পাক-সৌদি-তুর্কিকে এক সুতোয় বেঁধে গভীর ষড়যন্ত্র! ইজ়রায়েলকে ছুরি মারতে ‘ইসলামিক নেটো’র পালে হাওয়া আমেরিকার?
গত ৭ অগস্ট পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে দুনিয়া জুড়ে চলছে আলোচনা। কেউ কেউ একে নেটোর বর্ধিত সংস্করণ হিসাবে দেখছেন। কারও কাছে আবার এর জেরে গভীর চক্রান্তের শিকার হল ইজ়রায়েল।
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সবাইকে চমকে দিয়ে ‘ত্রিশক্তি জোট’ গড়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। পোশাকি নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট)। এর মাধ্যমে ‘ইসলামিক নেটো’র বীজ বপণ হল বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। পাশাপাশি, প্রকাশ্যে এসেছে একটি ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও। গোটা বিষয়টির ‘মূল চক্রী’ হিসাবে অনেকে চিহ্নিত করছেন আমেরিকাকে, যারা নিজেদের স্বার্থে ‘বন্ধু’ ইজ়রায়েলের পিঠে ছুরি বসাল কি না, তা নিয়েও চলছে জোর চর্চা!
চলতি বছরের ৭ অগস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করেন সৌদির যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্ডোয়ান এবং পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। এতে বলা হয়েছে, তিন দেশের কোনও একটিতে সশস্ত্র আক্রমণ হলে, সেটিকে বাকিদের উপর হামলা হিসাবে গণ্য করা হবে। এই সমঝোতা হতে না হতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেন তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির নেতা জো উইলসন। ফলে দানা বাঁধে সন্দেহ।
‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে ইতিমধ্যেই এক্স হ্যান্ডলে (আগে নাম ছিল টুইটার) একটি পোস্ট করেন মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভের সদস্য জো। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা নেবে পাক-সৌদি-তুরস্ক সামরিক সমঝোতা। নিঃসন্দেহে এটা পোটাসের (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) আর একটা বড় সাফল্য।’’ তাঁর এই মন্তব্যের পর দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল।
অন্য দিকে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়ের প্রাক্তন আধিকারিক তারা কার্থার দাবি, ‘‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ এক রাজনৈতিক নেতা।’’ আগামী দিনে এতে যোগ দিতে পারে মিশরও। সামরিক শক্তির নিরিখে বর্তমানে বিশ্বে ১৯ নম্বর স্থানে দাঁড়িয়ে আছে কায়রো। নীল নদের তীরের দেশটির কাছে রয়েছে ৪.৪ লক্ষ সক্রিয় সেনার স্থলবাহিনী, কয়েক হাজার ট্যাঙ্ক, আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান এবং নৌসেনা।
বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, পাক-সৌদি-তুর্কির সামরিক জোটে মিশর যোগ দিলে আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করবে ‘ইসলামিক নেটো’। ইরানি আক্রমণের ভয়ে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট জোটের অংশ হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলতে পারছে না কুয়েত, কাতার, ওমান বা বাহরিনের মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্র। তাই গোপনে চলছে যোগাযোগ। কারণ, ইসলামাবাদের পরমাণু হাতিয়ার, রিয়াধের অর্থ এবং আঙ্কারার অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির নিরাপত্তা ছাতা পেতে চাইছেন সকলেই।
আরও পড়ুন:
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, পশ্চিম এশিয়ায় ‘ইসলামিক নেটো’ তৈরি করতে চাওয়ার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, গত ফেব্রুয়ারি থেকে লাগাতার সামরিক অভিযান চালিয়েও ইরানকে কাবু করতে পারেনি ওয়াশিংটনের ফৌজ। উল্টে অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছে তেহরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানির দাম।
ইরান যুদ্ধের জেরে খনিজ তেলের দর বৃদ্ধির আঁচ এসে লেগেছে মার্কিন অর্থনীতির গায়েও। ঘরোয়া বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, উপসাগরীয় দেশগুলিতে ছড়িয়ে থাকা আমেরিকার সেনাঘাঁটিগুলিকে নিশানা করছে আইআরজিসি। তেহরানের সেই আক্রমণ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটনের ফৌজ। কারণ, অনায়াসেই তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাকে অকেজো করতে পারছে পারস্যের সেনা।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধাপে ধাপে আরব দুনিয়ায় নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী বছরগুলিতে সেখানকার প্রায় প্রতিটি দেশে গড়ে ওঠে আমেরিকার সেনাছাউনি। সই হয় একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। মোটের উপর যেগুলির সার কথা ছিল একটাই। সেটা হল, যে কোনও বহিরাগত আক্রমণ থেকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিকে রক্ষা করবে ওয়াশিংটন। গত ছ’মাসে ইরান যুদ্ধের জেরে সেই হিসাব যে পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
তেহরান সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে মার্কিন সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই অত্যন্ত সন্তর্পণে আরব দুনিয়ায় প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে চিন। গত কয়েক বছরে উপসাগরীয় এলাকায় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে বেজিঙের লগ্নি। শুধু তা-ই নয়, ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সই হয় এক ঐতিহাসিক চুক্তি। সেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে বড় ভূমিকা পালন করে ড্রাগন। গোড়া থেকেই বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে মার্কিন প্রশাসন, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
আরও পড়ুন:
আর তাই ‘ইসলামিক নেটো’ গঠনে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে আমেরিকা। অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের কথায়, এই সামরিক জোটকে সামনে রেখে ইরানকে ঘিরতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা সমঝোতায় আরব দুনিয়ায় পুরোপুরি শেষ হতে পারে চিনা প্রভাব। তা ছাড়া, পাক-সৌদি-তুর্কি প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার পর থেকে আক্রমণের ঝাঁজ কমিয়েছে তেহরান। ফলে যাবতীয় ফাঁকফোকর শুধরে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুবর্ণসুযোগ পাচ্ছে ওয়াশিংটনের ফৌজ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র প্রতি মিশর-সহ আরব দুনিয়ার অন্য দেশগুলির আকৃষ্ট হওয়ার নেপথ্যে অন্যতম বড় কারণ হল তুরস্ক। এশিয়া মাইনরের দেশটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) সদস্য। অর্থাৎ বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রিয়াধ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা রয়েছে ৩২টি শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছত্রছায়ায়। এর মধ্যে অন্যতম হল পরমাণু শক্তিধর ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এ ছাড়াও নেটোর সদস্যপদ আছে জার্মানি, স্পেন ও ইটালির।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পৃথিবীতে দুই মহাশক্তির মধ্যে শুরু হয় ‘ঠান্ডা লড়াই’ (কোল্ড ওয়ার)। এর এক দিকে ছিল আমেরিকা এবং অপর অংশে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ওই সময় মস্কোর আগ্রাসন ঠেকাতে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলিকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গড়ে তোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান। এরই নাম উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা নেটো। ১৯৪৯ সালে জন্মের সময় মাত্র ১২টি দেশ ছিল এর সদস্য। যদিও পরবর্তী কালে ক্রমাগত বাড়তে থাকে সেই সংখ্যা।
নেটোর সংবিধান অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর কোনও দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। ১৯৫২ সালে সংশ্লিষ্ট সামরিক সমঝোতাটির অন্তর্ভুক্ত হয় তুরস্ক। আর তাই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অনেকেই নেটোর বর্ধিত সংস্করণ হিসাবে দেখছেন। তাঁদের যুক্তি, আঙ্কারা আক্রান্ত হলে নিয়ম মেনে তাঁকে বাঁচাতে আসবে বাকি ৩১টি রাষ্ট্র। পাশাপাশি, তাতে যোগ দেবে সৌদি আরব ও পাকিস্তান।
যদিও এর উল্টো যুক্তি রয়েছে। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের উপসাগরীয় যুদ্ধ হোক বা ২০০১ সাল থেকে টানা ২০ বছর ধরে চলা আফগানিস্তান সংঘর্ষ— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে কখনওই সামরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি নেটোভুক্ত সমস্ত রাষ্ট্র। ইরান সংঘাতেও ব্রিটেন, ফ্রান্স বা ইটালির মতো দেশগুলির থেকে সাহায্য চাইতে দেখা গিয়েছে ট্রাম্পকে। যদিও পত্রপাঠ তাতে না বলে দিয়েছে তারা। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির সাফ কথা হল, তেহরানের সমস্যা আমাদের নয়।
। দ্বিতীয়ত, পাক পরমাণু অস্ত্র নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। জার্মানি ও ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের দাবি, যে কোনও মুহূর্তে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের হাতে যেতে পারে ওই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার। তাই ইসলামাবাদের হাত আণবিক অস্ত্র থাকাকে কখনওই নিরাপদ বোধ করে না তারা। তা ছাড়া, নেটোভুক্ত তুরস্কের সঙ্গে দিন দিন বাড়ছে সীমান্ত সংঘাত। দু’তরফে সামরিক অভিযান শুরু হলে সংশ্লিষ্ট জোটটির কার্যকারিতা যে প্রশ্নের মুখে পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
‘ইসলামিক নেটো’ গঠনের সবচেয়ে ক্ষতি হতে পারে ইজ়রায়েলের। পশ্চিম এশিয়ার ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব মিটিয়ে দিতে বহু বার এককাট্টা হতে দেখা গিয়েছে আরব দুনিয়াকে। ফলে জন্মের পর একাধিক বার মিশর, সিরিয়া ও জর্ডনের যৌথ আক্রমণ সামলাতে হয়েছে তেল আভিভকে। যদিও প্রতি বারই রণাঙ্গনে শত্রুদের নাস্তানাবুদ করেছে ইজ়রায়েলি ফৌজ। তার পরও আনুষ্ঠানিক ভাবে তাদের স্বীকৃতি দেয়নি রিয়াধ। অন্য দিকে একাধিক বার পরমাণু হামলার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তান।
সাবেক সেনাকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, ‘ইসলামিক নেটো’ তৈরি হলে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে ফের আগ্রাসী হতে পারে আরব দুনিয়ার একাধিক রাষ্ট্র। বিশেষত, তুরস্ক, মিশর, জর্ডন, সিরিয়া ও পাকিস্তানের কাছাকাছি আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। গত কয়েক বছরে আঙ্কারার সঙ্গে তেল আভিভের সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে। তুর্কি প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, পর্দার আড়ালে থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দিস্তান আন্দোলনকে মদত দিচ্ছে তেল আভিভ।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একটি ‘ষড়ভুজ জোট’ তৈরির কথা বলেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ভারত, ইজ়রায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে নিয়ে সেটা গড়ে তুলতে চাইছেন তিনি। ওই জোটে ষষ্ঠ সদস্য হিসাবে আফ্রিকার কোনও সদস্যকে রাখার পক্ষপাতী তেল আভিভ। ফলে ‘ইসলামিক নেটো’কে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতির জল কোন দিকে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার।