’৬৫-র যুদ্ধে অস্ত্রবোঝাই রণতরী পাঠিয়ে পাকিস্তানকে সাহায্য, ব্রহ্মসের মার দেখে ‘বন্ধু’র হাত ছেড়ে ভারতের ‘পাশে’ জাকার্তা!
ভারতের সঙ্গে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং অস্ত্র এয়ার-টু-এয়ার বিয়ন্ড ভিস্যুয়াল রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে ইন্দোনেশিয়া। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায় জাকার্তা। কী ভাবে সমীকরণ পাল্টে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াল ওই দ্বীপরাষ্ট্র?
যুদ্ধের সময় খোলাখুলি ভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন। রণতরীবোঝাই হাতিয়ার পাঠিয়ে ইসলামাবাদের হাত শক্ত করা। ছ’দশক পর সেই মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র চুক্তি সেরে ফেলল ভারত। ফলে আগামী দিনে নয়াদিল্লির থেকে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং অস্ত্র এয়ার-টু-এয়ার বিয়ন্ড ভিস্যুয়াল রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্র পাবে তারা! কেন্দ্রের এই সমঝোতাকে প্রতিরক্ষা শিল্পের মাইলফলক হিসাবেই দেখছে পর্যবেক্ষক মহল।
পাক ‘বন্ধুত্ব’ ছেড়ে ভারতের হাত ধরে ফেলা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই দেশটি হল ইন্দোনেশিয়া, যা বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনবহুল রাষ্ট্র। চলতি বছরে ৬ জুলাই জাকার্তাসফরে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সারে দুই দেশ। এতে ব্রহ্মস এবং অস্ত্র ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের উল্লেখ রয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক কখনওই সরলরেখায় চলেনি। গোড়ায় নয়াদিল্লির সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ থাকলেও একটা সময় ইসলামাবাদের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে জাকার্তা। শুধু তা-ই নয়, সংঘাত পরিস্থিতিতে হাতিয়ার পাঠিয়ে রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তাদের পাশে দাঁড়াতেও দেরি করেনি তারা। আবার সেই মধুচন্দ্রিমা কাটিয়ে ‘ডিএনএ তো ভারতেরই’ বলে মন্তব্য করতেও শোনা গিয়েছে সুবিয়ান্তোকে।
১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ওই বছরের ১৭ অগস্ট স্বাধীনতা ঘোষণা করে ইন্দোনেশিয়া। সে সময় ওলন্দাজ (নেদারল্যান্ডস) উপনিবেশ ছিল সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্র। বিশ্বযুদ্ধোত্তর অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির মতো তারাও দুর্বল হয়ে পড়েই আন্দোলনের চাপ সহ্য করতে পারেনি। ফলে ১৯৪৯ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতা পায় জাকার্তা। দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট কিংবদন্তি সুকর্ণ।
১৯৪৫-’৪৯ সাল পর্যন্ত চলা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার আন্দোলনে পুরোপুরি সমর্থন ছিল ভারতের। এই সময়সীমার মধ্যেই নয়াদিল্লির সঙ্গে একটি পণ্য বিনিময় চুক্তি করে জাকার্তা। তাতে বস্ত্রের বিনিময়ে এ দেশের চাল রফতনি করত ওই দ্বীপরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জেরে বাংলায় দুর্ভিক্ষ হওয়ায় তখন খাদ্যে একেবারেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না ভারত। আর তাই ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে হওয়া সমঝোতা যে স্বস্তি দিয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য।
আরও পড়ুন:
১৯৪৬ সালের ২২ জুন একটি বেতার ভাষণে ভারতের সঙ্গে হওয়া পণ্য বিনিময় চুক্তির উল্লেখ করেন ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মহম্মদ হোত্তা। এর ঠিক এক বছরের মাথায় এ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর অনুরোধে একটি ডাকোটা বিমানে সস্ত্রীক জাকার্তা পৌছোন ওড়িশার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টনায়েক। হোত্তা ও সুতান শাহরিকে উড়িয়ে দিল্লি নিয়ে আসেন তিনি।
ইন্দোনেশিয়া হাতছাড়া হচ্ছে বুঝতে পেরে তখন নানা দিক থেকে চাপ তৈরির কৌশল নেয় ওলন্দাজ সরকার। শাহরি ছিলেন জাকার্তার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ভারতে পৌঁছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচার শুরু করেন তিনি। অন্য দিকে বিষয়টি রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তোলে নয়াদিল্লি। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও কোণঠাসা হয়ে পড়ে নেদারল্যান্ডস।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে বিশেষ অতিথি হিসাবে সুকর্ণকে আমন্ত্রণ জানান নেহরু। ১৯৫১ সালের মার্চে একটি মৈত্রী চুক্তিতে সই করে দুই দেশ। সেখানে বলা হয়, চিরস্থায়ী শান্তি এবং চিরকালীন বন্ধুত্বের মধ্যে দিয়ে এগোবে নয়াদিল্লি ও জাকার্তা। ১৯৫৫ সালে বান্দুং সম্মেলনের আয়োজন করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্র। এতে অংশ নেন এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯ জন রাষ্ট্রনেতা।
কিন্তু, ৫০-এর দশক শেষ হওয়ার আগেই ভারত এবং ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কে ধরে চিড়। কারণ, তত দিনে তিব্বত প্রশ্নে চিনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে নয়াদিল্লি। অন্য দিকে, জাকার্তার কাছে বেজিং ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটি উদীয়মান শক্তি। এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বান্দুং সম্মেলনের জন্য নেহরুকে চাপ দিতে থাকেন সুকর্ণ। কারণ, এই ধরনের বৈঠক আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের গুরুত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছিল।
আরও পড়ুন:
নেহরু অবশ্য ইন্দোনেশিয়ার এই দাবিকে একেবারেই পাত্তা দেননি। উল্টে, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন শুরু করেন তিনি। ১৯৬১ সালে এর প্রথম বৈঠক হয় সার্বিয়ার রাজধানী বেলেগ্রেডে। এর এক বছরের মাথায় জাকার্তা এশিয়ান গেমসকে কেন্দ্র করে আরও প্রকট হয় দুই রাষ্ট্রের বিবাদ। সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইজ়রায়েল এবং তাইওয়ানের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে দাঁড়ায় নয়াদিল্লি। এর প্রতিবাদে ভারতীয় দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ দেখায় দ্বীপরাষ্ট্রের জনতা।
অধ্যাপক এলপি সিংহের ‘ডায়নামিক্স অফ ইন্ডিয়ান-ইন্দোনেশিয়ান রিলেশন্স’ গবেষণাপত্রে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তাঁর দাবি, এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে ইহুদিভূমি ইজ়রায়েলকে মান্যতা দেয়নি জাকার্তা। অন্য দিকে, তাইওয়ানকে নিজেদের অভিন্ন অংশ বলে মনে করে চিন। আর তাই ’৬২-র এশিয়ার গেমসে এদের অন্তর্ভুক্তিতে সম্মতি ছিল না সুকর্ণ সরকারের।
ওই সময় থেকেই ধীরে ধীরে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে ইন্দোনেশিয়া। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তাদের জন্য হাতিয়ারবোঝাই রণতরী পাঠায় সুকর্ণ সরকার। পাশাপাশি, একটি বিবৃতিতে বিশ্বের উদীয়মান দেশগুলিকে পাক ফৌজের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানায় জাকার্তা। সূত্রের খবর, বঙ্গোপসাগরে ডুবোজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
’৬৫-এর যুদ্ধে অবশ্য শেষ পর্যন্ত তেমন কোনও পদক্ষেপ করেনি জাকার্তা। ১৯৬৭ সালে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ক্ষমতাচ্যুত হন সুকর্ণ। নতুন করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন তাঁর উত্তরসূরি সুহার্তো। ১৯৭৪ এবং ১৯৭৭ সালে সীমান্ত নির্ধারণে বেশ কয়েকটা চুক্তিতে সই করে দুই দেশ। ফলে আন্দামান-নিকোবরের উপর অবৈধ দাবির নীতি থেকে সরতে বাধ্য হয় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্র।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০০০ সাল আসতে আসতে চিনের ব্যাপারে মোহভঙ্গ হয় জাকার্তার। কারণ, ৮০-এর দশকের পর থেকেই বেজিঙের সঙ্গে সামুদ্রিক সীমান্ত নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বিবাদ বাড়ছিল। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে ইতিমধ্যেই ‘নাইন ড্যাশ’ লাইন নামের একটি কাল্পনিক রেখা তৈরি করেছে ড্রাগন। ইন্দোনেশিয়ার নাতুনা দ্বীপপুঞ্জ এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে সেটা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে ২০০৫ সালের নয়াদিল্লি সফরে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি গড়ে তোলেন জাকার্তার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুসিলো বামবাং ইয়ুধোয়োনো। ২০১১ সালের সাধারণ দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হয়ে ফের এ দেশে আসেন তিনি। গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) একই আমন্ত্রণ পান প্রাবোও সুবিয়ান্তো, কূটনৈতিক দিক থেকে যাকে নয়াদিল্লির ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারির কুচকাওয়াজের প্রধান অতিথি থাকাকালীন বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন সুবিয়ান্তো। তিনি বলেন, ‘‘কিছু দিন আগে আমি জিনোম সিকোয়েন্সিং পরীক্ষা করিয়েছি। সেই রিপোর্ট থেকে জানতে পারি আমার শরীরে ভারতীয় ডিএনএ রয়েছে। এ দেশের সভ্যতা ও গণতন্ত্রের দ্বারা ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি প্রবল ভাবে প্রভাবিত। তাই যখনই ভারতীয় সঙ্গীত শুনি, তখনই আনন্দে আমার শরীর নেচে ওঠে।’’
অতীতে ভারতসফরে এলেই পাকিস্তান হয়ে দেশে ফিরতেন ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব। গত বছর তাতে ছেদ টানেন সুবিয়ান্তো। ২০২৫ সালের মে মাসে ইসলামাবাদের মদতে হওয়া পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার খবর প্রকাশ্যে আসতেই তার কড়া নিন্দা করে বিবৃতি দেয় জাকার্তা। পরে ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামের সামরিক অভিযান চালায় এ দেশের ফৌজ। তখনও মুখে কুলুপ এঁটে ছিল বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনবহুল দ্বীপরাষ্ট্র।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাক বিমানবাহিনীর ১১টি ঘাঁটি ধ্বংস করে ভারতীয় সেনা। সূত্রের খবর, ওই হামলার সময় রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগ করে নয়াদিল্লি। তাকে আটকাতে পারেনি ইসলামাবাদের হাতে থাকা চিনের এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। এর পরই সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, কৌশলগত দিক থেকে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বে লাভবান হচ্ছে ভারত। সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে একটি সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক জলপথ। এর নাম মলাক্কা প্রণালী। এই রাস্তা দিয়েই পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি ঘরের মাটিতে আমদানি করে থাকে চিন। সংঘাত পরিস্থিতিতে সেটা বন্ধ হলে তাসের ঘরের মতো ভাঙতে পারে বেজিঙের অর্থনীতি। আর তাই জাকার্তাকে পাশে পাওয়া নয়াদিল্লির জন্য জরুরি।