প্রতিশোধ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুনের ছক ইরানের, ইহুদি তৎপরতায় বিমান পাল্টে প্রাণে বাঁচলেন ট্রাম্প?
ইরানের ‘হিটলিস্টে’র তালিকায় প্রথমেই রয়েছে তাঁর নাম। এ কথা স্বীকার করে নিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসি়ডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রাণ বাঁচাতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে ইজ়রায়েল? তুঙ্গে জল্পনা।
তাঁকে খতম করতে উঠেপড়ে লেগেছে ইরান। আর তাই তেহরানের ‘হিটলিস্টে’র পয়লা নম্বরে জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম! গোয়েন্দা সূত্রে সেই খবর মিলতেই ‘সুপার পাওয়ার’ প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে পশ্চিম এশিয়ার ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্র, না কি নিজেদের স্বার্থপূরণে ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে তাঁরা? পারস্য উপসাগরের তীরে যুদ্ধের মধ্যেই এই প্রশ্নে সরগরম আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মহল।
তিনি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি, তুরস্কসফর চলাকালীন তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান যুক্তরাষ্ট্রের দুঁদে গোয়েন্দাদের একাংশ। সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলা হয় তাঁর বিমান। শুধু তা-ই নয়, ট্র্যাকার বন্ধ রেখে ব্রিটেনে পাড়ি দেয় সেই উড়োজাহাজ। আমেরিকার জনপ্রিয় গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, ট্রাম্পকে খুনের চক্রান্তের খবর ওয়াশিংটনের গোয়েন্দাদের কাছে হস্তান্তর করে ইজ়রায়েল।
ইহুদি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্টের ‘প্রাণরক্ষা’র তত্ত্বে অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে সিলমোহর দেয়নি ওয়াশিংটন। তার পরেও ট্রাম্পের তুরস্কসফরকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়েছে রহস্য। চলতি বছরের ৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) বৈঠকে যোগ দিতে আঙ্কারা পৌঁছোন তিনি। পরের দিন সেখান থেকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি দেয় তাঁর বিমান।
বিদেশসফরে ব্যবহৃত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমানের সাঙ্কেতিক নাম ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। গত বছর (২০২৫ সাল) ট্রাম্পকে ৪০ কোটি ডলারের একটি বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ উপহার দেয় কাতার। দেশে ফিরে সেটিকেও ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর বহরে যুক্ত করেন তিনি। ফলে কোটি কোটি ডলার খরচ করে রাতারাতি ওই উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ঢেলে সাজাতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছর (২০২৫ সাল) থেকেই অধিকাংশ বিদেশসফরে কাতারের উপহার দেওয়া বিমানটি ব্যবহার করছেন ট্রাম্প। ৭ জুলাই লাল, সাদা এবং নেভি ব্লু রঙের সেই উড়োজাহাজে চড়েই তুরস্ক যান তিনি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, সেখানে পৌঁছোনোর পর ইজ়রায়েল থেকে তাঁকে খুনের চক্রান্ত সংক্রান্ত সতর্কবার্তা পান মার্কিন গোয়েন্দাবাহিনী। ফলে দ্রুত বদলে ফেলা হয় বিমান। পরিবর্তন আসে রুটেও।
আরও পড়ুন:
আর এক মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ আবার জানিয়েছে, ইহুদিদের সতর্কবার্তা পেয়ে কাতারের থেকে উপহার পাওয়া বিমানটিকে ব্রিটেনের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠায় ট্রাম্পের নিরাপত্তাবাহিনী। পাশাপাশি, ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর হালকা নীল রঙের পুরনো উড়োজাহাজে তোলা হয় প্রেসিডেন্টকে। সেটিতে চড়েই ইংরেজদের বায়ুসেনা ছাউনিতে পৌঁছোন তিনি। যাত্রাপথে দীর্ঘ ক্ষণ ট্র্যাকার বন্ধ রাখে ওই বিমান।
ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কথায়, আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল বিমানঘাঁটি পর্যন্ত যাত্রাপথে তাঁদের নিজ নিজ আসনের পাশের জানলা বন্ধ করার নির্দেশ দেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) বলেন, ‘‘আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক বিমানে রয়েছেন। ওরা (ইরানিরা) খুব বাজে লোক… আমাকে সব সময়ই হুমকির মুখে থাকতে হয়। ওদের তালিকায় (হিটলিস্টে) একেবারে প্রথমেই আমি রয়েছি। আমার যদি কিছু হয়, তবে আপনাদেরও সেই একই অবস্থা হবে।’’
সফরসঙ্গী সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বেশ আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন তাঁরা। কারও কারও চোখে-মুখে সেই ছাপও স্পষ্ট হয়ে উঠে। বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিবেশ কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেন, ‘‘এর পর হয়তো একদিন আপনারা পেশা বদলে ফেলতে চাইবেন।’’
ওয়াল স্ট্রিট ও ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদনগুলির উল্টো মতও রয়েছে। সিএনএন আবার জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরেই গোয়েন্দা তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তান্তর করে থাকে ইজ়রায়েল। তার মধ্যে ট্রাম্পকে খুনের চক্রান্তের বিষয়টি রয়েছে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। কারণ, নতুন করে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেহরানের উপর নজরদারি বৃদ্ধি করে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ। তাঁদের নজর এড়িয়ে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করা অসম্ভব।
আরও পড়ুন:
সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, যুদ্ধের মধ্যে প্রতিশোধ নিতে ইরান যে ট্রাম্পকে নিশানা করতে চলেছে, সেই আন্দাজ় ইতিমধ্যেই পেয়েছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ। অন্য দিকে, তেহরানের উপর নজরদারির কারণে সেটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না আমেরিকার দুঁদে গোয়েন্দাদের। ইজ়রায়েলের থেকে তথ্য হাতে আসায় বিষয়টিতে বাড়তি গুরুত্ব দেয় ওয়াশিংটন প্রশাসন। তবে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অন্ধকারে ছিল, সেটা ভাবা অনুচিত।
ইরানের লড়াই চলাকালীন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বার বার সংঘাতে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। তেল আভিভকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করতে চাইছেন তিনি। ইজ়রায়েল সরকার অবশ্য তাঁর কথা মেনে পদক্ষেপে নারাজ। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রাণ বাঁচানোর গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের খবর প্রচার করে এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু, বলছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
তেহরান সংঘাত নিয়ে আমেরিকার অন্দরে দু’টি মত রয়েছে। একাংশের অভিযোগ, ইরানকে ধ্বংস করতে জোর করে যুক্তরাষ্ট্রকে লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়েছেন নেতানিয়াহু। ফলে না চাইতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের গায়ে সেঁটে গিয়েছে ‘যুদ্ধবাজ’ তকমা। ওয়াশিংটন রণাঙ্গন ছাড়লে বিপদে পড়বে তেল আভিভ। সে ক্ষেত্রে সাবেক পারস্যের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে তাঁদের। সেটা ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক।
আর তাই ট্রাম্পের প্রাণ রক্ষার গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের তত্ত্ব ছড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি ভাবে নিজেদের পাশে চাইছেন নেতানিয়াহু। পাশাপাশি, এর মাধ্যমে ইরান-বিরোধী হাওয়া আমেরিকার ভিতরে উস্কে দেওয়ার সুযোগকে হাতছাড়া করতে নারাজ তাঁর গুপ্তচরবাহিনী। ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে সেখানে মাথাচাড়া দিয়েছে ইহুদি বিদ্বেষ। গোড়াতেই সেটা উপড়ে ফেলার ছক কষা নেতানিয়াহুর পক্ষে আশ্চর্যের নয়।
ট্রাম্প অবশ্য গোয়েন্দা তথ্যের ব্যাপারে কিছু বলেননি। নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দিকে তাক করে রাখা হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে (এ ক্ষেত্রে আমি) হত্যা বা হত্যার চেষ্টার যে হুমকি বিশ্বের নানা প্রান্তে তারা দিয়ে আসছে, তা যদি কার্যকর করা হয়, আরও হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তাদের মাটিতে আছড়ে পড়বে।’’
ইরানকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য আমেরিকার সামরিক বাহিনী আপাতত এক বছরের সময়সীমা ধরে এগোচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি, প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো হবে। এ বারের লড়াইয়ে চাবাহার বন্দরকে রেয়াত করেনি মার্কিন ফৌজ। সেখানে কয়েক কোটি ডলারের লগ্নি রয়েছে ভারতের। এ ছাড়া চিন থেকে আসা রেললাইনও উড়িয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর জেরে বেজিঙের সঙ্গে লেনদেন বজায় রাখা তেহরানের জন্য যে কঠিন হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোস্টের মুখে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান বহু দিন ধরেই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। যদি তা করা হয়, তেহরানকে কী ভাবে জবাব দিতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের আধিকারিকদের সেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তিনি। এর পর নতুন করে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ব্যাপারে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। ৯ জুলাই তাঁকে সমাধিস্থ করে তেহরান। খামেনেইয়ের শেষকৃত্যের জমায়েতে অনেকেই প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে হত্যার দাবি জানান। পোস্টার ও ব্যানারে ফুটে ওঠে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন এর পরই যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রাম্পকে হত্যার চক্রান্তের ব্যাপারে সতর্ক করে ইজ়রায়েল। পরে তা নিয়ে বিবৃতি দেয় হোয়াইট হাউস। সেখানে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে আঙ্কারায় বদল করা হয় ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর বিমান। তবে ইহুদিদের থেকে কোনও গোয়েন্দা তথ্য এসেছে কি না, সেটা জানায়নি ওয়াশিংটন।