ধ্বংসের মুখে ডিজ়নির আদলে তৈরি শত শত দুর্গ! পরিত্যক্ত ‘ভূতুড়ে’ গ্রামের মর্মান্তিক পরিণতির নেপথ্যে কোন রহস্য?
উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজ়নির ধাঁচে তৈরি হয়েছিল শত শত প্রাসাদ। ২০ কোটি ডলার খরচ করে ৫০০টিরও বেশি এমন প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। আজ পুরো জায়গাটি একটি ‘ভূতুড়ে’ গ্রামে পরিণত হয়েছে। তার বিভীষিকাময় ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
কথিত আছে, রহস্যজনক ভাবে রাতারাতি এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বাসিন্দারা। আসলে বাস্তবে ওই এলাকার দুর্গ বা প্রাসাদগুলি কখনওই সম্পূর্ণ বসবাসযোগ্য ছিল না। অনেক ভিলার বাইরের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও বিপুলসংখ্যক বাড়ির ভিতরের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। বাড়িতে বিভিন্ন সুযোগসুবিধা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব ছিল। বসবাসের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ। সেই থেকে খালিই পড়ে ছিল প্রাসাদসদৃশ বাড়িগুলি। ধীরে ধীরে এলাকাটি একটি ভূতুড়ে গ্রামের রূপ নেয়। তবে এখন সমাজমাধ্যমের সুবাদে তা বিশ্ব জুড়ে ট্র্যাভেল ভ্লগার এবং ভূতুড়ে জায়গায় ঘুরতে ভালবাসেন, এমন মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজ়নির আদলে তৈরি শত শত প্রাসাদ এখানে খালি পড়ে রয়েছে। নির্মাতারা যখন এই জরাজীর্ণ এলাকাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, তখন এর বিভীষিকাময় ছবিগুলি ছড়িয়ে পড়ে নেটমাধ্যমে। আর তা দেখলে দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রকল্পটির নির্মাণকারী সংস্থা সারোট গ্রুপ ২০ কোটি ডলারের বাজেট থেকে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সেটি শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়। ২০১৯ সালে দেউলিয়া সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করেছিল তারা।
এই অঞ্চলটি নিয়ে আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে। শোনা যায়, নির্মাণকারীরা দাবি করেছিলেন, রোগ নিরাময়ের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে ওই এলাকার জলের। তার ভিত্তিতে তাঁরা প্রতিটি বাড়ি গরম রাখার জন্য অঞ্চলের উষ্ণ প্রস্রবণগুলি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সারোট গ্রুপের সিইও মেজ়ের ইয়েরদেলেন ২০১৯ সালে সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এই জল পান করলে পেটের রোগ এবং কিডনির পাথর সেরে যায়। এতে স্নান করলে ত্বকের সমস্যা, বাত এবং স্লিপ ডিস্কও নিরাময় হতে পারে।”
কথা হচ্ছে তুরস্কের ‘বুর্জ আল বাবাস’ প্রকল্প নিয়ে। তুরস্কে অবস্থিত এই পরিত্যক্ত গ্রামে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০১৪ সালে প্রথম শুরু হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে এটি বিদেশি ক্রেতাদের জন্য একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তুরস্কের উত্তর-পশ্চিম পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই গ্রামটিকে ক্ষুদ্রাকৃতি ভিলার একটি ডায়োরামার (অর্থাৎ, ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ বা কোনও বাস্তব ঘটনার ক্ষুদ্রাকৃতির ত্রিমাত্রিক দৃশ্যপট) মতো দেখায়।
আরও পড়ুন:
তুরস্কের মুদুরনু শহরের কাছের পাহাড়গুলি থেকে দেখা যায়, ডিজ়নির ধাঁচের সারি সারি একই রকম প্রাসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা তুলে। কোনও বাস্তব আবাসন প্রকল্পের চেয়ে কল্পজগতের সিনেমার সেট বলে ভুল হতে পারে। বুর্জ আল বাবাস নামের এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি ধনী আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের, বিশেষত পশ্চিম এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য একটি বিলাসবহুল প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রায় ৫৮৭টি প্রাসাদের মতো ভিলা (ফরাসি ভাষায় যাকে ‘শ্যাঁতো’ বলে) আংশিক ভাবে নির্মিত হয়েছিল। সেগুলি ছিল এমন একটি প্রকল্পের অংশ যেখানে ৭০০টিরও বেশি বাড়ি এবং উচ্চ মানের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা ছিল।
প্রায় ২০ কোটি ডলার মূল্যের এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, এর নির্মাতা সংস্থা সারোট গ্রুপ তীব্র আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। এর ফলস্বরূপ এটি বিশ্বের অন্যতম পরিত্যক্ত আবাসন প্রকল্পে পরিণত হয়।
এই বাড়িগুলি দেখতে সব একই রকম। প্রতিটির নীলচে ধূসর চূড়া আর তাতে গথিক স্থাপত্যশৈলীর আসবাব, যা ডিজ়নির চলচ্চিত্র এবং থিম পার্কের দুর্গগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তুরস্কের এক বিধ্বংসী অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে একসময়ের সেই বিশাল পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। ফলে ছোট ছোট সারিবদ্ধ প্রাসাদগুলি সব ফাঁকা হয়ে যায়। এখন এগুলিই বিশ্বের ‘সবচেয়ে ভূতুড়ে’ পরিত্যক্ত বাসস্থানগুলির তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
জানা যায়, তিনটি ভিন্ন নকশা থেকে ভিলা বেছে নেওয়ার সুযোগও থাকত ক্রেতাদের। ভিলাগুলি এমন ভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি তলায় একটি করে জাকুজ়ি থাকে। বাসিন্দাদের জন্য লিফ্ট ও ইনডোর পুল বসানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। সারোট গ্রুপের সিইও মেজ়ের ইয়েরদেলেন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ৩৫০টিরও বেশি বাড়ি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সেগুলির দাম অবস্থানভেদে ৩ লক্ষ ৭০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ ডলারের মধ্যে।
আরও পড়ুন:
খবর, ২০১৮ সালে অর্ধেকের বেশি নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুরস্কের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কার জেরে অনেক ক্রেতাই চুক্তি বাতিল করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতির হার ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা তার আগের ১৫ বছরে সর্বোচ্চ বলে জানা যায়। এর নেপথ্যে মূলত দেশটির মুদ্রা লিরার পতনের প্রভাবই ছিল বেশি। সেই পরিস্থিতিতে মেজ়ের বলেছিলেন, “আমাদের বিক্রি একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিছু গ্রাহক তাঁদের চুক্তি বাতিল করেছেন। কেউ কেউ অর্থের লেনদেনও বন্ধ করে দিয়েছেন।”
আজও সেই গ্রামটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এখানে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো বা মানুষের বসবাসের কোনও চিহ্নই নেই। শোনা যায়, পরিত্যক্ত দুর্গের মেঝেয় কিছু নির্মাণশ্রমিকের জুতো, মোজা এবং নির্মাণের সরঞ্জামও পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঠিক যেন মাঝপথে কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছেন তাঁরা।
এই অসমাপ্ত প্রকল্পটিকে আবাসন ব্যবসার ঝুঁকির এক প্রকট স্মারক হিসেবেও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের দাবি, মুখ থুবড়ে পড়া এই প্রকল্প দেখিয়ে দেয় কী ভাবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তনশীল বাজার পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলিও ব্যর্থ হতে পারে। নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই খালি ভিলাগুলি একটি ভৌতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তা সারা বিশ্বের চিত্রগ্রাহক এবং শহুরে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।
তুর্কি সংস্থা সারোট গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ২০১৪ সালে বুর্জ আল বাবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সংস্থাটি ইউরোপীয় ধাঁচের ৭৩২টি ভিলা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল, যার প্রতিটিতে ফরাসি ‘শ্যাঁতো’র মতো অলঙ্কৃত মিনার, বারান্দা এবং আলঙ্কারিক সম্মুখভাগ থাকার কথা ছিল। বাড়িগুলিকে মূলত উপসাগরীয় দেশগুলির বিত্তশালী ক্রেতাদের অবকাশযাপনের আবাস হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। এই বিরাট পরিকল্পনায় বাজার, রেস্তরাঁ, তুর্কি স্নানাগার, স্পা, খেলাধুলোর ব্যবস্থা এবং বিনোদনকেন্দ্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল। লক্ষ্য ছিল, একে শুধু একটি আবাসন প্রকল্প না বানিয়ে একটি বিশেষ বিলাসবহুল কমিউনিটি হিসেবে গড়ে তোলা।
প্রকল্পটির স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী এমন ভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে এটি আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল আবাসন বাজারে স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভ করে। নির্মাতাদের বিশ্বাস ছিল, ইউরোপীয় দুর্গের দ্বারা অনুপ্রাণিত বাহ্যিক নকশার সঙ্গে আধুনিক অভ্যন্তরীণ গৃহসজ্জা এবং রিসর্ট-ধাঁচের সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে তৈরি বাড়িগুলি ধনী বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করবে। ইস্তানবুল থেকে গাড়িতেই যাতায়াত করা যায় এমন দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত এবং বন ও পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায়, তুরস্কের জনবহুল উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির তুলনায় এটি একটি শান্ত বিকল্প হয়ে উঠবে, এমনটাই বলা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি অবকাশযাপনের স্থান তৈরি করা, যা বিলাসবহুল জীবনযাপনকে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রায় ৩৫০টি ভিলা বিক্রি হয়ে যায়। তবুও প্রকল্পটি অতিদ্রুত মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। তুরস্কের অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রার অস্থিতিশীলতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় নির্মাতাসংস্থার উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। সারোট গ্রুপের বিপুল ঋণের বোঝাও বাড়তে থাকে এবং নির্মাণের খরচও বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং সংস্থাটি দেউলিয়া সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করে। এর ফলে আংশিক ভাবে নির্মিত শত শত ভিলা ক্রেতাহীন বাসিন্দাহীন হয়ে পড়ে থাকে।
এখন সেখানে গেলে পর্যটকেরা সেই ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত সাদা প্রাসাদের দীর্ঘ সারি দেখতে পাবেন। অনেক ভবনের অন্দরসজ্জা এখনও অসম্পূর্ণ। নির্মাণসামগ্রী খোলা অবস্থায় এবং ঘরগুলি সব খালি পড়ে রয়েছে। সেগুলির কাজ আর কখনও হয়নি। ভিলাগুলির মাঝখান দিয়ে রাস্তা ও পায়ে চলার পথ চলে গিয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিত শপিং সেন্টার, স্পা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
দেউলিয়া ঘোষণার কার্যক্রমের পর নির্মাতা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরা আশা করেছিলেন, একটি আর্থিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার অধীনে প্রকল্পের কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করা যেতে পারে। যদিও এই উন্নয়ন প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আলোচনা হলেও বুর্জ আল বাবাসের বিশাল অংশ এখনও অসম্পূর্ণ এবং জনশূন্যই রয়ে গিয়েছে। এই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হবে, পুনর্নির্মিত হবে না কি একটি উচ্চাভিলাষী আবাসন প্রকল্পের ব্যর্থতার স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
বুর্জ আল বাবাস নেটমাধ্যমের অন্যতম পরিচিত পরিত্যক্ত নিদর্শন হয়ে উঠেছে। কারণ এটি জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্যের সঙ্গেই একটি ব্যর্থ বিনিয়োগের গল্পকে জুড়ে দিয়েছে। জনমানবহীন শত শত অভিন্ন প্রাসাদসদৃশ ভিলার দাঁড়িয়ে থাকার ছবি সমাজমাধ্যমে অগণিত ভ্রমণকাহিনি, তথ্যচিত্র এবং পোস্টের জন্ম দিয়েছে। এর আকর্ষণীয় রূপের বাইরেও, এই প্রকল্পটি মনে করিয়ে দেয়, কী ভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন প্রকল্পগুলিকেও ভূতুড়ে এলাকায় রূপান্তরিত করতে পারে।