তেলের কুয়োয় বসেও পেট্রল সঙ্কটে নাভিশ্বাস দশা! যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের ‘পাশে’ থেকে লাভের গুড় খাবে ভারত?
যুদ্ধের মধ্যেই এ বার মারাত্মক জ্বালানি সঙ্কটের মুখে পড়েছে ইরান। পেট্রল-ডিজ়েল সঙ্কটে নাজেহাল দশা হচ্ছে তাদের। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের শরণাপন্ন হবে তেহরান?
ইরান যুদ্ধে সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর! ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনে ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকাকে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে জবাব দিচ্ছে তেহরান। যদিও লড়াইয়ের মধ্যেই পেট্রল-ডিজ়েলের জন্য সাবেক পারস্যে পড়ে গিয়েছে হাহাকার! খনিজ তেলের বিরাট ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও কেন জ্বালানি সঙ্কটের মুখোমুখি এই উপসাগরীয় শিয়া মুলুক? এর কতটা প্রভাব পড়বে ভারতে? ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সম্প্রতি, ইরানের গ্যাসলিন তথা পেট্রল সঙ্কট নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স-সহ বহু পশ্চিমি গণমাধ্যম। তেহরানের পদস্থ কর্তাদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, সাবেক পারস্যের কাছে আর মাত্র দু’মাসের জ্বালানি রয়েছে। যার জেরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পেতে শুরু করেছে সেখানকার আমজনতা। পেট্রল পাম্পগুলির লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে তাঁদের।
উল্লেখ্য, বিশ্বের খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশগুলির মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইরান। সাবেক পারস্যের মাটির নীচে লুকিয়ে আছে দুনিয়ার ১২ শতাংশ তরল সোনা। ভূতাত্ত্বিকদের অনুমান, যেটা প্রায় ২০,৮৬০ কোটি ব্যারেল। অপরিশোধিত তেলের এ-হেন বিপুল ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও কেন যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি সঙ্কটের কুয়োয় পড়তে চলেছে তেহরান? এর নেপথ্যে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
প্রথমত, খনিজ তেলের কোনও দাহ্য ক্ষমতা নেই। মাটি থেকে উত্তোলনের পর একে পাঠানো হয় শোধনাগারে। সেখানেই গ্যাসোলিন অর্থাৎ পেট্রল, ডিজ়েল বা জেট ফুয়েলে বদলে গিয়ে নতুন আকার নেয় তরল সোনা। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে চলা যুদ্ধে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই ইরানি পরিকাঠামো। ফলে, জ্বালানি ভান্ডারের উপরে বসেও ব্যবহার উপযোগী করতে পারছে না তেহরান।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন ও ইজ়রায়েলি আগ্রাসন রুখতে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করেছে ইরানি আধাসেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। অন্য দিকে, ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের দিকে থেকে একটি শক্তিশালী নৌঅবরোধ গড়ে তুলেছে আমেরিকা। ফলে, বিদেশ থেকে পেট্রল-ডিজ়েল আমদানি করাও তেহরানের পক্ষে যথেষ্টই কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘গ্রাউন্ড জিরো’য় দেখা যাচ্ছে যার প্রভাব।
আরও পড়ুন:
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সরবরাহকারী সংস্থাকে উদ্ধৃত করে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আনে রয়টার্স। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অগস্টে সাবেক পারস্যের দৈনিক গ্যাসলিনের চাহিদা ১৪.৫০ কোটি লিটারে গিয়ে পৌঁছয়। যেটা এখনও পর্যন্ত রেকর্ড। কিন্তু, ওই সময় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছিল ১২.২০ কোটি লিটারে। অর্থাৎ ২.৩০ কোটি লিটারে ঘোরাফেরা করেছে দৈনিক ঘাটতির অঙ্ক।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত তেল শোধনাগারগুলির পুনরুজ্জীবনও ইরানের পক্ষে মোটেই সহজ নয়। কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে তেহরানের অর্থনীতি এক রকম ভেঙে গিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। উদাহরণ হিসাবে, সেখানকার মুদ্রা রিয়ালের কথা বলা যেতে পারে। গত বছরই (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ডলারের সাপেক্ষে নামতে নামতে যার মূল্য দাঁড়ায় ১০ লক্ষে। বর্তমানে সেটাই দাঁড়িয়ে আছে ২২ লক্ষ রিয়ালে।
এ ভাবে ডলারের নিরিখে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হওয়ার জেরে দ্রুতগতিতে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ইরানের মুদ্রাস্ফীতির হার। ফলে, আমজনতার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ফাঁকি দিতে এতদিন চোরাপথে খনিজ তেলে বিক্রি করছিল তেহরান। ডলারের নিরিখে রিয়ালের দাম পুরোপুরি খাদে চলে যাওয়ায় সেটার খরচ চালাতেও রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
ইরানি সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়তে বাড়তে ৭০ শতাংশকে ছুঁয়ে ফেলেছে। ফলে, গত এক বছরে ১৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে খাদ্যদ্রব্যের দাম। শুধু তা-ই নয়, সয়া ও উদ্ভিজ্জ তেল প্রায় ৩৮৩ শতাংশ, ডিম প্রায় ২৯৪ শতাংশ, মুরগির মাংস ১৭৭ শতাংশ এবং গরু ও খাসির মাংসের দর ১৪৮ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বলা বাহুল্য, এতে নাভিশ্বাস উঠছে ইরানি জনতার।
আরও পড়ুন:
মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে দীর্ঘদিন ধরেই ‘ছায়া জলযানে’ (পড়ুন, শ্যাডো ফ্লিট) খনিজ তেল বিক্রি করে এসেছে ইরান। এর জন্য একগুচ্ছ ভুয়ো সংস্থা খুলতে হয়েছে তাদের। তা ছাড়া, পানামা বা মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের মতো অনেক দূরের কোনও রাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজে অত্যন্ত গোপনে তরল সোনা সরবরাহ করে থাকে তেহরান। এর জন্য প্রায়ই মাঝ সমুদ্রে ট্যাঙ্কার থেকে ট্যাঙ্কারে তেল অদল-বদলেও করতে হয় তাদের।
এ ভাবে ‘ছায়া জলযানে’ বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া গোটা অপারেশন চালু রাখতে প্রয়োজন হয় বিপুল অর্থের। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ডলারের নিরিখে রিয়ালের দাম পড়ে যাওয়ায় সেখানেও টান পড়েছে ইরানের। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন করার পথে হাঁটতে চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি।
প্রসঙ্গত, নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক সহযোগী হিসাবে বরাবরই ইরানের পাশে থেকেছে আবু ধাবি। কিন্তু, যুদ্ধ শুরু হতেই আরব রাষ্ট্রটির মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ফিদায়েঁ’ ড্রোনের মাধ্যমে নিশানা করে আইআরজিসি। পাশাপাশি, আমিরশাহির তেল শোধনাগার, বিলাসবহুল হোটেল, বিমানবন্দর এবং কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডারের (এআই ডেটা সেন্টার) মতো কৌশলগত পরিকাঠামোতেও হামলা চালায় তারা।
ইরানি আইআরজিসির লাগাতার হামলার জেরে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আবু ধাবির অর্থনীতি। হরমুজ় অবরুদ্ধ থাকায় এমনিতেও খনিজ তেল বিক্রিতে সমস্যা হচ্ছে তাদের। এই নিয়ে তেহরানকে বার বার হুঁশিয়ারি দিয়েও কোনও লাভ হয়নি। আর তাই অগস্টের শেষ সপ্তাহে সাবেক পারস্যের সঙ্গে যাবতীয় আর্থিক লেনদেন বন্ধ করেছে তারা। এতে আন্তর্জাতিক ভাবে একরকম নিঃসঙ্গই হয়ে পড়েছে ওই উপসাগরীয় শিয়া মুলুক।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমানে দু’টি ফ্রন্টে লড়ছে ইরান। একটিতে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি তাদের সামনে রয়েছে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের মতো ‘সুপার পাওয়ার’। দ্বিতীয়টি হল, আর্থিক সংঘাত। কোনও মতে টিঁকে আছে তাদের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী দিনে ক্ষেপণাস্ত্র ওড়ানোর জ্বালানিও ফুরিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আর তাই সেদিকে অবিলম্বে নজর না দিলে আইআরজিসির পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরানের হাতে বেশ কয়েকটা তুরুপের তাসও রয়েছে। ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীভুক্ত পারস্য উপসাগরের দেশটির সঙ্গে ভারত, রাশিয়া, চিন, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলির সম্পর্ক বেশ মধুর। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে বর্তমানে বিশ্ব বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানির দর। ফলে সস্তায় খনিজ তেল বিক্রির টোপ দিয়ে এদেরকে দলে টানার সুযোগ পেতে পারে তেহরান।
দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের বদলে স্থানীয় মুদ্রায় নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ব্রিকস গোষ্ঠী। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১১-য় পৌঁছে গিয়েছে। বিশ্ব বাজারে খনিজ তেলের বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধির জেরে জ্বালানি কিনতে বাড়তি খরচ হবে তাদের। ফলে মুদ্রাস্ফীতি এড়াতে তেহরানের ‘মেগা অফার’ লুফে নেওয়া তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব নয়।
উদাহরণ হিসাবে, চিনের কথা বলা যেতে পারে। ২০২১ সালে ১০ বছরের জন্য ইরানের সঙ্গে কৌশলগত জ্বালানি চুক্তিতে সই করে বেজিং। তার পর থেকে স্থানীয় মুদ্রা ‘রেনমিনবি’তে তেহরানের খনিজ তেল লাগাতার কিনছে ড্রাগন। যার একক হল ইউয়ান। এবার ভারত-সহ অন্যান্য ব্রিকস সদস্যদেরও সেই রাস্তায় হাঁটতে দেখা যেতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
১২ সেপ্টেম্বর, শনিবার থেকে নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ১৮ তম ব্রিকসের সম্মেলন। তাতে যোগ দিতে ভারত সফরে এসেছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে তাঁর। সূত্রের খবর, সেখানেও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলার দু’পক্ষের মধ্যে চলেছে ইতিবাচক আলোচনা।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ় অবরোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বাব এল-মান্দেব প্রণালীর উপরেও বকলমে নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গিয়েছে ইরান। সম্প্রতি, ইয়েমেনের মোকা বন্দর দখল করে তেহরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। ফলে, নিষেধাজ্ঞার উল্টো প্রভাব দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর। যার জেরে আমেরিকার ঘরোয়া বাজারে বাড়ছে তেলের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের জেরে গত ছ’মাসে ১০,০০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচ করে ফেলেছে আমেরিকা। তা ছাড়া, এই অঙ্ক প্রতি দু’মিনিটে ১০ কোটি ডলার করে বাড়ছে। ফলে আর্থিক লড়াইতে শেষ পর্যন্ত কে জেতে সেটাই এখন দেখার।