১১ বছর পর পাক সফরে মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট, ইসলামাবাদ থেকে ভারত-বিরোধী চক্রান্তের সলতে পাকাচ্ছেন মুইজ্জু?
তিন দিনের সফরে সস্ত্রীক পাকিস্তান গিয়েছেন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জু। ভারত-বিরোধী ষড়যন্ত্রের সলতে পাকাতেই কি ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে চাইছেন তিনি?
১১ বছর পর পাকিস্তান সফরে মলদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধান। দশেরা ও বিজয়া দশমীতে ইসলামাবাদে পা রেখেছেন সস্ত্রীক দ্বীপরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জু। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলও। পশ্চিমের প্রতিবেশীর প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জ়ারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের সঙ্গে বৈঠক করবেন তাঁরা। মালের এই পদক্ষেপে নয়াদিল্লির কপালের চিন্তার ভাঁজ যে চওড়া হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
ইসলামাবাদের দাবি, সম্প্রতি মুইজ্জুকে পাকিস্তানে আসার আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে গত ২০ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে পৌঁছোন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। ২২ তারিখ পর্যন্ত সেখানে থাকবেন তিনি। এই সফরে আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সহ একাধিক ইস্যুতে দু’তরফে আলোচনার কথা রয়েছে বলে সূত্র মারফৎ খবর মিলেছে।
১৯৬৬ সালে পাকিস্তান ও মলদ্বীপের মধ্যে স্থাপিত হয় কূটনৈতিক সম্পর্ক। এ বছর যার ৬০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে দুই দেশ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০১৫ সালের পর ইসলামাবাদমুখো হননি মালের কোনও রাষ্ট্রপ্রধান। যার জেরে মুইজ্জুর সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সাজ়িদা মহম্মদের সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজনও করছেন প্রেসিডেন্ট জ়ারদারি।
পাক বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়ের সঙ্গে সীমিত ও প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক করবেন মুইজ্জু। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে সুসম্পর্কের মতো বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী নিয়েও মত বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
মুইজ্জুর সফরের মধ্যে পাকিস্তান-মলদ্বীপ বিজ়নেস ফোরাম-এর আয়োজন করেছে ইসলামাবাদ। এর মূল উদ্দেশ্যই হল, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের রাস্তা সুগম করা। পাশাপাশি, এতে দুই দেশের বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় যে অনেকটাই বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সংশ্লিষ্ট ফোরামে একাধিক সমঝোতা স্মারক বা মউ-তে (মেমরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রস্তাবিত চুক্তিগুলি চূড়ান্ত হলে কিছুটা চওড়া হবে পাকিস্তান ও মলদ্বীপের আর্থিক অংশীদারির রাস্তা। তবে, কোন কোন খাতে কতগুলি সমঝোতা হতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে সেগুলি অর্থনৈতিক ভাবে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সেটাও জানা যায়নি। তা ছাড়া, এই সফরে আলাদা করে ইসলামাবাদের সঙ্গে কোনও জটিল সামরিক চুক্তিতে মুইজ্জু যেতে চাইবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।
দুঁদে কূটনীতিকদের দাবি, পাক-মলদ্বীপ সম্পর্ক কখনও সরলরেখায় চলেনি। ২০১৫ সালে দু’দিনের ইসলামাবাদ সফর করেন দ্বীপরাষ্ট্রটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম। ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে তখন নওয়াজ় শরিফ। সম্পর্কে যিনি আবার শাহবাজ়ের দাদা। আর তাই পুরনো রাস্তায় হেঁটে দীর্ঘ সময় পর ফের মালে-কে কাছে টানার চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে।
এ বছরের ৭ অগস্ট সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে পাকিস্তান। এই সামরিক সমঝোতা অনুযায়ী, অন্য কোনও দেশ বা শক্তি দ্বারা এদের কেউ আক্রান্ত হলে, তিনটি রাষ্ট্রই তাকে নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে। সেই কারণে, সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটিকে ‘ইসলামীয় নেটো’ বলে চিহ্নিত করেছে পশ্চিমি গণমাধ্যম। এতে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করতে যথেষ্টই আগ্রহী ইসলামাবাদ।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের দাবি, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মুইজ্জুকে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার খোলা প্রস্তাব দিতে পারেন শাহবাজ়। মলদ্বীপ তাতে রাজি হলে বিপদ বাড়বে নয়াদিল্লির। সে ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্রটির ইসলামাবাদের সামরিক ঘাঁটি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সমূহ সম্ভাবনা থাকছে। তবে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেওয়া মালের পক্ষে বেশ কঠিন।
আরও পড়ুন:
মক্কা চুক্তির এক মাসের মধ্যেই লাগাতার আক্রমণ শানিয়ে সৌদি আরবকে রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে তুলেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। ফলে, সমঝোতা মেনে সেখানে বিপুল সৈন্য মোতায়েনে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তান। সামরিক সহায়তা দিতে হচ্ছে তুরস্ককেও। মলদ্বীপের প্রতিরক্ষা শক্তি খুবই সীমিত। তাই, শাহবাজ়ের দেওয়া টোপ মুইজ্জু আদৌ গিলবেন কি? এ নিয়ে বেশ সংশয় রয়েছে।
তবে, এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। প্রবল ভারত-বিরোধিতাকে সামনে রেখেই ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে ঝড় তোলেন মুইজ্জু। ভোটে জেতার পরও সেই ধার একেবারেই কমাননি তিনি। ২০২৪ সালে চিন সফর থেকে দেশে ফিরে সাফ জানিয়ে দেন, অবিলম্বে সেখান থেকে সেনা সরাতে হবে নয়াদিল্লিকে। পাশাপাশি, এর জন্য নির্ধারিত একটি সময়সীমাও বেঁধে দেয় তাঁর সরকার। তখন অবশ্য এতে আপত্তি করেনি ভারত।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে মলদ্বীপে ফৌজ পাঠায় নয়াদিল্লি। দ্বীপরাষ্ট্রটির বাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিত তারা। পাশাপাশি, প্রত্যন্ত দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য মানবিক সহায়তা এবং চিকিৎসা উপাদান পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও ছিল ভারতীয় সেনার কাঁধে। এর জন্য মালেকে দু’টি ‘ধ্রুব’ উপহার দেয় কেন্দ্র। মুইজ্জু প্রশাসন এতে আপত্তি তোলায় ২০২৪ সালেই সেখান থেকে ঘরে ফেরেন ৮৮ জন সৈনিক।
যদিও এক বছরের মধ্যেই সুর নরমে বাধ্য হন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দ্বীপরাষ্ট্র সফরে গেলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নতুন দফতর উদ্বোধনে তাঁকে নিয়ে যান মুইজ্জু। ওই অনুষ্ঠানে নমো বলেন, ‘‘মালের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা অব্যাহত রাখবে নয়াদিল্লি। আমাদের দুই দেশের লক্ষ্য এক। সেটি হল, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি অব্যাহত রাখা।’’
পাশাপাশি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে মলদ্বীপ সেনার হাতে ৭২টি সামরিক যান এবং কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তুলে দেন মোদী। পরে তাঁর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারেন মুইজ্জু। সেই প্রসঙ্গে নয়াদিল্লির বিদেশ মন্ত্রক জানায়, আলোচনায় ছিল ভারতের তরফে মলদ্বীপকে সাড়ে ৫৬ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৯০০ কোটি টাকা) ঋণের প্রস্তাব। পাশাপাশি, ‘মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি’ এবং সমুদ্র গবেষণা নিয়েও কথা হয়েছে।’’
উল্লেখ্য, মলদ্বীপের অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটন নির্ভর। চরম ভারত-বিরোধিতা করতে গিয়ে সেখানেও বিপদ ডেকে আনেন মুইজ্জু। নয়াদিল্লি-মালে টানাপোড়েন শুরু হতেই ওই দ্বীপরাষ্ট্রে যাওয়া কমিয়ে দেন এ দেশের ভ্রমণবিলাসীরা। তা ছাড়া, বেজিঙের থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না মেলায় ঘরের মাটিতে প্রবল চাপের মুখে পড়েন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। কড়া সমালোচনায় ফালাফালা হয়ে যায় তাঁর ‘ইন্ডিয়া আউট’ নীতি।
আর তাই কূটনীতিকদের কথায়, পাক সফরে গিয়ে ফের পুরনো ভুল নিশ্চয়ই করবেন না মুইজ্জু। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মলদ্বীপের অর্থনীতি যে দুর্দান্ত চলছে, এমনটা নয়। তবে, ইসলামাবাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে জোর দিতে দেখা যেতে পারে তাঁকে। তার পরেও, জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের উপর কড়়া নজর রাখছে নয়াদিল্লি।