শৈশবে হারান বাবাকে, আবর্জনা কুড়িয়ে পড়াশোনা করান মা! আইআইটির গণ্ডি পেরিয়ে ‘বস্তির ছেলে’ এখন বনকর্তা
গৌতম পদিভার মায়ের কষ্ট বুঝতেন। তাই সেই কষ্টের মূল্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে পড়াশোনায় কখনও ফাঁকি দেওয়ার কথা কল্পনাও করেননি। মাকে সুখী জীবন উপহার দেওয়াই ছিল গৌতমের প্রধান লক্ষ্য।
কথায় বলে, একজন সন্তানের মানুষের মতো মানুষ হওয়ার নেপথ্যে মায়ের ভূমিকা সর্বাধিক। এ কথা যে ভুল নয় তার সাক্ষ্য মায়েরা বরাবরই বহন করে আসছেন। আইএফওএস (ভারতীয় বনবিভাগ) অফিসার গৌতম পদিভারের মা সাখুবাই পদিভার আবার সেই কথা কতটা সত্যি তা-ই যেন প্রমাণ করলেন।
সাখুবাই নিজে কখনও স্কুলে যাননি। পড়াশোনার সঙ্গে লক্ষ যোজন পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক নেই তাঁর। কিন্তু জীবনে সফল হওয়ার জন্য পড়াশোনার গুরুত্ব ঠিক কতটা তা বোঝার বিষয়ে পিছিয়ে থাকেননি। সেই কারণেই তাঁর ছেলে গৌতম আজ ভারতীয় বনবিভাগের কর্তা হয়ে উঠেছেন।
তরুণী বয়সেই স্বামীকে হারান সাখুবাই। সেই সময় গৌতম এবং তাঁর দাদা অনেকটাই ছোট। ফলত সংসারের সম্পূর্ণ দায়ভার এসে পড়ে তাঁদের মায়ের কাঁধে। সন্তানদের পড়াশোনা চালানো তো দূর অস্ত, দু’বেলা ভাত কী ভাবে জোগাড় করা হবে সেটারই কোনও নিশ্চয়তা ছিল না তাঁদের জীবনে।
সাখুবাই হার মানেননি। কেবল খাবারের টাকা জোগাড়ে আটকেও থাকেননি। সন্তানদের পড়াশোনাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একা হাতে সবটা সামলেছেন।
প্রথমে দিনমজুর হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। এ ভাবেই তাঁদের জীবন চলতে থাকে। সেই সময় মহারাষ্ট্রের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ছেলেদের নিয়ে দিন কাটাতেন তিনি।
আরও পড়ুন:
এর পর সাখুবাই ছেলেদের নিয়ে মুম্বই চলে আসেন। সেখানের বস্তিতে থাকা শুরু করেন। সেই বস্তিতে আবর্জনা কুড়োনোর কাজ শুরু করেন। এ ভাবেই সংসারের খরচ জোগাতেন।
গৌতম মায়ের কষ্ট বোঝেন। তিনিও সেই কষ্টের মূল্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে পড়াশোনায় কখনও ফাঁকি দেওয়ার কথা কল্পনাও করেননি। মাকে সুখী জীবন উপহার দেওয়াই ছিল গৌতমের প্রধান লক্ষ্য।
মহারাষ্ট্রের জালনার জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ে স্কুলের পাঠ শেষ করেন গৌতম। এর পর কোনও নামীদামি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা না করে ভাল নম্বর নিয়ে জেইই পাশ করেন গৌতম। আইআইটি মাদ্রাজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
আইআইটি মাদ্রাজ থেকে বিটেক সম্পন্ন করে গৌতম আর ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে এগোননি। সিদ্ধান্ত নেন ইউপিএসসি-র জন্য পড়াশোনা শুরু করার। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। নিজের মতো করে প্রস্তুতি শুরু করেন গৌতম।
আরও পড়ুন:
২০২২ সালে গৌতম এবং তাঁর পরিবারের ভাগ্য চিরজীবনের মতো বদলে যায়। ইউপিএসসি ভারতীয় বন বিভাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন গৌতম। অর্জন করেন সর্বভারতীয় র্যানঙ্ক ১৩৯। ২০২৩ সালে ছত্তীসগঢ় ক্যাডারে ভারতীয় বন বিভাগের কর্মী হিসাবে যোগ দেন গৌতম। শুরু হয় তাঁর স্বপ্নের যাত্রা।
গৌতম আইএফওএস অফিসার হওয়ার সঙ্গে তাঁর মা সাখুবাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং জেগে কাটানো রাতগুলিও মূল্য পায়। জানা গিয়েছে, গৌতম ছোট থাকাকালীন এক বার সাখুবাই একটি ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবে সে সমস্ত প্রতিবন্ধকতাও তাঁকে সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া থেকে থামাতে পারেনি। শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে দিনরাত কাজ করে গিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে গৌতম ছত্তীসগঢ়ের জগদলপুরে অবস্থিত কাঙ্গের ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি সাখুবাই ছেলের কর্মস্থান পরিভ্রমণে গিয়েছিলেন।
গৌতম তাঁর দফতরে মাকে নিয়ে যান। সেখানে নিজের চেয়ারে মাকে বসিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন গৌতম। সেই ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে মায়ের পরিশ্রমের কথা স্মরণ করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, আজ তিনি যা, সবই তাঁর মায়ের অবদান।
গৌতমের মতে, এই চেয়ার তাঁর কাছে কেবল এক জন আইএফওএস কর্মীর পদমর্যাদাই নয়, তার থেকেও অনেক বড় কিছু। এই চেয়ার তাঁকে শৈশব থেকে মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে বড় হওয়ার কথা মনে করায়। এই চেয়ারটি গৌতমের কাছে তাঁর মায়ের ত্যাগের প্রতীক।
গৌতম মনে করেন, তাঁর মা সাখুবাই-ই তাঁকে লড়াই করার অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি, কঠোর পরিশ্রম করার শক্তি জুগিয়েছেন এবং স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতাও দিয়েছেন তিনিই। সেই কারণে এই পদমর্যাদা অর্জনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব গৌতম সাখুবাইকেই দিচ্ছেন।