কাঁটাতারের বেড়া দিতে ১.৪৪ বর্গমাইল ভূমি বিনিময়! সীমান্ত সুরক্ষায় পুবের পড়শিকে ‘জমি দান’ করবে ভারত?
প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে জমি বিনিময়ের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। কতটা লাভ হবে দিল্লির?
সীমান্ত সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ। সাবেক বর্মা মুলুকের সঙ্গে জমি বিনিময় করবে ভারত? বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবাল। তিনি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে কেন্দ্র। শেষ পর্যন্ত তাতে সিলমোহর পড়লে ভারত ও মায়ানমারের মধ্যে একটি যুগান্তকারী স্থলসীমান্ত চুক্তি যে সম্পন্ন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের ৫ অগস্ট একটি সাংবাদিক বৈঠকে রণধীর বলেন, ‘‘দুই দেশের সীমান্তে এমন কিছু এলাকা রয়েছে, যেগুলির নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। এ ব্যাপারে সমাধানসূত্র বার করতে দু’পক্ষের আলোচনা চলছে।’’ উত্তর-পূর্ব ভারতের চারটি রাজ্যের সঙ্গে মায়ানমারের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। সেগুলি হল, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজ়োরাম। এর মধ্যে কোন রাজ্যের ভূখণ্ড বিনিময় হতে পারে, তা স্পষ্ট করেনি নয়াদিল্লি।
ভারত-মায়ানমার মোট সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১,৬৪৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে অরুণাচলের সঙ্গে ৫২০ কিমি, মিজ়োরামের সঙ্গে ৫১০ কিমি, মণিপুরের সঙ্গে ৩৯৮ কিমি এবং নাগাল্যান্ডের সঙ্গে ২১৫ কিমি লম্বা সীমান্ত রয়েছে। স্বাধীনতার পর গোড়ার দিকে সেখানে বেড়া দেওয়ার কোনও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি নয়াদিল্লি। শুধু তা-ই নয়, ওই এলাকা দিয়ে এ পার-ও পার যাতায়াতে অভ্যস্ত স্থানীয় বাসিন্দারা।
কিন্তু, পরবর্তী কালে মাদকপাচার, চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের সূচক বৃদ্ধি পাওয়ায় টনক নড়ে নয়াদিল্লির। ফলস্বরূপ, ২০০৩ সালে মায়ানমার সীমান্তে শুরু হয় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ। ২০২৩ সালে তাতে গতি আনে কেন্দ্র। এই সীমান্তের নজরদারিতে মোতায়েন আছে অসম রাইফেল্স। ওই কেন্দ্রীয় আধা সেনার তত্ত্বাবধানেই বসানো হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া। সেই কাজ করতে গিয়ে ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’য় বেশ কিছু সমস্যার মুখে পড়েছে তারা।
মণিপুরের চান্দেল জেলা মায়ানমার সীমান্তের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে খবর, সেখানকারই বেশ কিছু জায়গা নিয়ে দু’পক্ষের বিবাদ রয়েছে। এর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বেড়া দেওয়ার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এর জন্য প্রায় ১.৪৪ বর্গমাইল (৩.৭২ বর্গকিলোমিটার) এলাকা অদল-বদল করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও এই কাজ একেবারেই সহজ নয়।
আরও পড়ুন:
ভারত-মায়ানমার সীমান্ত সমস্যার নেপথ্যেও রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের হাত। ১৮২৪-’৮৫ সালের মধ্যে একাধিক যুদ্ধের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ বর্মা মুলুক দখল করে ইংরেজ। এই সময়সীমায় দু’পক্ষের মধ্যে হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হল ইয়ান্ডাবুর চুক্তি। তাতে অসম, মণিপুর, আরাকান (অধুনা মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ) এবং তেনাসেরিম (আজকের মায়ানমারের তানিনথারি) উপকূলীয় এলাকার দখল পান শ্বেতাঙ্গ শাসকেরা।
ইয়ান্ডাবুর চুক্তির পর কাছাড় ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে সাবেক বর্মা। এর পর ১৮৩০ সালে উত্তর-পূর্বের সীমান্ত নির্ধারণের কাজে নামেন ব্রিটিশ সার্ভেয়াররা। সম্পূর্ণ মায়ানমার দখলে চলে আসার পরও তা বন্ধ করেনি ইংরেজ প্রশাসন। ওই জমি জরিপের কাজ শেষ করতে অবশ্য ১০০ বছর লেগে গিয়েছিল। ১৯৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে একটা সীমান্তরেখা নির্ধারণে সক্ষম হয় সার্ভেয়ার দল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সাবেক বর্মা মুলুকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সীমান্তরেখাটি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সার্ভেয়ারেরা কখনওই প্রতি ইঞ্চি জমির মাপজোকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। ১৯৩৭ সালে প্রশাসনিক ভাবে মায়ানমারকে মূল ভারতের থেকে আলাদা করে ইংরেজ প্রশাসন। তার পরও দুই দেশের সীমান্ত আন্তর্জাতিক সীমান্তের তকমা পায়নি। কারণ, দুই জায়গাতেই ছিল একই সরকারের শাসন।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও সাবেক বর্মা মুলুক ছাড়েনি ব্রিটিশ প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ১৯৪৮ সালে ইংরেজদের নাগপাশ থেকে মুক্তি পায় মায়ানমার। অন্য দিকে, ১৯৪৯ সালে এ দেশের অন্তর্ভুক্ত হয় মণিপুর। এর পরই আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুনির্দিষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে দুই প্রতিবেশী। ঘন জঙ্গল এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ার দরুন দ্রুত গতিতে সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল দুঃসাধ্য।
আরও পড়ুন:
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষের দিকে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে মায়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করে নয়াদিল্লি। ওই সমঝোতা মেনে পরবর্তী বছরগুলিতে চলতে থাকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজ। এ ব্যাপারে জটিল ভূপ্রকৃতির পাশাপাশি স্থানীয় জনজাতিদের কথাও দুই প্রতিবেশীকে ভাবতে হয়েছে। তাঁদের বহু গ্রামই আছে ব্রিটিশদের টেনে দেওয়া সীমান্তরেখার উপরে। তা ছাড়া জীবন-জীবিকার স্বার্থে এ পার-ও পারে যাতায়াত করে থাকেন তাঁরা।
সূত্রের খবর, বর্তমানে জটিল ভূ-প্রকৃতি এবং বহু স্থানীয় বিষয় প্রকাশ্যে চলে আসায় ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের এলাকা চিহ্নিত করতে সমস্যা হচ্ছে। এই এলাকাটি মণিপুরের চান্দেল জেলার অন্তর্গত। গত বছরের (২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে বেআইনি অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে সেখানকার মোলচাম থানার অন্তর্গত একটি জায়গায় কাটা হয় কাঁটাতারের বেড়া। বিষয়টি নজরে আসতেই এফআইআর দায়ের করে তদন্তে নামে পুলিশ।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্ধারণে এই স্তম্ভগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থা জিপিএসের (গ্লোবাল পজ়িশনিং সিস্টেম) সঙ্গে এগুলিকে সম্পৃক্ত রাখা হয়। তা ছাড়া সীমান্তস্তম্ভের থাকে আইনগত স্বীকৃতি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেও এগুলির পরিষ্কার উল্লেখ করার নিয়ম রয়েছে। আর তাই ৬৫-৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী এলাকার প্রতিটা ইঞ্চি নিশ্চিত করতে চাইছে ভারত।
এ ব্যাপারে মণিপুর থেকে নির্বাচিত বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ মহারাজা সনাজাওবা লেইশেম্বা বলেছেন, ‘‘আন্তর্জাতিক সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় বেড়া দেওয়ার কাজ শ্লথ হয়েছে। চান্দেল জেলায় বাধাবিঘ্ন সবচেয়ে বেশি। কাঁটাতারের বেড়া তৈরির সামগ্রী চুরি, লোহার পিলার উপড়ে ফেলা, এমনকি সেখানে বেশ কয়েক বার বিস্ফোরণও ঘটানো হয়েছে। অথচ অনুপ্রবেশ ও মাদকপাচার বন্ধ করতে বেড়া দেওয়া জরুরি।’’
বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে খবর, ভারত-মায়ানমার সীমান্তের মোট ১,৪৭২ কিমি এলাকার চিহ্নিতকরণ হয়ে গিয়েছে। তবে ১৭১ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এর সিংহভাগই মণিপুরের অংশ। তা ছাড়া অরুণাচল প্রদেশের কিছু এলাকা নিয়েও দু’তরফে সমস্যা আছে। আলোচনার মাধ্যমে তা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে নয়াদিল্লি। যদিও এলাকা অদল-বদলে মণিপুরবাসীর যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে।
এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে কোঅর্ডিনেশন কমিটি অন মণিপুর ইন্টিগ্রিটি নামের সংগঠন। তাঁদের কথায়, ‘‘মায়ানমারের সঙ্গে জমি বিনিময় ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী। আমরা মণিপুরের ভাগাভাগি মেনে নেব না।’’ একসময় সাবেক বর্মা মুলুকের কাবাও উপত্যকা ছিল উত্তর-পূর্বের রাজ্যটির আওতাধীন। উল্টে সেটাকে এ দেশের অন্তর্গত করার দাবি জানিয়েছে ওই কমিটি। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে স্থানীয় বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে দিল্লি।
দ্বিতীয়ত, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে মায়ানমারে পতন হয় গণতান্ত্রিক সরকারের। তার পর থেকেই পূর্বের প্রতিবেশী দেশটিতে চলছে এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ। ভারত সীমান্ত লাগোয়া সাবেক বর্মা মুলুকের তিনটি প্রদেশ হল কাচেন, সাগাইন এবং চিন। এগুলির বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ফলে জমি বিনিময় তাঁরা কতটা মেনে নেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।
মায়ানমার, তাইল্যান্ড ও লাওসের অন্যতম বড় সমস্যা হল মাদকপাচার। তা ছাড়া সাবেক বর্মা মুলুকে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেখানে বেড়েছে হাতিয়ারের চোরাচালান। দু’টি অপরাধের সঙ্গেই আন্তর্জাতিক চক্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সীমান্ত সমস্যা মেটার ক্ষেত্রে ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’তে বাধা হতে পারে তারাও।
তৃতীয়ত, কৌশলগত দিক থেকে ভারতের কাছে মায়ানমারের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির পণ্য পরিবহণ সহজ করতে সাবেক বর্মা মুলুকের উপর দিয়ে কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজ়িট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে চালাচ্ছে দিল্লি। আগামী দিনে ভারত-মায়ানমার-তাইল্যান্ড ত্রিমুখী মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে কেন্দ্রের। ফলে সীমান্ত সংঘাত মেটাতে মেপে পা ফেলতে হবে কেন্দ্রের মোদী সরকারকে।
সীমান্ত সমস্যা মেটাতে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করে ভারত। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ১৬২টি ছিটমহলের বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। তাতে ১৭,১৬০ একর জমি ঢাকার হাতে তুলে দিয়েছে নয়াদিল্লি। বিনিময়ে পেয়েছে ৭,১১০ একর জমি। তার পরও কাঁটাতারের বেড়া দিতে গিয়ে বহু ক্ষেত্রে এ দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফকে বাধার মুখে পড়তে দেখা গিয়েছে।
ফলে মায়ানমারের সঙ্গে সীমান্তচুক্তি হলে বিবাদ আদৌ মিটবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তা ছাড়া আগামী দিনে সেনাশাসন সরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত এতে মোদী প্রশাসন সবুজ সঙ্কেত দেয় কি না তার উত্তর দেবে সময়।