটমহলের ভিতরে ঢুকলে অভিবাসীরা স্পেনের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায় চলে আসেন। তাই আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকেও অভিবাসীরা মরক্কো হয়ে সেউতায় পৌঁছোনোর চেষ্টা করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেউতা স্পেনের মূল ভূখণ্ডের অন্তর্গত নয়। ১৮.৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই এলাকাটি মরক্কোর একেবারে উত্তরাংশে অবস্থিত। এর গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে জিব্রাল্টার প্রণালী। বর্তমানে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা মাত্র ৮৪ হাজার। অর্থাৎ, গত ২৯ জুলাই মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি বেআইনি অনুপ্রবেশের সাক্ষী হয় মাদ্রিদ নিয়ন্ত্রিত সৈকত-শহরটি।
আরও পড়ুন:
সাদা চোখে দেখলে, আইনি নির্দেশের ফলে স্পেনের অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি হতেই অনুপ্রবেশের ঢল নেমেছে উত্তর আফ্রিকার সীমান্ত শহরটিতে। দীর্ঘ দিন ধরে উদার অভিবাসন নীতি নিয়ে চলছে মাদ্রিদের বামপন্থী সরকার। তার উপর এ বছরের জুনে বেআইনি অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত মামলায় কড়া রায় দেয় সেখানকার সর্বোচ্চ আদালত।
সেই গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত বলেছিল, সেউতার জলসীমা দিয়ে সাঁতরে বা সমুদ্রপথে স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছোনো ব্যক্তিকে সীমান্তেই দাঁড় করিয়ে তড়িঘড়ি মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। সেই আইনের ফাঁক গলে সেউতায় প্রবেশ করতে চাইছেন মরক্কোর নাগরিকদের একাংশ।
তবে স্থলপথে যাঁরা অবৈধ ভাবে ঢুকছেন, তাঁদের জন্য এই আইন প্রযোজ্য নয়। সেউতার আঞ্চলিক প্রশাসনের মতে, সেই রায়ের কারণে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে তাঁদের শহরে ঢুকে পড়েছেন। অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, দিন কয়েক থাকা যাবে সেউতায়। মরক্কো থেকে সেউতা যাওয়ার জন্য স্থলসীমান্তের উঁচু বেড়া টপকানো অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সমুদ্রপথে সাঁতরে গেলে পরিস্থিতি আলাদা।
এই পরিস্থিতিতে স্পেনের অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেরিল্যান্ডে মন্ত্রিসভার বৈঠক সেরে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘সেউতার ভিডিয়ো দেখে মনে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ একটি দেশ আক্রমণ করেছে। আমেরিকায় রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচিত না হলে আমাদের সঙ্গে ঠিক এই ঘটনাই ঘটবে। এবং সেটা হবে আরও ভয়াবহ।’’
আরও পড়ুন:
এই দৃশ্যকে ট্রাম্প স্পেনের দুর্বল সীমান্তনীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি সেউতার পরিস্থিতিকে মহাবিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রেও এমন অভিবাসন সঙ্কট উদ্ভূত হতে পারে। এই ঘটনাপ্রবাহ ইউরোপের রাজনৈতিক মহলকে নাড়া দিয়েছে গভীর ভাবে। হঠাৎ করে মরক্কো থেকে সেউতায় দলে দলে শরণার্থী কেন আশ্রয় নিতে চাইছেন তা নিয়ে একাধিক মতামত ছড়িয়েছে সমাজমাধ্যমে।
মরক্কোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। ট্রাম্প ২০২০ সালে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কও শক্তিশালী। আর মরক্কোর সঙ্গে সাহারা নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছে আলজ়েরিয়া। মরক্কো ও আলজ়েরিয়ার দীর্ঘ দিনের বৈরিতার কেন্দ্রে রয়েছে পশ্চিম সাহারা।
পশ্চিম সাহারা দীর্ঘ দিন স্পেনের উপনিবেশ ছিল। ১৯৭৫ সালে স্পেন সরে যাওয়ার পর মরক্কো ও মৌরিতানিয়া অঞ্চলটির উপর দাবি তোলে। অন্য দিকে ছিল পলিসারিও ফ্রন্ট। এই ফ্রন্ট পশ্চিম সাহারার একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন। এটি ১৯৭৩ সালে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য গঠিত হয়। বর্তমানে এই দল মরক্কোর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করছে। ১৯৭৫–’৯১ পর্যন্ত মরক্কো ও পলিসারিওর মধ্যে যুদ্ধ চলে।
আলজ়েরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন করে। আর পুরো পশ্চিম সাহারাকে মরক্কো তাদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। পলিসারিও ফ্রন্টকে রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে তারা। বিপুল সংখ্যক সাহরাউই শরণার্থী আলজ়েরিয়ার তিন্দুফ এলাকার শিবিরে বসবাস করেন। ফলে আলজ়েরিয়া কার্যত মরক্কোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে মরক্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে আলজ়েরিয়া। এর পর সীমান্ত, আকাশপথ, জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়েও দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির ঘটে। ২০২৪ সালে মরক্কোর নাগরিকদের জন্য আবার ভিসা চালু করে আলজ়েরিয়া। দুই বিবদমান দেশের এই শত্রুতার মধ্যে স্পেন ঢুকে পড়ে হঠাৎ করেই।
পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা ব্রাহিম ঘালি চিকিৎসার জন্য গোপনে স্পেনে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন। তিনি পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা, আর পলিসারিওকে দীর্ঘ দিন ধরে আলজ়েরিয়া সমর্থন করে আসছে। ঘালির চিকিৎসার খবর প্রকাশ্যে আসার পর মরক্কো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
এর পরেই ২০২১ সালের মে মাসে প্রায় ৮,০০০ মানুষ মরক্কো থেকে ঢুকে পড়েন সেউতায়। মরক্কো সীমান্তরক্ষীদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে এই গণপ্রবাহকে স্পেনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, এমন অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি স্পেন-মরক্কো সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। মাদ্রিদের কূটনৈতিক মহলের দাবি, পলিসারিও নেতাকে সাহায্য করার শোধ তুলছে মরক্কো। স্পেনের প্রশাসন মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগও তোলে।
২০২৪ সালে প্যালেস্টাইনকে সমর্থন করে ইজ়রায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব হয় পেদ্রো সানচেজ়ের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী জোট সরকার। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকেই সানচেজ গাজ়ায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি তোলেন। ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযানে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর তীব্র সমালোচনা করেন। ২০২৪ সালে স্পেন আনুষ্ঠানিক ভাবে প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।
ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের আপত্তি উপেক্ষা করে স্পেন আনুষ্ঠানিক ভাবে প্যালেস্টাইনকে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তা নিয়ে তেল আভিভ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে মাদ্রিদের সংঘাত প্রকাশ্যে চলে আসে। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার পর প্রতিবাদ জানিয়েছিল মাদ্রিদ। এমনকি ইজ়রায়েলের সঙ্গে স্থায়ী ভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করে ফুটবলের দেশটি।
ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের দেশের জমি ব্যবহার করতে না দেওয়ার ‘অপরাধে’ ইতিমধ্যেই স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। গত ৪ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তাতে দমে না গিয়ে এ বার আমেরিকার সামরিক মিত্র ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতেও দু’বার ভাবেনি পেদ্রোর বামপন্থী সরকার।
ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশন এপিক ও অপারেশন ফিউরি শুরু করার পর ইউরোপের অন্য দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের থেকে খানিক স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছেন পেদ্রো। স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দেগেছেন ট্রাম্প। জানিয়েছেন, এর দাম দিতে হবে স্পেনকে। মাদ্রিদ অবশ্য নিজস্ব অবস্থানে অনড়। ট্রাম্পের অভিযোগ নেটো থেকে সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধা কড়ায়-গন্ডায় আদায় করে নিচ্ছে স্পেন। উল্টে যখন তার প্রতিদান দেওয়ার কথা তখন কিছুই দিচ্ছে না।
এই অবস্থায় সেউতার ঘটনাকে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের কূটনৈতিক চাল বলে মনে করছেন অনেকেই। স্পেনকে ‘শিক্ষা দিতে’ মরক্কোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে অনুপ্রবেশ সঙ্কট তৈরি করতে চাইছে দুই সুপার পাওয়ার দেশ এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। সেউতা সঙ্কটটি এমন এক সময় ঘটেছে, যখন স্পেন ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ফলে অভিবাসন ইস্যুটি পেদ্রো স্যাঞ্চেজ় সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।