হোয়াট্সঅ্যাপ ছেড়ে উইচ্যাটে পাক সেনা! কেন হঠাৎ চিনা মেসেজিং অ্যাপ বেছে নিল ইসলামাবাদ? উদ্বেগে দিল্লি
আর হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহার করবে না পাকিস্তান ফৌজ। সেই জায়গায় চিনের তৈরি উইচ্যাটে তথ্য আদান-প্রদান করবে তাঁরা। কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিলেন ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির?
আর হোয়াটস্অ্যাপ নয়। তার পরিবর্তে সাধারণ সৈনিক ও অফিসারদের চিনা মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাট ব্যবহারের নির্দেশ। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের এ-হেন পদক্ষেপের খবর মিলতেই নয়াদিল্লির কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। এর জেরে বেজিং ও ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, সম্প্রতি উইচ্যাট নিয়ে রাওয়ালপিন্ডির পাক সেনা সদর দফতরে জারি হয় বিশেষ একটি অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তি। সেখানে বলা হয়েছে, সামরিক অভিযানের সময় তথ্য আদান-প্রদানে আর ব্যবহার করা যাবে না হোয়াট্সঅ্যাপ। তার বদলে যাবতীয় কাজ হবে চিনা মেসেজ়িং অ্যাপে। একই ভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রেও হোয়াট্সঅ্যাপ বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।
হোয়াট্সঅ্যাপের জন্মদাতা মার্কিন প্রকৌশলী জ্যান কৌম ও ব্রায়ান অ্যাকটন। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংশ্লিষ্ট মেসেজিং অ্যাপটিকে বাজারে আনেন তাঁরা। ওই বছরের নভেম্বরে অ্যাপ্ল নির্মিত আইফোনে সংযুক্ত হয় হোয়াট্সঅ্যাপ। ২০১০ সালে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমেও জুড়ে যায় সংশ্লিষ্ট মেসেজিং অ্যাপ। ফলে আমজনতার দৈনন্দিন জীবনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়তে তার আর বেশি সময় লাগেনি।
২০১৪ সালে হোয়াট্সঅ্যাপকে কিনে নেয় মার্কিন টেক জায়ান্ট মেটা। তাদের অন্যতম জনপ্রিয় দু’টি সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম হল ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম। ক্যালিফোর্নিয়ার মেসেজ়িং অ্যাপটিকে কিনতে ওই সময় খরচ হয়েছিল ১,৯০০ কোটি ডলার। পরবর্তী কালে এতে কৃত্রিম মেধা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) প্রযুক্তি যুক্ত করেন মেটার প্রতিষ্ঠাতা তথা চিফ এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার (সিইও) মার্ক জ়ুকেরবার্গ।
অন্য দিকে, ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে চিনে চালু হয় উইচ্যাট। মেসেজিং অ্যাপটির মূল নকশা তৈরি করেছেন অ্যালেন ঝাং। গোড়ায় এর নাম ছিল উইশিন। এর নির্মাণকারী প্রযুক্তি সংস্থাটির নাম টেনসেন্ট। ২০১৮ সালে উইচ্যাটের গ্রাহক সংখ্যা ১০০ কোটির সীমা অতিক্রম করলে দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় হইচই। যদিও জাতীয় নিরাপত্তা এবং তথ্যের গোপনীয়তা কথা মাথায় রেখে ২০২০ সালে ভারতে একে নিষিদ্ধ করে কেন্দ্র।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াট্সঅ্যাপ এবং চৈনিক উইচ্যাটের মধ্যে বেশ কিছু মূলগত পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, মেটার মেসেজিং অ্যাপে কথা বলা, চ্যাটিং, ভিডিয়ো কল এবং ভয়েস মেসেজ পাঠানোর সুব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে দু’ধরনের গ্রুপ তৈরি করা যায়। একটি হল সাধারণ, অপরটির নাম কমিউনিটি অ্যানাউন্সমেন্ট গ্রুপ। প্রথমটিতে সর্বোচ্চ ১,০২৪ এবং দ্বিতীয়টিতে ২,০০০ জন চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া-নেওয়া করতে পারেন।
এ ছাড়া হোয়াট্সঅ্যাপের দু’টি গ্রুপেই ভিডিয়ো কলের সুবিধা রয়েছে। তাতে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৩২ জন যোগ দিতে পারেন। মেটার মেসেজ়িং অ্যাপে পাঠানো যায় অডিয়ো ও ভিডিয়ো ফাইল। পাশাপাশি, নিজের পছন্দমতো ইমোজি তৈরি করতে পারেন গ্রাহক। ২০২৩ সালে এতে পরীক্ষামূলক ভাবে ‘মেসেঞ্জার’ নামের একটি এআই প্রযুক্তি চালু করেন জ়ুকারবার্গ। ২০২৪ সাল থেকে সেটা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে বলা যেতে পারে।
হোয়াট্সঅ্যাপের মতোই উইচ্যাটে টেক্সট ও ভয়েস মেসেজিং, অডিয়ো-ভিডিয়ো কল, সোশ্যাল ফিডে ছবি-ভিডিয়ো আদান-প্রদানের সুবিধা রয়েছে। তবে এটি শুধুমাত্র একটি মেসেজিং অ্যাপ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে একাধিক সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম। পাশাপাশি, এতে মোবাইল পেমেন্ট এবং নানাবিধ মিনি প্রোগ্রামের সুবিধা পেয়ে থাকেন গ্রাহক। অর্থাৎ, কেনাকাটা ও বিল মেটানোর কাজেও ব্যবহৃত হয় উইচ্যাট।
প্রযুক্তিবিদেরা অবশ্য মনে করেন, দুই মেসেজিং অ্যাপের মূল পার্থক্যের জায়গাটা হল গোপনীয়তা। সে দিক থেকে হোয়াট্সঅ্যাপ অনেক বেশি সুরক্ষিত। কারণ, এতে পাঠানো তথ্যের উপর মেটা বা মার্কিন প্রশাসনের নেই কোনও নজরদারি। অন্য দিকে, উইচ্যাটের ব্যাপারটা পুরোপুরি উল্টো। চিনা সরকারের আতশকাচের নীচে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিটির গোটা বিষয়টি পরিচালিত হচ্ছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
আরও পড়ুন:
ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, হোয়াট্সঅ্যাপের পরিবর্তে উইচ্যাট ব্যবহারের নেপথ্যে জোরালো যুক্তি দিয়েছে পাক ফৌজ। রাওয়ালপিন্ডির কমান্ডারদের দাবি, তাঁদের সামরিক কার্যকলাপের উপর নজরদারি চালাতে পশ্চিমি মেসেজিং অ্যাপে আড়ি পাততে পারে শত্রু রাষ্ট্র। সেই কারণেই চিনা প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু, এর জেরে ইসলামাবাদের সামরিক ডিজিটাল পরিকাঠামো যে পুরোপুরি বেজিং-নির্ভর হয়ে পড়ল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
গত কয়েক বছর ধরেই চিনের পিপল্স লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে পাকিস্তান। এর সুযোগ নিয়ে ইসলামাবাদকে বিপুল পরিমাণে হাতিয়ার বিক্রি করছে বেজিং। সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, সামরিক সরঞ্জামের পাশাপাশি ডিজিটাল পরিকাঠামো, সাইবার সুরক্ষা, যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মতো বিষয়গুলিতে বর্তমানে অনেকটা কাছাকাছি এসেছে এই দুই দেশ।
গত বছরের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের উপর হামলা চালায় পাক মদতপুষ্ট কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী লশকর-এ-ত্যায়বার শাখা সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্ট ফোর্স। মোট ২৬ জনকে গুলিতে ঝাঁজরা করে দেয় তাঁরা। ঘটনার তদন্তে নেমে বিস্ফোরক তথ্য পায় ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। গোয়েন্দাদের দাবি, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগে বেশ কিছু চিনা অ্যাপ ব্যবহার করেছিল সন্ত্রাসীরা।
এনআইএ সূত্রে খবর, হামলার সময় ভারতে নিষিদ্ধ চিনা অ্যাপে কথোপকথন চালায় জঙ্গিরা। এ ছাড়া তাঁদের কাছে ছিল বেজিঙের তৈরি ‘উপগ্রহ-ফোন’। ফলে সন্ত্রাসীদের গতিবিধির টেরও পায়নি পুলিশ-প্রশাসন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ড্রাগনের মেসেজিং অ্যাপ হ্যাক করা বেশ কঠিন। আর তাই পাক ফৌজের উইচ্যাট ব্যবহারের সিদ্ধান্তে চিন্তা বেড়েছে নয়াদিল্লির।
গোয়েন্দাদের দাবি, চিনা মেসেজিং অ্যাপের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলিতে ব্যবহার হচ্ছে ‘কোয়ান্টাম রেজিস্ট্যান্স অ্যালগরিদম’ প্রযুক্তি। ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করেও এগুলিকে হ্যাক করা যাচ্ছে না। তা ছাড়া বেজিঙের অ্যাপে সাধারণ ভাবে স্টেগ্যানোগ্রাফি নামের একটি প্রযুক্তি থাকে। এর সাহায্যে ছবি ও ভিডিয়ো ফাইলের আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে রাখার সুবিধা রয়েছে।
স্টেগ্যানোগ্রাফি প্রযুক্তির জেরে বহু ক্ষেত্রে চোখের সামনে তথ্যের নাগাল পেতেও কালঘাম ছুটে যায় গোয়েন্দাদের। চিনা অ্যাপের তৃতীয় সুবিধা হল গতি। মিলিসেকেন্ডের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে সেগুলি। ওই সময় বার বার বদলাতে থাকে রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি। ফলে আড়ি পাতা একরকম অসম্ভব।
গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে অতীতেও বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে বিভিন্ন রকমের প্রযুক্তিগত সুবিধা নিতে দেখা গিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে ইসলামিক স্টেট (আইসিস বা দায়েশ) এবং আল-কায়দার কথা বলা যেতে পারে। প্রথমটিকে গোপন তথ্য আদান-প্রদানে টেলিগ্রাম ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। দ্বিতীয়টিকে আবার জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটে স্টেগ্যানোগ্রাফি ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে।
পরবর্তী কালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলির এই ফন্দি ধরে ফেলে। তার পরও অবশ্য জঙ্গিরা কৌশল বদল করেনি। পহেলগাঁও হামলায় সেই প্রমাণ পেয়েছেন এ দেশের তদন্তকারীরা। পাক-চিন সামরিক ডিজিটাল ‘বন্ধুত্বে’ আগামী দিনে সেটা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছে নয়াদিল্লি।
আশার কথা হল, উইচ্যাটে নেই ‘এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন’ প্রযুক্তি। ফলে তথ্য সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা কম। তবে এর পাশাপাশি আর কোনও চিনা অ্যাপের ব্যবহার পাক ফৌজ শুরু করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তা ছাড়া বেজিঙের মেসেজিং অ্যাপে লশকর ও জইশের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর আনাগোনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও কেন্দ্রকে সতর্ক করেছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।