মেলে ‘বশ’ করার সামগ্রী, কালোজাদুর উপাদান, প্রকাশ্যে বিক্রি হয় গুপ্তমন্ত্রও! আজও রমরমিয়ে চলে ‘ডাইনিবাজার’
বাজারে ঢুকলে দেখা যাবে সারি সারি দোকানপাট জুড়ে যেন রঙের মেলা। সরু গলিপথ, পাশাপাশি থাকা অসংখ্য দোকানে ঢুঁ মারলেই দেখা মেলে অদ্ভুত জিনিসপত্রের। বাজারটি বিশ্ব জুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ব্যস্ত শহুরে নাগরিক জীবনের আড়ালে রয়েছে এক অন্য বাজার। সেই বাজারে পা দিলে মনে হয় সময়যান চড়ে পিছিয়ে গিয়েছেন কয়েকশো বছর। বাজারটিতে ঘুরতে ঘুরতে মনে হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দাঁড়িয়ে এমন জিনিসপত্রেরও চাহিদা রয়েছে মানুষের! কোথাও সাজানো শুকনো ভেষজ, কোথাও নানা রঙের মোমবাতি, আবার কোথাও তাবিজ, পুতুল ও লোকজ আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সামগ্রী।
লাটিন আমেরিকা দেশ মেক্সিকোয় দেখা মেলে এই বাজারটির। নাম ‘মেরসাদো দে সোনোরা’। বাজারের দোকানগুলিতে দেখা যায় বিচিত্র সব সামগ্রী। সাধারণ শপিং মল তো দূরের কথা, বিশ্বের অনেক প্রচলিত বাজারেও দেখা মেলে না সেই সমস্ত অদ্ভুতুড়ে জিনিসপত্রের।
এই বাজারটিকে স্থানীয় ভাবে ‘ডাকিনী বিদ্যায় ব্যবহৃত সামগ্রীর বাজার’ বলা হয়। এখানে মেক্সিকোর লোকসংস্কৃতির নানা আচার, ‘সান্টা মুয়ের্তে’ বা মৃত্যুর দেবতার মূর্তি, তাবিজ, মোমবাতি এবং বিভিন্ন ধরনের তান্ত্রিক বা কালোজাদুর সামগ্রীর হদিস মেলে। শুধু রহস্যময় পণ্যের জন্য নয়, মেক্সিকোর লোকজ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখার সুযোগের কারণেও বাজারটি বিশ্ব জুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
মেক্সিকো সিটির এই বিখ্যাত (কুখ্যাতও বটে) বাজারটি ১৯৫৭ সালে চালু হয়। কয়েক দশক ধরে এটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারটির পরিধি এবং পণ্যের বৈচিত্রও বেড়েছে। বাজারের বিভিন্ন অংশে পাওয়া যায় শুকনো গাছপালা ও ভেষজ, সুগন্ধি, মোমবাতি, তাবিজ এবং নানা ধরনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সামগ্রী।
বাজারে ঢুকলে দেখা যাবে সারি সারি দোকানপাট জুড়ে যেন রঙের মেলা। দোকানগুলো ভরে থাকে উজ্জ্বল রঙের বিশাল আকারের পুতুলে। ঠিক সেই ধরনের পুতুল, যা মেলা থেকে প্রিয়জনের থেকে উপহার হিসেবে পাওয়ার আশা থাকে। কোথাও আবার ঝলমলে আলোর নীচে বিক্রি হয় ঘর সাজানোর সামগ্রী, মাটি দিয়ে তৈরি নানা পাত্র।
আরও পড়ুন:
সরু গলিপথ, পাশাপাশি থাকা অসংখ্য দোকান, নানা রঙের সামগ্রী এবং ভেষজ ও মোমবাতির গন্ধ— সব মিলিয়ে বাজারটির নিজস্ব একটি আবহ তৈরি হয়েছে। প্রথম বার সেখানে গেলে অনেকের কাছেই অভিজ্ঞতাটি সাধারণ বাজারে কেনাকাটার চেয়ে একেবারেই আলাদা মনে হতে পারে।
তবে ‘মেরসাদো দে সোনোরা’কে অন্য সব বাজারের থেকে আলাদা করে তুলেছে এর ভেষজ, জাদু এবং গুপ্তবিদ্যার সামগ্রীর জন্য নির্দিষ্ট দোকানের সারিগুলি। বাজারের একেবারে পিছনের দিকে থাকা এই অংশটিই পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক স্তরের মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসেন।
পর্যটকদের কাছেও এই জায়গাটি বেশ প্রিয়, কারণ বিভিন্ন পর্যটন গাইডে বাজারের এই রহস্যময় অংশটির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়।
এখানে ভেষজ ও জাদুবিদ্যার সামগ্রীকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না। এর অন্যতম কারণ মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক। ফলে একই দোকানে যেমন বিভিন্ন ধরনের গাছপালা ও ভেষজ পাওয়া যায়, তেমনই দেখা মেলে তাবিজ, জাদুবিদ্যার প্রতীকী সামগ্রী এবং নানা আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত উপকরণেরও।
আরও পড়ুন:
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অ্যাভোকাডো পাতা প্রদাহ কমাতে, চিরন্থোডেনড্রন হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় এবং জাকারান্ডা ফুল পেটের বিভিন্ন সমস্যায় ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও শুকনো র্যাটলস্নেককে ক্যানসারের চিকিৎসায় এবং শুকনো স্কঙ্ক (এক জাতীয় স্তন্যপায়ী প্রাণী) ও স্টারফিশকে ‘রক্ত শক্তিশালী’ করার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করার মতো লোকজ বিশ্বাস রয়েছে এখানে।
জাদু ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত সামগ্রীর তালিকাও কম চমকপ্রদ নয়। সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিক্রি হয় ওকোট কাঠের তৈরি ক্রশ। অশুভ শক্তি দূরে রাখার বিশ্বাসে ব্যবহার করা হয় রসুনের মালা। আবার ‘কুদৃষ্টি’ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রয়েছে ‘হরিণের চোখ’ নামে পরিচিত বিশেষ এক ধরনের বীজ।
প্রেম ও সম্পর্ককে ঘিরেও রয়েছে নানা ধরনের পণ্য। সুগন্ধি, সাবান এবং অন্যান্য সামগ্রীকে অনেক সময় প্রেমের মন্ত্র বা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্য বিশেষ উপচার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
দোকানগুলিতে সাজানো থাকে নানা ধরনের তাবিজ, ঘোড়ার নাল, মোমবাতি, পাউডার ও আধ্যাত্মিক সামগ্রী। মোমবাতিগুলিও শুধু এক রঙের নয়— বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও রঙে তৈরি করা হয়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট রঙের মোমবাতির আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য রয়েছে।
এ ছাড়াও পাওয়া যায় সোনার গুঁড়ো, কালো নুন এবং নানা ধরনের গুঁড়ো বা পাউডার। সেগুলোর উপাদান সব সময় স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা থাকে না। কিছু দোকানে আবার ‘সেন্ট ইগনেশিয়াসের জল’ নামে পরিচিত একটি সামগ্রী বিক্রি হয়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী অবাঞ্ছিত মনোযোগ এড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয় সেটি।
বহু বছর ধরে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সোনোরা বাজার আজ মেক্সিকোর অন্যতম পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই বাজারের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি হয়েছে। নানা ধরনের হুমকি ও পরিবর্তনের মুখে পড়লেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে সোনোরা।
জনপ্রিয়তার নিরিখে মেক্সিকোর বড় বাজারগুলির মধ্যে এর অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে ‘সেন্ট্রাল দে আবাস্তোস দে ইস্তাপালাপা’। দীর্ঘ ইতিহাস, বৈচিত্রময় পণ্য এবং বিশেষ করে লোকজ চিকিৎসা, আধিভৌতিকতা ও গুপ্তবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত সামগ্রীর জন্য সোনোরা আজও স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে টিকে রয়েছে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও।