চিনের হাতে ধৃত এজেন্ট! চাকরি যেতে বসেছিল ডোভালের, কোন মন্ত্রগুপ্তিতে উদ্ধার পান ভারতের ‘স্পাইমাস্টার’?
সিকিমে মোতায়েন থাকাকালীন চিনের হাতে গ্রেফতার হন ভারতের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের বেশ কয়েক জন এজেন্ট। তার পর...
ছদ্মবেশে পাকিস্তানে ঢুকে পড়া। তার পর প্রায় সাত বছর শত্রুর ঘরে বসে গুপ্তচরবৃত্তি! ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বা এনএসএ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসার) অজিত ডোভালের নাম শুনলেই ভয়ে কাঁপে ইসলামাবাদ। এ-হেন ‘স্পাইমাস্টার’-এর যে কখনও কোনও ভুল হতে পারে, তা যেন বিশ্বাসযোগ্যই নয়। যদিও বাস্তবে ঘটেছিল তার উল্টোটাই।
চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আইআইটি রুরকির সমাবর্তনে ভাষণ দেন ডোভাল। সেখানে তিনি নিজেই ফাঁস করেন কর্মজীবনের প্রথম দিকের একটি অভিজ্ঞতা। সেখানে চাকরির যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল তাঁর। যদিও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্লিনচিট দেয় সরকার। ডোভালের কথায়, ‘‘ওই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী কালে মানচিত্রকে গুরুত্ব দিতে শুরু করি। তার পর সাফল্য পেতে আর সমস্যা হয়নি।’’
আইআইটি রুরকির সমাবর্তনে ডোভাল জানান, ঘটনার সময় ২০-র কোঠায় ছিল তাঁর বয়স। তখন আইপিএস হিসেবে সদ্য কাজে যোগ দিয়েছেন তিনি। তা সত্ত্বেও তাঁকেই সিকিমের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয় কেন্দ্র। ফলে পার্বত্য রাজ্যটির সীমান্ত এলাকায় নজরদারি শুরু করেন ডোভাল। পাশাপাশি, খোঁজ রাখতেন চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’র (পিএলএ) গতিবিধির।
ওই সময় ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না সিকিম। স্বাধীন ভাবেই নামগিয়াল রাজবংশের চোগিয়ালরা শাসন করতেন সংশ্লিষ্ট পার্বত্য রাজ্য। স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে নয়াদিল্লির সঙ্গে একটি চুক্তি করেন তাঁরা। সেই সমঝোতায় এ দেশের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয় সিকিম। শুধু তা-ই নয়, গ্যাংটকের প্রতিরক্ষা এবং বিদেশনীতির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় কেন্দ্র।
১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় সিকিম। এর পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে নয়াদিল্লির গুপ্তচর সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ বা র-এর। যদিও তাদের গোপন অভিযানের অনেক কিছু আজও রহস্যাবৃত। দু’বছরের বেশি সময় ধরে গোপন অভিযান চলেছিল বলে দাবি করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই অতি গোপন অভিযানেরও অংশ ছিলেন ডোভাল।
আরও পড়ুন:
স্মৃতিচারণায় এনএসএ জানিয়েছেন, সিকিমে থাকাকালীন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি ছোট দলকে সীমান্তে পাঠান তিনি। আট দিনে ফিরে আসার কথা ছিল তাদের। কিন্তু, ১৫ দিন কেটে যাওয়ার পরও কোনও হদিস না মেলায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে তাঁর। দলটি যে কোনও বড় রকমের বিপদের মুখে পড়েছে তা অচিরেই বুঝতে পারেন ডোভাল।
এনএসএ-র কথায়, ‘‘শুধুমাত্র পেশাগত ভাবে নন, মানুষ হিসাবেও এটা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কারণ আমরা জানতাম না ওই দলের সদস্যেরা বেঁচে আছেন না কি মারা গিয়েছেন। জানতাম না তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছে? সবচেয়ে বড় কথা, ওই সময় কোনও প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা বা তুষারধসের খবরও পাচ্ছিলাম না। এর জেরে দুশ্চিন্তা বাড়ছিল।’’
এর পরই সদর দফতর থেকে একটি ফোন পান ডোভাল। আইআইটি রুরকির সমাবর্তনে তারও উল্লেখ করেছেন তিনি। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, ‘‘ফোনে এক শীর্ষ আধিকারিক জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি ও দিকে কিছু লোক পাঠিয়েছ? উত্তরে বলি, আমি জানি না। ওরা নিশ্চয়ই আসছে।’’ এর কয়েক দিনের মাথায় আশঙ্কা সত্যি হয় তাঁর।
জানা যায়, ডোভালের পাঠানো দলটিকে গ্রেফতার করেছে চিনা সেনাবাহিনী। ফলে পিএলএ-র জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয় তাদের। কয়েক দিন পরে অবশ্য ভারতীয় এজেন্টদের মুক্তি দেয় বেজিঙের লালফৌজ। এনএসএ-র ধারণা, ‘‘সম্ভবত কোনও সমঝোতা হয়েছিল। তবে তাঁরা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে আসেন।’’
আরও পড়ুন:
এই ঘটনায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন ডোভাল। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় বিভাগীয় তদন্ত। স্মৃতিচারণায় এনএসএ বলেছেন, ‘‘আমি জানতাম আমার চাকরি যেতে চলেছে। ফলে নতুন করে কর্মজীবন শুরু করার প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ, যেটা করেছি সেটিকে অত্যন্ত অপেশাদারি কাজ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। তাই শাস্তি পাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় রাস্তা নেই।’’
তবে, শেষ পর্যন্ত তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হন ডোভাল। কারণ, সীমান্তে পাঠানো তাঁর দলকে ভুল মানচিত্র এবং নকশা তুলে দিয়েছিল সদর দফতর। বিভাগীয় তদন্তের সময় অবশ্য সেটা শীর্ষ আধিকারিকদের চোখ এড়ায়নি। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কথায়, ‘‘আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। কারণ, সম্ভবত আমি সব কিছুই ঠিকঠাক করেছিলাম।’’
যদিও এই ঘটনা গভীর ভাবে ডোভালকে নাড়া দিয়েছিল। ওই সময় যথেষ্ট বিচলিত ছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এনএসএ বলেন, ‘‘আমি খুবই দুঃখ পেয়েছিলাম। ফলে সব সময় অস্থির থাকত মন।’’ এই পরিস্থিতিতে এক তিব্বতি শেরপার পরামর্শে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। ‘ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো’তে (আইবি) তাঁর সঙ্গেই কাজ করতেন ওই ব্যক্তি।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অবশ্য তিব্বতি শেরপার পরিচয় অবশ্য ফাঁস করেননি ডোভাল। তবে তাঁকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘‘এটা হল একটা মানচিত্রগত ভুল। কেউ কেউ ঠিকঠাক মানচিত্র বুঝতে পারে। যদিও অধিকাংশের এই নিয়ে মনে ধোঁয়াশা রয়েছে।’’ এনএসএ-র দাবি, বরফে ঢাকা হিমালয়ের বহু এলাকাকে তালুর মতো চিনতেন ওই ব্যক্তি। দুর্গম এলাকায় নতুন রাস্তা খুঁজে বার করার দক্ষতা ছিল তাঁর।
ডোভাল জানিয়েছেন, ওই সময় পথনির্দেশিকার তিনটি মূলমন্ত্র তাঁকে শিখিয়ে দেন সংশ্লিষ্ট তিব্বতি শেরপা। এনএসএ-র কথায়, ‘‘প্রথমে জানতে হবে আপনি কোথায় আছেন। দ্বিতীয় ধাপে ঠিক করুন, কোথায় যেতে চান। আর তৃতীয় বা শেষ স্তরটা হল, সেখানে পৌঁছোনোর রাস্তা বা উপায়গুলি খুঁজে বার করা।’’ এই তিন গুপ্তমন্ত্রেই পরবর্তী জীবনে প্রভূত সাফল্য পান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
২০১৪ সালে প্রথম বার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ওই বছরই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পান ডোভাল। বর্তমানে পূর্ণমন্ত্রীর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিক তিনি। তাঁর আমলে একাধিক অভিযানে নজরকাড়া সাফল্য পায় এ দেশের গুপ্তচরবাহিনী ও ফৌজ। পাশাপাশি, বহু জটিল কূটনৈতিক মিশনেও নেতৃত্ব দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
২০১৬ সালে জম্মু-কাশ্মীরের উরি সেনাছাউনিতে ‘ফিদায়েঁ’ হামলা চালায় পাক মদতপুষ্ট জইশ-ই-মহম্মদের চার সন্ত্রাসবাদী। তাতে ১৯ জন সৈনিককে হারায় নয়াদিল্লি। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসি (লাইন অফ কন্ট্রোল) পেরিয়ে জঙ্গিদের একাধিক লঞ্চ প্যাড গুঁড়িয়ে দেয় এ দেশের বাহিনী। সেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের নীলনকশা তৈরির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিলেন ডোভাল।
২০১৯ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী হামলা চালায় ইসলামাবাদ মদতপুষ্ট জইশের এক জঙ্গি। কেন্দ্রীয় আধা সেনা সিআরপিএফের কনভয়ে বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি নিয়ে ধাক্কা মারে সে। ওই ঘটনায় মৃত্যু হয় ৪০ জওয়ানের। এর পরই পাকিস্তানের বালাকোটে বিমানহামলা চালিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের গুপ্তঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় এ দেশের বায়ুসেনা।
গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ফের পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি নাশকতার শিকার হয় জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁও। পর্যটক-সহ ২৬ জন নিরীহ নাগরিককে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় তারা। এর পরই ইসলামাবাদকে শিক্ষা দিতে সামরিক অভিযান চালায় ভারত। এর পোশাকি নাম হল ‘অপারেশন সিঁদুর’। এর জেরে নয়াদিল্লির সঙ্গে চার দিনের সংক্ষিপ্ত ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে পশ্চিমের প্রতিবেশী।
‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রে পাকিস্তানের ১১টি বিমানঘাঁটিকে উড়িয়ে দেয় ভারতীয় বায়ুসেনা। পাশাপাশি, ধ্বংস হয় সন্ত্রাসীদের একাধিক গুপ্ত আস্তানা। ফলে তড়িঘড়ি নয়াদিল্লির সঙ্গে সংঘর্ষবিরতিতে বাধ্য হয় ইসলামাবাদ। ২০১৯ সালের বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক এবং গত বছরের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন ডোভাল।
পাকিস্তানকে বাদ দিলে দীর্ঘ দিন ধরেই চিনের সঙ্গে সীমান্ত বিবাদে জড়িয়ে আছে ভারত। বর্তমানে সেই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়েছে দুই দেশ। তার জন্য অজিত ডোভালের উপরেই নির্ভর করেছে কেন্দ্র। গত অগস্টে বেজিং সফর করেন নয়াদিল্লির এনএসএ। সেখানকার বিদেশমন্ত্রী ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝোং এবং বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠকও করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।