শৈশব থেকেই অত্যাচারিত, পায়নি জঙ্গলের স্বাদ! মৃত্যুর আগে সবুজের মাঝে খুশিতে দিন কাটে ‘সার্কাসের শেষ হাতি’র
সার্কাসে যে সমস্ত পশুপাখি ব্যবহার করা হত, সেগুলির কোনওটিরই জীবন সুখের হত না। ছোট থেকেই নিয়মের ঘেরাটোপে বেড়ে উঠতে হত সেগুলিকে। সহ্য করতে হত মানুষের অত্যাচার। বন্যজীবনের স্বাধীনতা কাকে বলে, সেই ধারণা সার্কাসের বন্যপ্রাণদের থাকত না।
আগেকার দিনে সার্কাসে রমরমিয়ে পশুপাখি ব্যবহার করা হত। সেগুলির খেলা দেখার জন্য রঙিন তাঁবুর বাইরে দেখা যেত মানুষের ঢল। আট থেকে আশি, সকলের কাছেই সার্কাসের জনপ্রিয়তা ছিল প্রবল। এর অন্যতম কারণ যে হিংস্র পশুদের মজার খেলা দেখানোই ছিল, সেটি বললে অত্যুক্তি করা হবে না।
কেবল ভারত নয়, বিভিন্ন দেশে সার্কাসের জনপ্রিয়তা ছিল কল্পনাতীত। বর্তমানে তা আর নেই। আজকাল শহরের তাপমাত্রার পারদ নামলে আর মাঠে রঙিন তাঁবুর বাহার সে ভাবে দেখা যায় না। শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে না সার্কাসের পোস্টার। আর তাতে পশুদের ব্যবহার করাও এখন বেআইনি। সার্কাসের জনপ্রিয়তা লোপ পাওয়ার সেটিও অন্যতম কারণ।
তবে সার্কাসে যে সমস্ত পশুপাখি ব্যবহার করা হত, সেগুলির কোনওটিরই জীবন সুখের হত না। ছোট থেকেই নিয়মের ঘেরাটোপে বেড়ে উঠতে হত সেগুলিকে। সহ্য করতে হত মানুষের অত্যাচার। বন্যজীবনের স্বাধীনতা কাকে বলে, সেই ধারণা সার্কাসের বন্যপ্রাণদের থাকত না। বয়স বাড়ার পর সার্কাস দলের লোকেরা সেগুলির দিকে আর ফিরেও তাকাতেন না।
তেমনই এক সার্কাসের হাতি ছিল রাম্বা। এশীয় প্রজাতির এই হাতিকে শৈশবেই আর্জেন্টিনার এক সার্কাস দলের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তার পর থেকে শুরু হয় রাম্বার বেঁচে থাকার লড়াই।
৪০ বছর পর্যন্ত সার্কাসের দলের লোকজনের সঙ্গে কষ্টে জীবন কাটায় রাম্বা। প্রশিক্ষণ নিতে না চাইলে বা সার্কাসের দলের লোকজনের কথামতো কাজ না করলে রাম্বাকে খেতে হত লোহার রডের বাড়ি।
আরও পড়ুন:
শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত রাম্বাকে। ফলত পায়ে পড়ে গিয়েছিল মোটা শিকলের দাগ। গা ভর্তি ছিল অজস্র ক্ষতচিহ্নে। রাম্বার চোখমুখ দেখেই বোঝা যেত যে এই সার্কাস জীবনে সে খুশি নয়। যেন হতাশা গ্রাস করেছিল রাম্বাকে।
রডের বাড়ির পাশাপাশি চলত আরও নানা রকমের অত্যাচার। নামমাত্র খাবার খেয়ে দিন গুজরান করতে হত রাম্বাকে। ছিল না ছুটি নেওয়ার অবকাশ। বন্দিদশাতেই জীবন কাটাতে হত রাম্বাকে।
আর্জেন্টিনার সার্কাস দলের কাছে বিক্রি হলেও সেই দল পরে চিলিতে নিজেদের ব্যবসা স্থানান্তরিত করে। ফলে রাম্বাকেও চিলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দল যেখানেই সার্কাস করতে যেত, রাম্বাকেও ট্রাকের পিছনে বন্দি করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হত। এ ভাবেই তার জীবন চলত।
সাল ২০১০। রাম্বার বয়স তখন ৪০। চিলির সার্কাসে ব্যবহৃত হাতিগুলির মধ্যে একমাত্র রাম্বাই তখন জীবিত। সেই দেশের সার্কাসে তখন আর কোনও বন্যপ্রাণ ব্যবহার করা হত না বললেই চলে।
আরও পড়ুন:
সেই বছর চিলির সরকারের এক আইনে রাম্বার জীবনে দেখা দেয় ক্ষীণ আশার আলো। সরকার থেকে সেখানকার সার্কাসে বন্যপ্রাণের ব্যবহার সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। অনেকের মতে, ৪০ বছর বয়সি রাম্বার করুণ দশা দেখেই চিলির সরকার সেই সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্তও রাম্বাকে বন্যজীবনের সুখ এনে দিতে পারেনি। সার্কাস দলের থেকে আলাদা হয়ে রাম্বা কোথায় যাবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সুরাহা পাওয়া যায় না। ফলত আরও এক বছর রাম্বাকে সেই সার্কাস দলের সঙ্গেই থেকে যেতে হয়।
সাল ২০১২। আমেরিকার এক অভয়ারণ্য রাজি হয় রাম্বার দায়িত্ব নিতে। চিলির ‘পার্কে স্যাঞ্চুয়ারি’ নামের এক চিড়িয়াখানায় রাম্বাকে সাময়িক ভাবে রাখা হয়। কথা ছিল, আমেরিকার সেই অভয়ারণ্যে রাম্বাকে যত দিন না নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তত দিন সে সেই চিড়িয়াখানাতেই থাকবে।
দেখতে দেখতে ছ’বছর কেটে যায়। কিন্তু আমেরিকার সেই অভয়ারণ্য থেকে রাম্বাকে আর কেউ নিতে আসে না। সার্কাস জীবনের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এসে চিড়িয়াখানায় পুনরায় বন্দিদের মতো জীবন কাটানোয় অভ্যস্ত হতে হয় রাম্বাকে।
এই যুদ্ধে রাম্বা পাশে পায় চিলির এক অসরকারি সংস্থা ‘ইকোপলিস’কে। সেই সংস্থার জন্যই চিলির সরকার রাম্বাকে সার্কাস জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছিল। সেই সংস্থার কর্মীরা দেখেন, চিলির ঠান্ডায় রাম্বা চিড়িয়াখানায় থাকতে থাকতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি ছোট্ট সেই চিড়িয়াখানায় হাতি রাখার এবং সেটির রক্ষণাবেক্ষণ করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না।
চিড়িয়াখানায় রাম্বার রক্তপরীক্ষা করা হয়। সেই রিপোর্টে ধরা পড়ে রাম্বার কিডনির অবস্থা ভাল নয়। তা দেখে সেই অসরকারি সংস্থার কর্মীরা উঠেপড়ে লাগেন রাম্বাকে অন্য কোথাও স্থানান্তর করার জন্য। তাঁরা চেয়েছিলেন, শেষ বয়সে রাম্বা যেন বন্যজীবনের স্বাদ পায়।
সাল ২০১৯, অক্টোবর মাস। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর রাম্বাকে ব্রাজ়িলের হাতিদের অভয়ারণ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় ‘ইকোপলিস’। চিলি থেকে প্রায় চার হাজার কিমি বিমানপথে সফর করে পঞ্চাশোর্ধ্ব রাম্বা ব্রাজ়িলে পৌঁছোয়। জীবনে প্রথম বারের মতো মুক্ত সবুজে ছুটে বেড়ানোর সুযোগ পায় সে।
সেখানে রানা নামের এক হাতির সঙ্গে রাম্বার বন্ধুত্ব জমে। রানাও রাম্বার মতোই উদ্ধার হওয়া এক হাতি ছিল। দু’টিকে একসঙ্গে লেজ দুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। একসঙ্গে কাঁদাজলে স্নান করে দিন যাপন করতে শুরু করে দুই হাতি।
কিন্তু সেই সুখ রাম্বার কপালে বেশি দিন সহ্য হয়নি। মাত্র দু’মাস বন্যজীবনের স্বাদ মন খুলে আস্বাদন করে সে। সেই বছরই ডিসেম্বরে কিডনির রোগে মৃত্যু হয় রাম্বার। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হাতিটি দু’মাসের জন্য হলেও মনের খুশিতে বাঁচতে পেরেছিল। বন্ধুর সঙ্গও পেয়েছিল।
রাম্বার দুঃখের জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়। ২০২৪ সালে সেটি মুক্তি পায়। তাতে তুলে ধরা হয়েছে, কী ভাবে রাম্বার জন্য দক্ষিণ আমেরিকার অঞ্চলে সার্কাসে বন্যপ্রাণের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়।