কাজ করছে না ‘দেশি জিপিএস’, মেনে নিল মোদী সরকার! কী ভাবে শত্রুকে রুখবে ফৌজ? পাল্টা হামলাই বা করবে কী করে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের আদলে মহাকাশভিত্তিক নিজস্ব দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থা রয়েছে ভারতের। তার নাম নেভিক। কিন্তু, একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহ খারাপ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়েছে সেটি।
অকেজো ‘দেশি জিপিএস’। মৃত্যু হয়েছে পরমাণু-ঘড়ির। ফলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে তথ্য পাঠাতে পারছে না মহাকাশভিত্তিক দিকনির্ণয় ব্যবস্থা। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার সংসদে সে কথা স্বীকার করতেই দেশ জুড়ে শোরগোল। সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, ‘দেশি জিপিএস’ কাজে জবাব দেওয়ায় বিপদ বাড়ল ভারতীয় ফৌজের। এর জেরে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিখুঁত নিশানায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো যে কঠিন হল, তা বলাই বাহুল্য।
আমেরিকার জিপিএস (গ্লোবাল পজ়িশনিং সিস্টেম), রাশিয়ার গ্লোনাস (গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম), চিনের বেইডো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গ্যালিলিও-র মতো ভারতেরও রয়েছে নিজস্ব মহাকাশভিত্তিক দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থা। নাম, ‘নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়া কনস্টেলেশন’ বা নেভিক। এর সাহায্যে শত্রুঘাঁটিতে নিখুঁত নিশানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে থাকে এ দেশের ফৌজ। বুঝে নেয় তাদের অবস্থান।
এ-হেন নেভিক নিয়ে সম্প্রতি সংসদে একটি লিখিত প্রশ্নের জবাব দেন মহাকাশ বিষয়ক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ। তাঁর কথায়, ‘‘কোনও কিছুর অবস্থান, দিকনির্ণয় এবং সময় নির্ধারণের জন্য মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থায় অন্তত চারটি কৃত্রিম উপগ্রহকে সচল থাকতে হবে। সেখানে নেভিকে কাজ করছে তিনটি উপগ্রহ। সেগুলি হল, আইআরএনএসএস-১বি, আইআরএনএসএস-১আই এবং এনভিএস-০১। এর জেরে স্বয়ংক্রিয় ভাবে তথ্য পাঠাতে পারছে না সেটি।’’
মহাকাশভিত্তিক দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা নেভিক তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৯৯ সালের ভারত-পাকিস্তান কার্গিল যুদ্ধ। সংঘর্ষ চলাকালীন ইসলামাবাদের ফৌজ ছিল পাহাড়ের উপর সুবিধাজনক জায়গায়। তাঁদের সঠিক অবস্থান জানতে এবং নিখুঁত নিশানায় হামলা চালাতে আমেরিকার কাছে জিপিএস পরিষেবার সুবিধা চায় নয়াদিল্লি। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র তা দিতে অস্বীকার করে। তখনই এই ধরনের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে কেন্দ্র।
যুদ্ধ থামার পর নেভিক তৈরিতে আসরে নামে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজ়েশন)। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কেন্দ্রীয় অনুদানের অভাব হয়নি। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই জিপিএসের সমতুল্য এই ব্যবস্থাকে গড়ে তোলেন এ দেশের বিজ্ঞানীরা। ২০১৩ সালের ১ জুলাই নেভিকের জন্য প্রথম দিক নির্ণয়কারী উপগ্রহকে অন্তরীক্ষে পাঠান তাঁরা। গত বছরের (২০২৫ সাল) ২৯ জানুয়ারি সর্বশেষ উপগ্রহটি পায় নেভিক।
আরও পড়ুন:
আমেরিকার জিপিএস, রাশিয়ার গ্লোনাস, চিনের বাইডো এবং ইইউ-এর গ্যালিলিওর সঙ্গে ভারতের তৈরি নেভিকের কিছু মূলগত পার্থক্য রয়েছে। নয়াদিল্লির প্রতিবেশী দেশগুলির বিভিন্ন এলাকার সঠিক অবস্থান এবং দিকনির্ণয়ের কথা মাথায় রেখে একে তৈরি করেছে ইসরো। এ দেশের মূল ভূখণ্ড এবং সীমান্ত থেকে ১,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত কোনও জায়গার অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে নেভিক। অন্য দিকে, বিশ্বের যে কোনও জায়গা খুঁজে দেয় জিপিএস বা গ্লোনাস।
ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তৈরি নেভিক যে শুধু সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, এমনটা নয়। এই ব্যবস্থার কৃত্রিম উপগ্রহগুলি স্থল, আকাশ এবং সমুদ্রে দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও সিদ্ধহস্ত। পাশাপাশি, তাদের কৃষি, জরুরি পরিষেবা, সামুদ্রিক মাছ শিকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পাওয়ার গ্রিড এবং বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করেছে সরকার।
২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নেভিকের হাত শক্ত করতে মোট ন’টি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে ইসরো। সেগুলির সবই ছিল ‘ইন্ডিয়ান রিজিয়োনাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম’ বা আইআরএনএসএস শ্রেণির নভোযান। ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী উপগ্রহগুলির নামকরণ করেন এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আর তাই প্রথমটির নাম ছিল আইআরএনএসএস-১এ। পরেরগুলির নাম একই ভাবে ১বি, ১সি, ১ডি, ১ই, ১এফ, ১জি, ১এইচ এবং ১আই রাখেন তাঁরা।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মহাশূন্যে নেভিকের কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে পাঠানোর সময় এক বার মাত্র ব্যর্থ হয় ইসরো। উৎক্ষেপণের সময় রকেট ঠিকমতো কাজ না করায় আইআরএনএসএস-১এইচকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যেতে পারেননি এ দেশের বিজ্ঞানীরা। বাকি আটটির ক্ষেত্রে অবশ্য কোনও সমস্যা হয়নি। অন্তরীক্ষে পৌঁছোনোর পর নির্ধারিত কাজে লেগে পড়ে তারা।
আরও পড়ুন:
ভারতীয় ভূখণ্ড এবং প্রতিবেশী দেশগুলির কোনও জায়গার নিখুঁত অবস্থান জানতে নেভিকের কৃত্রিম উপগ্রহগুলিতে তিনটি করে পারমাণবিক ঘড়ি বসিয়েছিল ইসরো। সুইস সংস্থা ‘স্প্রেক্টাটাইম’ থেকে সেগুলিকে সংগ্রহ করেন এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। কয়েক বছর কাজ করার পর নেভিকের পাঁচটি উপগ্রহে ওই পরমাণু ঘড়ি ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তখনই সেগুলিকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করতে বাধ্য হয় এ দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা।
তথ্যের অধিকার বা আরটিআইয়ের (রাইট টু ইনফরমেশন) মাধ্যমে গত বছর (২০২৫ সাল) জানা যায়, নেভিকের যে পাঁচটি উপগ্রহের পরমাণু ঘড়ি পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করেছে সেগুলি হল ১এ, ১সি, ১ডি, ১ই এবং ১জি। এ ছাড়া ১এফ উপগ্রহটির তিনটির মধ্যে দু’টি আণবিক ঘড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছে। কাজ করছিল কেবলমাত্র একটি। সংসদে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ জানিয়েছেন, বর্তমানে সেটাও অকেজো হয়ে গিয়েছে।
গত বছরই (২০২৫ সাল) নেভিক নিয়ে একটি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে ইসরো। তখনই জানা যায়, মহাকাশভিত্তিক দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থার ১১টির মধ্যে ‘জীবিত’ আছে মাত্র চারটি উপগ্রহ। তার মধ্যে আবার দু’টির আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। সেগুলি হল, আইআরএনএসএস-১বি এবং আইআরএনএসএস-১এফ। ২০১৬ সালে উৎক্ষেপণের পর গত ১০ বছর ধরে কর্তব্যরত অবস্থায় রয়েছে তারা।
সংসদে লিখিত প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘‘বর্তমানে নেভিক ব্যবস্থার আইআরএনএসএস-১এফ উপগ্রহটির পরমাণু ঘড়ি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে। সেই কারণে স্বয়ংক্রিয় ভাবে এটি আর তথ্য পাঠাতে পারছে না।’’ বছর দুই আগে নেভিকের প্রথম প্রজন্মের আইআরএনএসএস-এর পুরনো বহর সরিয়ে ফেলতে এনভিএস সিরিজ়ের একগুচ্ছ কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাশূন্যে পাঠায় ইসরো। তবে সেটাও পুরোপুরি সমস্যামুক্ত নয়।
ইসরোর অত্যাধুনিক এনভিএস হল পাঁচটি উপগ্রহের সমষ্টি। ২০২৩ সালে এনভিএস ০১-এর সফল উৎক্ষেপণ করে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সংস্থা। কিন্তু, গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে এনভিএস-০২কে পৃথিবীর কক্ষপথে সঠিক ভাবে স্থাপন করতে ব্যর্থ হন তাঁরা। সূত্রের খবর, পৃথিবীর কক্ষপথে ‘বেখাপ্পা’ জায়গায় আটকে রয়েছে ওই উপগ্রহপুঞ্জ। ফলে দিকনির্ণয়ের কাজ শুরু করতে পারছে না তারা।
এনভিএস-০২ কী কারণে ব্যর্থ হল, তা অবশ্য স্পষ্ট করেনি ইসরো। তবে গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, চিনা সহায়তায় গত ১৬ মাসে ছ’টির বেশি কৃত্রিম উপগ্রহ অন্তরীক্ষে পাঠিয়েছে পাকিস্তান। ফলে জম্মু-কাশ্মীর, পঞ্জাব ও হরিয়ানা-সহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার উপর নজরদারি চালাতে পারছে ইসলামাবাদ। শুধু তা-ই নয়, সেখানকার ‘অপটিক্যাল ইমেজ’ হাতে পেতে সমস্যা হচ্ছে না রাওয়ালপিন্ডির।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’ আবার জানিয়েছে, পৃথিবীর নিম্নকক্ষে এমন ভাবে কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে তারা ক্রমাগত ভারতীয় ভূখণ্ডের ছবি তুলতে পারে। বেজিঙের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এগুলি বানিয়েছে ইসলামাবাদ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চিনা সহায়তাতেই (পড়ুন রকেট) অন্তরীক্ষে গিয়েছে ওই ছয় উপগ্রহ, যা নজর এড়ায়নি নয়াদিল্লির সেনা কমান্ডারদের।
পাক উপগ্রহপুঞ্জ নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি ব্লগে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্ল্যাগ অফিসার রিয়ার অ্যাডমিরাল সুধীর পিল্লাই। তাঁর কথায়, ‘‘মাত্র ১৬ মাসে ইসলামাবাদের পর পর উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কোনও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমাদের পশ্চিমের প্রতিবেশীর ভূ-পর্যবেক্ষণ তত্ত্বটাও বেশ সন্দেহজনক। তারা নিশ্চয়ই এগুলিকে সামরিক কাজে ব্যবহার করছে।’’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ অবশ্য সংসদ জানিয়েছেন, ‘দেশি জিপিএস’ অকেজো হয়ে পড়লেও চিন্তার কিছু নেই। কারণ, কিছু দিনের মধ্যেই এনভিএস-০৩ নামের নতুন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাবে ইসরো। সেটি পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছোলেই ফের সজীব হয়ে উঠবে নেভিক। এ ছাড়া ওই শ্রেণির এনভিএস-০৪ এবং এনভিএস-০৫কেও উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রতিরক্ষা মহাকাশ গবেষক গিরীশ লিঙ্গান্না। ‘দ্য উইক’কে তিনি বলেন, ‘‘নেভিকের মতো কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থাটির মূল চালিকাশক্তি হল পারমাণবিক ঘড়ি। সেটার মাধ্যমেই শত্রুর লড়াকু জেট বা ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান বোঝা যায়। তার জন্য আমাদের প্রাথমিক ভাবে একটা উপগ্রহ চাই। এনভিএস-০৩র সফল উৎক্ষেপণে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হবে পাঁচটি উপগ্রহ। তখন মিটে যাবে সমস্যা।’’
বিশ্লেষকদের দাবি, মহাকাশভিত্তিক দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিওর তথ্য সংগ্রহ করে থাকে ইসরো। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেটা ব্যবহার করেও শত্রুঘাঁটিতে দিব্যি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালাতে পারবে ভারতীয় ফৌজ।