মোটা কমিশন দিয়ে ‘চিরশত্রু’ দেশের সেনা নিয়ে ফৌজ গড়ছে মস্কো! টিকটক ও ফেসবুকে যোদ্ধা খুঁজছে পুতিনের দেশ
সেনার সংখ্যা যদি বিচার করা হয় তা হলে ইউক্রেনের থেকে চার গুণেরও বেশি রয়েছে রাশিয়ার। সামরিক শক্তিতেও কিভের চেয়ে অনেক এগিয়ে মস্কো। তার পরেও সৈন্য সংগ্রহের জন্য বিদেশি ভাড়াটে ফৌজিদের উপর ভরসা করছে রুশ প্রতিরক্ষা বাহিনী।
লড়াই থামার লক্ষণ নেই পূর্ব ইউরোপে। চার বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির নামগন্ধ নেই। সমান তালে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে দু’পক্ষই। সামরিক অভিযান চালাতে যে দু’টি প্রধান উপকরণ প্রয়োজন হয় তা হল অর্থ ও সৈনিক। দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণ গিয়েছে দু’পক্ষের সেনারই। পশ্চিমি গোয়েন্দা রিপোর্ট ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী ৪-৫ লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন।
স্বাভাবিক ভাবেই এই একটানা যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে সেনাবাহিনীর রিজ়ার্ভের কাঠামোকে শক্তিশালী করে তুলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে রাশিয়াকে। সামরিক শক্তির নিরিখে বিশ্বের প্রথম তিনটি দেশের মধ্যে একটি হল রাশিয়া। প্রতি বছরই এই তালিকা তৈরি করে ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’।
সেই র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে আমেরিকা। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া রয়েছে দু’নম্বরে। তিন নম্বরে চিন। যদিও দুই এবং তিন নম্বরে থাকা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে পয়েন্টের কোনও তফাত নেই।
২০২৫ সালে করা সমীক্ষায় জানা গিয়েছে সারা বিশ্বের সৈন্যশক্তির নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া। মস্কোর হাতে থাকা ফৌজের সদস্যসংখ্যা ৩৫ লক্ষ ৭০ হাজার। ১৩ লক্ষ সৈন্য সক্রিয় রয়েছে। রিজ়ার্ভে থাকা সৈনিকদের সংখ্যার নিরিখে বাকি দুই মহারথীর থেকে অনেকটাই এগিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ। ২০ লক্ষ সৈন্য রিজ়ার্ভে রেখে দিয়েছে ক্রেমলিন। মস্কোর হাতে থাকা আধা সামরিক বাহিনীর পরিমাণ আড়াই লক্ষ।
সেনার সংখ্যা যদি বিচার করা হয় তা হলে ইউক্রেনের থেকে চার গুণেরও বেশি রয়েছে রাশিয়ার। ইউক্রেনের রয়েছে সাড়ে আট থেকে ন’লক্ষ সেনা। রাশিয়ার মোট সেনাসংখ্যার ধারেপাশে আসতে পারবে না কিভ। স্বাভাবিক ভাবেই সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে রাশিয়া।
আরও পড়ুন:
তার পরেও সৈন্য সংগ্রহের জন্য বিদেশের ভাড়াটে ফৌজিদের উপর ভরসা করছে মস্কো। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যবল বাড়াতে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য বিদেশি যোদ্ধা সংগ্রহ এখন রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র মারফত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বর্তমানে ১৩৫টি দেশের প্রায় ২৯ হাজার বিদেশি নাগরিক রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। অবাক করার মতো বিষয় হল তার মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাড়াটে ফৌজিরাও! বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের পাশাপাশি এই নিয়োগ তালিকায় অন্তত ১৮ জন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগে রাশিয়া টিকটক ও ফেসবুকের মতো সমাজমাধ্যমকেও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সম্ভাব্য নিয়োগপ্রার্থীদের খুঁজে বার করতে রুশ এজেন্টরা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার চালাচ্ছেন। নতুন সদস্য রুশ বাহিনীতে যোগ দিলে ওই এজেন্টরা মোটা কমিশনও পান বলে জানা গিয়েছে।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, রুশ বাহিনীতে সৈন্য জোগাড় করে দেওয়ার জন্য এক শ্রেণির এজেন্টদের পকেট ফুলেফেঁপে উঠছে। বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ানোর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জন করছেন তাঁরা। কেউ কেউ প্রত্যেক নতুন সদস্যের জন্য প্রায় ২৪ হাজার ডলার বা প্রায় ২৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি, নিয়োগ করা ব্যক্তির বেতনের একটি অংশও কমিশন হিসেবে দেওয়া হয় বলে দাবি তুলেছেন অনেকে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পৃথক ভাবে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতারণামূলক ও শোষণমূলক নিয়োগ পদ্ধতির নথি প্রকাশ করেছে। এ সব ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নিয়োগপ্রার্থীদের রাশিয়ায় বেসামরিক চাকরি, উচ্চ বেতন, বৈধ আইনি মর্যাদা, এমনকি রুশ নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
অ্যারিজ়োনার গিলবার্টের বাসিন্দা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সেনা ছিলেন সেথ উইলিয়াম বেকার নামের এক তরুণ। মার্কিন নৌবাহিনীতে ল্যান্স কর্পোরাল হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও কাজ করেন। ১৮ বছর বয়সে মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়া বেকারকে কোভিড-১৯ টিকা নিতে বলা হয়। বাধ্যতামূলক সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন তিনি।
নির্দেশ অমান্য করার কারণে বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাঁকে। এর পর রাশিয়া যাওয়ার আগে তিনি অনলাইনে রুশপন্থী মতবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে। রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন বেকার। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর।
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের যুদ্ধ, অথচ তার মাশুল গুনছেন বিদেশি তরুণেরাও। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো প্রাক্তন মার্কিন মেরিন সেথ উইলিয়াম বেকারের ঘটনা সামনে আসায় রাশিয়ার বিদেশি নিয়োগ অভিযান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রুশ সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করানোর জন্য ইউক্রেনের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প রয়েছে। সেই প্রকল্পের প্রধান ভিতালি মাতভিয়েঙ্কোর দাবি, বেকারের মতো তরুণ বিদেশিদের রুশ সেনাবাহিনীতে টানার জন্য গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত নিয়োগ নেটওয়ার্ক। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি পূরণে জনবলের সঙ্কট সামাল দিতে গিয়ে রাশিয়া বিদেশি নিয়োগকে কার্যত একটি শিল্পে পরিণত করেছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সদস্য দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে রুশ প্রতিরক্ষা দফতরের। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে দেশের অভ্যন্তরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এড়ানো এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। সরাসরি সাধারণ নাগরিকদের জোর করে যুদ্ধে পাঠানোর চেয়ে ভাড়া করা সৈন্য ব্যবহার করলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিক্ষোভ এড়ানো যা
ভাড়াটে যোদ্ধারা সরকারি সেনাবাহিনীর নিয়মিত কাঠামোর অংশ না হওয়ায়, তাঁদের মৃত্যুর হিসাবও অনেক সময় দেশের সরকারি সামরিক পরিসংখ্যানে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় আলাদা ভাবে বিবেচনা করতে হয়।
আবার নতুন সেনা নিয়োগ করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়িয়ে তুলনামূলক দ্রুত অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো যায়। সরকারি বাহিনীর বাইরে থাকা এই ধরনের যোদ্ধাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও, তার দায় সরাসরি রাষ্ট্রের উপর বর্তানোর ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। এমনটাই দাবি করছেন কিভের সেনাকর্তারা।
ওয়াগনার গ্রুপ রাশিয়ার অন্যতম গোপনীয় একটি সংগঠন। আনুষ্ঠানিক ভাবে এর কোনও অস্তিত্ব নেই। কারণ ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে কাজ করা রুশ ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। কিন্তু ধারণা করা হয়, গত সাত বছরে প্রায় ১০,০০০ কর্মী ওয়াগনারের সঙ্গে অন্তত একটি চুক্তি করেছে। বিবিসির ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে থাকা রুশ সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট জিআরইউ-এর কর্মকর্তাদের কমান্ডাধীন ইউনিটগুলোতে নিয়োগ করা হয়েছে।