ভূমিকম্প, সুনামিতে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় নতুন রাজধানী গড়ছে দ্বীপরাষ্ট্র, সিদ্ধান্ত কি স্রেফ গদি বাঁচানোর কৌশল?
বিকল্প হিসাবে দ্বিতীয় রাজধানী গড়ার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে সে দেশের সরকার। ভবিষ্যতে বড়সড় প্রাকৃতির দুর্যোগের বিপদ অনুভব করেই দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উদ্যোগ দ্বীপরাষ্ট্রটির। এই সংক্রান্ত বিল আনার ব্যাপারে সম্মতিও দেন দ্বীপরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী।
প্রায়শই ভূমিকম্পের আঘাতে কেঁপে ওঠে দ্বীপরাষ্ট্রটি। ভয়াবহ সুনামির অভিজ্ঞতাও রয়েছে দেশটির। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে দেশ চালাতে সমস্যা না হয় তাই বিকল্প একটি রাজধানী গঠনের পথে হাঁটতে পারে উদীয়মান সূর্যের দেশ। সব কিছু ঠিকঠাক চললে জাপানে টোকিয়োর পাশাপাশি আরও একটি শহরের গায়ে উঠতে পারে রাজধানীর তকমা।
টোকিয়োর বিকল্প হিসাবে দ্বিতীয় রাজধানী গড়ার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে সানায়ে তাকাইচি সরকার। রাজধানী গড়ার প্রথম ধাপ হিসাবে একটি আইন পাশ করেছে জাপানের সংসদ। বিলটি জাপানের সংসদের নিম্নকক্ষে সহজে পাশ হলেও, উচ্চকক্ষে তা পাশ করাতে বেগ পেতে হয়েছে সরকারকে।
বর্তমানে টোকিয়োকে ঘিরেই সমস্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হয়। গত শুক্রবার জাপান সরকার ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ তৈরির পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে। সরকারি কাজকর্মে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দ্বিতীয় রাজধানীর গড়তে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে তারা।
আইনটি পাশ হওয়ার ফলে জাপানের দ্বিতীয় রাজধানী কোন শহর হবে তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিল নিয়ে সমঝোতা ও বর্ধিত সংসদীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পর সম্ভাব্য রাজধানীর মর্যাদা পেতে জাপানের বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতাও। সম্ভাব্য দ্বিতীয় রাজধানী হিসাবে তিনটি শহরের নাম ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে জাপানের অন্দরে।
সরকারের যুক্তি, দ্বিতীয় রাজধানী থাকলে টোকিয়ো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হলেও সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, জাপান সরকারের অনুমান আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিয়োর বিস্তীর্ণ এলাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার ৭০ শতাংশ আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ভবিষ্যতে বড়সড় প্রাকৃতির দুর্যোগের বিপদ অনুভব করেই দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি। বিশেষ করে, জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের নানকাই ট্রাফে নিয়ে শঙ্কিত ভূমিকম্পপ্রবণ দেশটি। যদি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তা হলে টোকিয়োর উপর সেই আঁচ এসে পড়বে। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মানবসম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
এই অবস্থায় দেশের প্রশাসন ও অর্থনীতি কী ভাবে সচল রাখা হবে সেই উদ্বেগ থেকেই দু’টি রাজধানী গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের দাবি। এই সংক্রান্ত বিল আনার ব্যাপারে সম্মতি দেন দ্বীপরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। জাপানি পার্লামেন্ট ‘ন্যাশনাল ডায়েট’-এর নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে পাশ হয় সেটি। পরে আইনসভার উচ্চকক্ষ হাউস অফ কাউন্সিলরসের থেকেও সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর একে আইনে রূপান্তরিত করতে আর দেরি করেনি টোকিয়ো
পানের সরকারি সূত্রের মতে, দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে কেবল দুর্যোগ মোকাবিলাই প্রধান কারণ নয়, রয়েছে অর্থনৈতিক কারণও। একটি বিকল্প রাজধানী গড়ে উঠলে টোকিয়োকেন্দ্রিক যে অর্থনীতি গড়ে উঠেছে তার বণ্টন করা সম্ভব হবে। এ ছাড়াও শহরের উপর জনসংখ্যার অতিরিক্ত ভার লাঘব করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে তাকায়েচি সরকার।
বর্তমানে জাপানের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রয়েছে টোকিয়োর। দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ নাগরিক এই মহানগর ও এর আশপাশের এলাকায় বসবাস করে। তাই উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও ভাল ভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়াই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
আরও পড়ুন:
সরকারি ভাবে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলিকে সর্বসমক্ষে তুলে ধরা হলেও দ্বিতীয় রাজধানী গড়ার ক্ষেত্রে কিছুটা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে তাকায়েচি সরকারের। জাপানের রাজধানী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে ওসাকা, ফুকুওকা, আইচির মতো প্রধান নগরগুলি। এদের মধ্যে ওসাকার দিকে পাল্লা ভারী হতে পারে বলে মত বিরোধী দলগুলির।
দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার ধারণাটি ওসাকাভিত্তিক জাপান ইনোভেশন পার্টির (ইশিন) দীর্ঘ দিনের প্রধান নীতি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও ওসাকার প্রাক্তন গভর্নর তোরু হাশিমোতো ২০১০ সালে প্রথম বারের জন্য ওসাকাকে জাপানের দ্বিতীয় রাজধানী করার প্রস্তাব দেন।
১৯৫৫ সাল থেকে জাপানের ক্ষমতা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) এবং তার সহযোগী দল কোমিতোর দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক জোট ভেঙে যায়। ফলে সরকার গঠনে জাপান ইনোভেশন পার্টি বা ইশিনের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সমর্থন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত বিল পাশ করা।
ক্ষমতায় আসার পর তাই প্রতিশ্রুতি রাখতে উঠেপড়ে লেগেছেন তাকাইচি। এই নিয়ে বিরোধী দলগুলি সুর চড়াতে শুরু করেছে। তাদের দাবি, এই পরিকল্পনা নিয়ে আগামী দিনে বিতর্ক তৈরি হবে। একটি বিশেষ শহরকে বেশি গুরুত্ব দিতে চলেছে বর্তমান সরকার। সমালোচকদের আশঙ্কা, দ্বিতীয় রাজধানী গড়ার নামে বিপুল সরকারি তহবিল, কর-সুবিধা ও অবকাঠামো বিনিয়োগ মূলত ওসাকা বা কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়ন তুলনামূলক ভাবে উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
যদিও আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় রাজধানী হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য অঞ্চলটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণতা থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ছাড়াও, বর্তমান রাজধানীর বিকল্প হিসাবে কাজ করার জন্য এর পর্যাপ্ত সরকারি পরিকাঠামো, অর্থনৈতিক পরিধি, জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকতে হবে।
দ্বিতীয় রাজধানীর বিতর্কটি এখন ওসাকার স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। জাপানের রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ, এই আইনটি ‘ওসাকা মেট্রোপলিস প্ল্যান’ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় গতি আনতে পারে। ইশিন দলের বহু দিনের এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হল, ওসাকা শহর ও ওসাকা প্রিফেকচারের মধ্যে দ্বৈত প্রশাসন দূর করা। রাজধানী টোকিয়োর ২৩টি বিশেষ ওয়ার্ডের আদলে ওসাকাকে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় পুনর্গঠন করা।
তবে এই প্রস্তাবটি নিয়ে জনমত দ্বিধাবিভক্ত। ইতিমধ্যে দু’টি গণভোট অনুষ্ঠিত। তাতে ওসাকার বাসিন্দারা পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবুও ওসাকার গভর্নর হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন। তৃতীয় বারের জন্য গণভোট আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি। তাতে পরিকল্পনাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আবার জনমত যাচাই করা যায়।
অন্য দিকে ফুকুওকা, হোক্কাইডো এবং মিয়াগি-সহ বেশ কয়েকটি শহর ও প্রিফেকচার দ্বিতীয় রাজধানী হিসাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গাড়ি নির্মাণকারী বৃহৎ প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটর কর্পোরেশনের সদর দফতর রয়েছে যে আইচিতে, তার গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা বিলটি পাশ হওয়ার পর পরই একটি ঘোষণা করেছেন। ওমুরা চান তাঁর প্রিফেকচারই যেন দেশের দ্বিতীয় রাজধানীর মর্যাদা লাভের জন্য আবেদনকারী শহরগুলির মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে।
হোক্কাইডোর গভর্নর নাওমিচি সুজ়ুকিও তাঁর প্রিফেকচারের হয়ে সওয়াল করেছেন। তাঁর যুক্তি, হোক্কাইডো অঞ্চলে সাপ্পোরোকে কেন্দ্র করে জাতীয় সরকারের বিভিন্ন শাখা দফতর অবস্থিত। এটি ভৌগোলিক ভাবে টোকিয়ো থেকে দূরে হওয়ায় দুর্যোগের (যেমন ভূমিকম্প ও সুনামি) প্রভাব পড়ার ঝুঁকি কম।
কোন অঞ্চল এই মর্যাদা পাবে তা নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়ে উঠেছে জাপানের অন্দরে। দ্বিতীয় রাজধানী পরিকল্পনাটি বিরোধী-নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষে মাত্র দু’ভোটের ব্যবধানে পাশ হয়েছে। বিরোধীদের কথায়, বিলটি আইন হিসাবে পাশ হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হতে পারে সরকারকে। অবস্থান নির্বাচন এবং স্থানীয় জনগণের সমর্থন। এই দু’টি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে জাপানের দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা সফল হবে, না হবে না।