২,৭০০ টাকার ওষুধ বিক্রি হচ্ছে ২৭ হাজারে! দাম কমাতে সরকারি ‘দাওয়াই’য়ে কাঁটা ফার্মা স্টক?
ওষুধের চড়া দাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চলছে জোড়া জনস্বার্থ মামলার শুনানি। এ ব্যাপারে কেন ‘মুঠো শক্ত’ করতে পারছে না কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার? লভ্যাংশ কমলে খাদে পড়বে না তো ফার্মা স্টক?
২,৭০০ টাকার ওষুধ বিক্রি হচ্ছে ২৭,০০০ টাকায়! দামের এহেন বিপুল ফারাকের জেরে সুপ্রিম কোর্টের কড়া ভর্ৎসনার মুখে কেন্দ্র। শুধু তা-ই নয়, একে রোগীদের সঙ্গে ‘চরম প্রতারণা’ ও ‘ডাকাতি’ বলেও খোঁচা দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। ফলে, দাওয়াই-মূল্যে লাগাম পড়াতে ‘মুঠো শক্ত’ করছে সরকার। কিন্তু, তার প্রভাবে কি আবার রক্তাক্ত হবে শেয়ার বাজার? ‘শাঁখের করাত’ পরিস্থিতি ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা।
আমজনতাকে স্বস্তি দিতে ইতিমধ্যেই ১৩৭টি ক্যানসারের ওষুধের লভ্যাংশ (পড়ুন, ট্রেড মার্জিন) সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি (ম্যাক্সিমাম রিটেল প্রাইস)-এর ৩০ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্র। ফলে, আগামী দিনে ৭০ শতাংশ হ্রাস পাবে ওই সমস্ত দাওয়াইয়ের দাম। এর প্রভাব ওষুধ সংস্থাগুলির রাজস্বের উপর পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। আর, সেটা সত্যি হলে, তাদের স্টকের সূচক যে নিম্নমুখী হবে, তা বলাই বাহুল্য।
সম্প্রতি, ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত দাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হয় দু’টি জনস্বার্থ মামলা। সেগুলি হল, কিশনচন্দ জৈন বনাম এথিক্স অ্যান্ড মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন বোর্ড এবং চিকিৎসক সঞ্জয় কুলশ্রেষ্ঠ বনাম ভারত সরকার ও অন্যান্য। গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বোচ্চ আদালতে শুরু হয়েছে এর শুনানি। মামলাকারীদের অভিযোগ, খুচরো বাজারে বিপুল মূল্যে বিক্রি হচ্ছে দেশের ৮২ শতাংশ দাওয়াই। ফলে, সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে রোগীদের।
উল্লেখ্য, ভারতের খুচরো বাজারে ওষুধের সর্বোচ্চ মূল্য বা এমআরপি নির্ধারণে ২০১৩ সালে ঐতিহাসিক নির্দেশিকা জারি করে কেন্দ্রীয় রসায়ন ও সার মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগ। গোটা দেশে যা ‘ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডার’ বা ডিপিসিও নামে পরিচিত। মামলাকারী কিশনচন্দ জৈনের অভিযোগ, দেশের ৮২ শতাংশ দাওয়াইকেই এই বিজ্ঞপ্তির বাইরে রেখেছে কেন্দ্র। আর, তাই ইচ্ছামতো দামে বিক্রি হচ্ছে সেগুলি।
এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টকে ক্যানসারের একটি ওষুধের কথা বলেছেন কিশনচন্দ। তাঁর দাবি, ২,৭০০ টাকা পাইকারি মূল্যে ওই দাওয়াই বিক্রি করছে ওষুধ সংস্থা। কিন্তু, খুচরো দোকান থেকে কেনার সময় ২৭,০০০ টাকা দিতে হচ্ছে রোগীকে। মামলাকারীর মুখে এ কথা শুনে ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ করে দেশের শীর্ষ আদালত। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সরকারের জবাবদিহি চেয়ে পাঠায় দুই বিচারপতির বেঞ্চ।
আরও পড়ুন:
ওষুধের মূল্য ঠিক করার কতগুলি পদ্ধতি রয়েছে। মূলত, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা (ট্রায়াল), বাণিজ্যিক উৎপাদন এবং প্যাকেজিংয়ের খরচ ও লভ্যাংশের কথা মাথায় রেখে সেটি ঠিক করে থাকে দাওয়াই সংস্থা। এর পর ওই দামে খুচরো দোকানদারদের কাছে সংশ্লিষ্ট ওষুধটি বিক্রি করে দেয় তারা। অর্থনীতির পরিভাষায়, সংস্থার ঠিক করা এই বিক্রয়মূল্য হল, কোনও দাওয়াইয়ের খুচরো ব্যবসায়ীকে বিক্রির মূল্য বা পিটিআই (প্রাইস টু রিটেলার)।
ওষুধ সংস্থার বিক্রয়মূল্যের উপর ঠিক হয় খুচরো ব্যবসায়ীদের লভ্যাংশ বা ‘ট্রেড মার্জিন’। তার উপর ভিত্তি করে প্রতিটি দাওয়াইয়ের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি নির্ধারণ করে থাকে প্রস্তুতকারী সংস্থা। ওষুধের গায়ে লেখা থাকে সেটি। নিয়ম অনুযায়ী, এই এমআরপি-র চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যায় না কোনও ওষুধ। অভিযোগ, দেশের অধিকাংশ দাইওয়াইতে ‘ট্রেড মার্জিন’ বেশি হওয়ার কারণে ভুগতে হচ্ছে রোগীদের।
একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কোনও ওষুধ খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছে ১০০ টাকায় বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিল প্রস্তুতকারী সংস্থা। এটি ওই দাওয়াইয়ের পিটিআই। খুচরো ব্যবসায়ীরা এই দামের উপর সর্বোচ্চ ৩০০ শতাংশ ‘ট্রেড মার্জিন’ চাইলেন। ফলে, ওষুধটির সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি দাঁড়াল ৪০০ টাকা। কেনার সময় দাওয়াইয়ের গায়ে এই দরই দেখতে পাবেন রোগী।
এই পরিস্থিতিতে মূল্য নিয়ন্ত্রণে দেশের যাবতীয় ওষুধকে দু’টি তালিকায় বিভক্ত করেছে সরকার। এর একটি হল, অত্যাবশ্যকীয় বা ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনশিয়াল মেডিসিন। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ১৮ শতাংশ দাওয়াই। সেগুলির লভ্যাংশ (পড়ুন, ট্রেড মার্জিন) সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি-র ১৬ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্র। বাকি ৮২ শতাংশ ওষুধকে নন-এসেনশিয়াল বা অনাবশ্যক তালিকায় রেখেছে প্রশাসন।
আরও পড়ুন:
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে কেন্দ্র। এজলাসে সলিসিটর জেনারেল বলেন, ‘‘১৩৭টি ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে ‘ট্রেড মার্জিন’ এমআরপি-র ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। ৯ নভেম্বরের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে।’’ তবে, তাতে ‘ঊচ্ছ্বাস’ দেখায়নি শীর্ষ আদালত। বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চের প্রশ্ন, অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রে কেন লভ্যাংশের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া যাবে না?
অন্য দিকে মামলাকারীদের বক্তব্য, অপ্রয়োজনীয় তালিকায় বেশি ওষুধ থাকার কারণেই তার ইচ্ছামতো সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি ঠিক করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা। ফলে, ১১ টাকার স্যালাইন ২৭০ টাকায় এবং ৫,০০০ টাকার স্টেইন কিনতে ২৫,০০০ টাকা দিতে হচ্ছে রোগীদের। এই সমস্যার কথা সর্বোচ্চ আদালতে স্বীকার করে নিয়েছেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্যা ভাটী।
সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্র জানিয়েছে, সরকারের নীতি হল গোটা পরিকাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করা। ভাটীর যুক্তি, বিশ্বে যে দেশগুলিতে ওষুধের দাম সবচেয়ে কম, ভারত তার অন্যতম। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধের দাম রাখার পাশাপাশি বাজারে ওষুধের পর্যাপ্ত জোগান এবং ওষুধ শিল্পের বৃহত্তর স্বার্থের মধ্যে সরকারকে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। তবে, আরও কিছু ওষুধের লভ্যাংশের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিতে পারে মোদী প্রশাসন।
ভাটী জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই চিন্তাভাবনা শুরু করেছে সরকার। পাশাপাশি, ওষুধের দামের উপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রক। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা ‘ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি’ (এনপিপিএ)-কে আপাতদৃষ্টিতে একটি ‘পুরোপুরি অকেজো’ (টোটালি ডিফাঙ্কট) সংস্থা বলেও অভিহিত করেছে দুই বিচারপতির বেঞ্চ। তবে, আপাতত স্থগিত রয়েছে এই মামলার রায়দান।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, অধিকাংশ ওষুধের ক্ষেত্রে লভ্যাংশের ঊর্ধ্বসীমা সুনির্দিষ্ট হলে, দু’ভাবে লাভবান হবেন রোগী। প্রথমত, এতে সস্তায় বহু ওষুধ কিনতে পারবেন তাঁরা। দ্বিতীয়ত, হ্রাস পাবে ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর মতো ভর্তুকির স্বাস্থ্যবিমার খরচ। আমজনতার করের টাকা থেকেই ওই ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। তবে, এর প্রভাব ওষুধ বিক্রেতাদের উপর পড়তে পারে। তাঁদের রাজস্ব কমলে স্টকের সূচক নামার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
তবে, এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, শেয়ার বাজারে ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিরই বেশি করে তালিকাভুক্তি রয়েছে। সেখানে ওষুধ বিক্রেতারা প্রায় নেই বললেই চলে। অন্য দিকে, লভ্যাংশের ঊর্ধ্বসীমা পিটিআই-এর উপর নির্ধারিত হওয়ার প্রশ্নই নেই। ফলে, কোনও অবস্থাতেই কমবে না তাদের রাজস্ব। এমআরপি-তে ‘ট্রেড মার্জিন’ হ্রাস করলে কেবলমাত্র লাভের অঙ্ক কমবে ব্যবসায়ীদের।
গত কয়েক বছরে ভারতে বেশ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে বেশ কিছু রোগ। এতে ওষুধের ব্যবসা যে ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ওষুধ সংস্থাগুলির লাভের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় চিকিৎসা সরঞ্জাম স্টকের উপর ভিত্তি করে বাজারে এসেছে বেশ কিছু মিউচুয়াল ফান্ড। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তাদের উপরেও কোনও প্রভাব পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার।