সিনেমার পর্দায় সেনা হিসেবে অভিনয় থেকে বন্দুক হাতে সম্মুখসমরে! কী ভাবে কার্গিল যুদ্ধে ৬০ দিন কাটান নানা?
কার্গিলের যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় জওয়ানদের সঙ্গে প্রায় দু’মাস কাটান নানা। যুদ্ধও লড়েন। তবে নানার এ জীবনেও হাতেখড়ি ঘটে সিনেমার সুবাদেই।
না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পটেকর। মৃত্যুকালে অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৭৫। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে গোয়ায় নিজের বাড়িতে হঠাৎই সংজ্ঞা হারান অভিনেতা। চিকিৎসকরা বহু চেষ্টা করেও নানার আর জ্ঞান ফেরাতে পারেননি।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার ভোরে বাড়িতে বুকে ব্যথা অনুভব করেন নানা। তার পরেই সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যান। ভোর সওয়া ৫টা নাগাদ তড়িঘড়ি তাঁকে গোয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদসংস্থা এএনআই জানিয়েছে, তার আগে ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেছিলেন সেখানকার চিকিৎসকেরা। কিন্তু চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ওই হাসপাতালেই নানার দেহের ময়নাতদন্ত হবে।
অভিনেতার পুত্র মল্লার পটেকর জানিয়েছেন, বুকে ব্যথা অনুভব করার পরেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন নানা। তার পরেই চিকিৎসকদের একটি দল অভিনেতার গোয়ার বাড়িতে যায়। কিন্তু চিকিৎসকদের দল সেখানে পৌঁছে দেখে, সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে রয়েছেন অভিনেতা। একটানা সিপিআর দেওয়ার পরেও নানার সংজ্ঞা না-ফেরায় অভিনেতাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সাড়ে ৫টা নাগাদ নানাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
নানার মৃত্যুর খবর বলিপাড়াকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে বহু বলি অভিনেতা-অভিনেত্রী নানার মৃত্যু নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তুলে ধরেছেন অভিনেতার সঙ্গে নিজেদের স্ক্রিন ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্তগুলির স্মৃতি।
দর্শকের কাছেও অভিনেতা হিসেবে নানার খ্যাতির কমতি নেই। অনেকের কাছেই তিনি প্রিয় খলনায়ক, তেমনই বহু দর্শক নানাকে ভালবাসেন তাঁর মজার অভিনয়ের জন্য। তবে অভিনয়জীবনের বাইরে নানা বেশ কিছু দিনের জন্য অপর এক জীবনও কাটিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
কার্গিলের যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় জওয়ানদের সঙ্গে প্রায় দু’মাস কাটান নানা। যুদ্ধও লড়েন। তবে নানার এ জীবনেও হাতেখড়ি ঘটে সিনেমার সুবাদেই।
বলি সিনেমা ‘প্রহার’-এ নানাকে ভারতীয় সেনা হিসাবে অভিনয় করতে দেখা যায়। পর্দায় সেই চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য অভিনেতা তিন বছরের সেনা প্রশিক্ষণ নেন এবং জেনারেল ভিকে সিংহের সঙ্গে কাজ করেন। সে সময় ভিকে সিংহ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন এবং সিনেমাতে একটি সংক্ষিপ্ত চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।
সেনাজীবনের প্রতি নানার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। ১৯৮৮ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে টেরিটোরিয়াল সেনায় যোগ দেন অভিনেতা। পরবর্তী কালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেলের পদও পান।
১৯৯৯ সালে কার্গিলের যুদ্ধ শুরু হলে নানা সেই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ়ের কাছে গিয়ে সেই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন অভিনেতা। প্রথমে জর্জ নানার প্রস্তাবে সহমত জানাননি।
আরও পড়ুন:
জর্জ বলেছিলেন, এক জন সাধারণ মানুষ চাইলেই সেনাদলে যোগ দিতে পারেন না। বিশেষ করে, কার্গিলের মতো যুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করার জন্য যে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, তা নানার আদৌ আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন জর্জ।
নানা জর্জকে জানান যে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সেনা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। একই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর বিষয়েও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। অভিনেতা জানান, তাঁর জাতীয় স্তরে রাইফেল চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। জর্জ শেষমেষ নানাকে কার্গিল যুদ্ধে লড়ার অনুমতি দেন।
পরবর্তী কালে এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, কার্গিল যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের সঙ্গে প্রায় ৬০ দিন কাটিয়েছিলেন নানা। কার্গিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদলের ‘কুইক রিয়্যাকশন টিম’-এর অংশ হন নানা। সেনাদের সঙ্গে দ্রাস, লেহ, কুপওয়ারা, বারমুল্লা এবং সোপোরোর মতো জায়গায় ভ্রমণও করেছিলেন তিনি।
তবে সেই যুদ্ধে নানার কাজ ঠিক কী ছিল তা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিতে চান না। অভিযানগত বিবরণ প্রকাশ করা যাবে না বলে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অভিনেতা।
সূত্র অনুযায়ী খবর, কার্গিলের যুদ্ধক্ষেত্রে নানা প্রায়শই সেনাদের সঙ্গে সীমান্ত টহল দিতে যেতেন। এর পাশাপাশি তিনি আহত সেনাদের দেখতে হাসপাতালেও যেতেন। সেখানে গিয়ে সেনাদের মনের জোড় বাড়ানোর চেষ্টা করতেন অভিনেতা। এ ছাড়া কার্গিলে সেনাদের কিছু গোপন অভিযান পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন নানা।
নানা জানান, কার্গিল যুদ্ধে যাওয়ার সময় নানার ওজন ছিল ৭৬ কেজি। দু’মাস পর সেখান থেকে যখন ফিরে আসেন, তখন অভিনেতার ওজন হয় ৫৬ কেজি। কিন্তু কার্গিলের যুদ্ধে যোগ দেওয়া নিয়ে অভিনেতার মনে কেবল ভাল লাগাই ছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, দেশের জন্য এ টুকু করতে পেরে তিনি আপ্লুত।
মরাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টেও মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নানা। ২০১৩ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় টেরিটোরিয়াল আর্মি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
নানার অভিনয়ের গুণ যেমন সর্বজনবিদিত, তেমনই তাঁর দেশপ্রেমও প্রশংসনীয়। কেবল সিনেমার পর্দায় সেনা হিসাবে অভিনয় করাই নয়, বাস্তবেও নিপুণতার সঙ্গে অভিনেতা সে দায়িত্ব পালন করেছেন। বৃহস্পতিবার ভোরে অভিনেতার জীবনে দাঁড়ি পড়লেও, দেশবাসীর স্মৃতিতে তিনি সর্বদা রয়ে যাবেন।