দরজা খুলে বঙ্গোপসাগরে চিনকে ‘মেগা এন্ট্রি’! খাল কেটে কুমির আনছে তারেকের বাংলাদেশ? কেন দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ?
বেজিংসফরে চিনের থেকে মায়ানমারের মধ্যে দিয়ে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর পর্যন্ত আর্থিক বারান্দা তৈরির প্রস্তাব পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা এতে সিলমোহর দিলে ড্রাগনের জন্য খুলতে পারে বঙ্গোপসাগরের রাস্তা, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত।
চিনসফর সেরে দেশে ফিরে ‘উভয়সঙ্কটে’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ড্রাগনভূমি থেকে মায়ানমারের বুক চিরে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব পেয়েছেন তিনি। এই প্রস্তাব ঢাকার জন্য ‘শাঁখের করাত’ হতে পারে বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা! আর তাই পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লিও।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন তারেক। কুর্সিতে বসার চার মাসের মাথায় বেজিংসফর করেন তিনি। সেখানে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠক হয় তাঁর। তারেক দেশে ফেরার পর জানা যায় নতুন একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব ঢাকাকে দিয়েছে ড্রাগন সরকার। এর ফলে নাকি চিরতরে মিটতে পারে রোহিঙ্গা সমস্যা। তবে অন্য দিক থেকে প্রকল্পটি যথেষ্ট বিপজ্জনক।
ঢাকা-বেজিং প্রস্তাবিত প্রকল্পের পোশাকি নাম চিন-মায়ানমার-বাংলাদেশ আর্থিক বারান্দা বা সিএমবিসি (চায়না-মায়ানমার-বাংলাদেশ-ইকোনমিক করিডর)। এর সূচনা হবে ড্রাগনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে। প্রথম ওই রাস্তা যাবে মায়ানমারের মান্দালয় পর্যন্ত। পরে সেখান থেকে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে এগোবে সিএমবিসি। এর একটি শাখা শেষ হবে ইয়াঙ্গনে। অন্যটির রাখাইন রাজ্যের মধ্যে দিয়ে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের দিকে যাওয়ার কথা রয়েছে।
এই অংশটিকেই বাংলাদেশের মধ্যে প্রসারিত করতে চাইছে চিন। প্রস্তাবিত সিএমবিসি অনুযায়ী, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত হবে ওই রাস্তা। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেখানকার মংলা বন্দর পর্যন্ত সরাসরি সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হবে বেজিং। এতে বঙ্গোপসাগরের দরজা যে ড্রাগনের জন্য খুলে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের জুনে তারেকের বেজিংসফরের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দেয় চিনা বিদেশ মন্ত্রক। সেখানে বলা হয়, ‘গ্রেট হল অফ দ্য পিপল’-এ এই ইস্যুতে বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট শি। ‘বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগের’ রাস্তা হিসাবে প্রস্তাবিত আর্থিক বারান্দাটি কাজ করবে। পরে এ ব্যাপারে মুখ খোলেন ঢাকায় নিযুক্ত ড্রাগনভূমির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
আরও পড়ুন:
গত ২ জুলাই ওয়েন বলেন, ‘‘প্রায় ১৫ বছর আগে আমরা চিন-মায়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত আর্থিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। প্রাথমিক পর্যায়ে এই নিয়ে কথাবার্তাও কিছুটা এগিয়েছিল। কিন্তু, তাতে তেমন কোনও সাফল্য পাওয়া যায়নি। এখন দিল্লিকে বাদ দিয়ে নতুন করে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তারা যদি নতুন করে এই প্রকল্পে যুক্ত হতে চায়, তাতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই।’’
পর্যবেক্ষক মহলের দাবি, সংশ্লিষ্ট করিডর তৈরির নেপথ্যে চিনের দ্বিমুখী উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, বেজিঙের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশই মলাক্কা প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। সরু ওই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে ৮০ শতাংশ খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে থাকে ড্রাগন। পাশাপাশি, নিজেদের তৈরি সিংহভাগ পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে মলাক্কা প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে জিনপিঙের পণ্যবাহী জাহাজ।
আর তাই কৌশলগত দিক থেকে সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রাস্তাটি চিনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের থেকে মলাক্কা প্রণালীর দূরত্ব মেরেকেটে ৬০০ কিলোমিটার। ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরের মধ্যবর্তী সরু এই জলপথটির উত্তরে আছে মালয় উপদ্বীপ আর দক্ষিণে সাবেক সুমাত্রা (বর্তমান নাম ইন্দোনেশিয়া)। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেটা বন্ধ হলে তাসের ঘরের মতো ভাঙতে পারে ড্রাগনের অর্থনীতি, বলছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
আর তাই দীর্ঘ দিন ধরে দক্ষিণ চিন সাগরে নিরঙ্কুশ আধিপত্য চাইছে চিন। সেটা করতে গিয়ে ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলির সঙ্গে সামুদ্রিক সীমান্ত বিবাদে জড়িয়েছে বেজিং। ফলে ধীরে ধীরে ভারতের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে তারা। ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির সঙ্গে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের চুক্তি করতে দেখা গিয়েছে জাকার্তাকে। ড্রাগনের আধিপত্য ঠেকাতেই যে এই সিদ্ধান্ত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন:
২০০৩-’১৩ সাল পর্যন্ত চিনা প্রেসিডেন্ট ছিলেন হু জিনতাও। ক্ষমতায় থাকাকালীন মলাক্কা নির্ভরশীলতার বিপদ বুঝতে তাঁর বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি। তাই বিকল্প রাস্তা হিসাবে মায়ানমার ও বাংলাদেশকে ব্যবহারের নীলনকশা ছকে ফেলেন তিনি। যদিও সেটার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমে পূর্বসূরির স্বপ্নপূরণের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আজকের প্রেসিডেন্ট শি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আগামী দিনে বাংলাদেশে দু’টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এক্সক্লিউসিভ ইকোনমিক জ়োন বা ইইজ়েড) গড়ে তুলবে চিন। ৮০০ একর জমির উপর এর প্রথমটি তৈরি হবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়। দ্বিতীয়টির জন্য মংলা বন্দর সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১১০ একর জমি পেতে চলেছে বেজিং। মায়ানমারের মধ্যে দিয়ে প্রস্তাবিত আর্থিক বারান্দাটি যে সেখানে পণ্য আনা-নেওয়ায় বাড়তি সুবিধা দেবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
অন্য দিকে, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশ। মায়ানমার থেকে আসা এই মুসলিম জনজাতিকে ঘরের মাটিতে রাখতে চায় না ঢাকা। কিন্তু, কোনও অবস্থাতেই তাঁদের ফেরত নিতে নারাজ সাবেক বর্মা মুলুক। বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রস্তাবিত আর্থিক করিডরে ‘হ্যাঁ’ বলে এই সমস্যা চিরতরে মেটানোর রাস্তায় পা ফেলতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক। কারণ, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার শর্তেই এই প্রকল্পে রাজি হবেন তিনি।
কিন্তু, সিএমবিসিতে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া ঢাকার জন্য কম চ্যালেঞ্জের নয়। প্রথমত, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্যে দিয়ে হওয়ার কথা রয়েছে। গৃহযুদ্ধের কারণে যে এলাকার উপর প্রায় কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই সেখানকার সামরিক সরকারের। বর্তমানে রাজ্য রয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে। আর্থিক করিডরের প্রস্তাব তাঁরা মেনে না নিলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
সম্প্রতি, উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির পণ্য পরিবহণ বাড়াতে রাখাইন রাজ্যের সিট্টাওয়ে বন্দর পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের কাজ চালাচ্ছে ভারত। এর পোশাকি নাম ‘কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজ়িট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে কলকাতা বা হলদিয়া বন্দর থেকে সিট্টাওয়ে বন্দর হয়ে কালাদান নদী পেরিয়ে সড়কপথে মিজোরাম পর্যন্ত বিভিন্ন সামগ্রী আনা নেওয়া করবে দিল্লি। এতে অবশ্য কোনও আপত্তি জানায়নি আরাকান আর্মি।
সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, মায়ানমারের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে দু’নৌকায় পা দিয়ে চলা কঠিন। চিনের আর্থিক প্রকল্প মেনে নিলে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে তারা। সে ক্ষেত্রে সাবেক বর্মা মুলুককে ঢেলে সামরিক সহায়তা দিতে পারে বেজিং। তখন রাখাইন রাজ্যের উপর দখল না-ও থাকতে পারে তাদের। তা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার জটিলতা বৃদ্ধির ব্যাপারেও যথেষ্ট আপত্তি আছে আরাকান আর্মির।
এ বছর মায়ানমার সম্পর্কে একটি বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ। সেখানে বলা হয়েছে, বর্তমানে সাবেক বর্মা মুলুকের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানকার সামরিক সরকার। অন্য দিকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি দেশটির ৪২ শতাংশ ভূমি কব্জা করে ফেলেছে। সেখানে নিজেদের মতো শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে তারা। ফলে উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবায়ন বেশ কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রস্তাবিত প্রকল্পে দ্বিতীয় বাধার নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় চিনা প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে আপত্তি আছে আমেরিকার। আর তাই বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন প্রবালদ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন। ঢাকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দাবি, এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আবেদন ফিরিয়ে দেন তিনি। ফলে ২০২৪ সালের গণ আন্দোলনে কুর্সি হারাতে হয় তাঁকে।
এ দিকে আবার চরম আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে বাংলাদেশ। ফলে কুর্সিতে বসেই আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডারের (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) থেকে ৪০০-৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক। এই প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। আর্থিক বারান্দা প্রকল্পে চিনকে ডাকলে ওই অর্থ ঢাকা আদৌ পাবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
দিল্লির কর্তাব্যক্তিদের দাবি, প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন কৌশলগত এলাকাগুলির উপর নজরদারি করতে চাইছে চিন। এর মধ্যে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বা বিশাখাপত্তনমের মতো নৌঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে সিলমোহর দিলে বেজিঙের বিআরআই-এর অন্তর্ভুক্ত হবে ঢাকা। অতীতে ড্রাগনের এই ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ফাঁদে পা দিয়ে দেউলিয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, ‘‘সিএমবিসির প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সরকার কোনও অবস্থান নেয়নি।’’ আর্থিক বারান্দাটি মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্যে দিয়ে হওয়ার পরিকল্পনা থাকায় সেখানে দ্রুত শান্তি-শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।