সৌদির থেকে হুথি-হত্যার ‘সুপারি’! আরব মরুতে পাকিস্তানি সেনাকে ‘কবরে’ পাঠাবে ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা?
মক্কা চুক্তি মেনে সৌদি আরবে আরও বাহিনী পাঠাচ্ছে পাকিস্তান। ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে তারা।
হুথি হামলায় নাজেহাল সৌদি আরব। ইরান মদতপুষ্ট এই ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের লাগাতার আক্রমণের মুখে পড়ে রিয়াধের ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি দশা’! এর জেরে তড়িঘড়ি মক্কা চুক্তিকে সক্রিয় করেছে তারা। ফলে, ‘ইসলামীয় নেটো’র ছদ্মবেশে আরব রাষ্ট্রটিকে বাঁচাতে সেখানে বিশাল ফৌজ মোতায়েনের পথে পাকিস্তান ও তুরস্ক। এতে মুসলিম দুনিয়ায় ফের শিয়া-সুন্নি সংঘাত মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ল বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
সৌদির স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিদের বাড়বাড়ন্তে আতঙ্কিত হয়ে সম্প্রতি জরুরি বৈঠক করে সেখানকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ওই আলোচনায় মক্কা চুক্তিকে ‘জীবন্ত’ করার বিষয়ে পড়ে চূড়ান্ত সিলমোহর। এর পর গত ৫ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে যৌথ বিবৃতি দেয় তিন রাষ্ট্র। তাতে খুব দ্রুত রিয়াধে বাহিনী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। যদিও তার সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
চলতি বছরের ৭ অগস্ট একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে রিয়াধ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা। এর পোশাকি নাম ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স প্যাক্ট’। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটো-র (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) মতো এতেও যৌথ নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। এর জেরে পশ্চিমি গণমাধ্যমে ‘ইসলামীয় নেটো’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পাচ্ছে এই সমঝোতা।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বলা হয়েছে, তিনটি রাষ্ট্রের যে কেউ অন্য কারও দ্বারা আক্রান্ত হলে, তাকে প্রত্যেকেই যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে। এর জেরে সেপ্টেম্বরে সৌদির উপর হুথি হামলা তীব্র হতেই এই সমঝোতা মেনে পাকিস্তান ও তুরস্ক এগিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা। তখনই আরব রাষ্ট্রটিতে বাহিনী মোতায়েনের ইঙ্গিত দেন ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ।
গত সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনে বিদ্রোহীদের নিখুঁত হামলায় কেঁপে ওঠে সৌদির একের পর এক এলাকা। রাজধানী রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা আরামকো-র একাধিক শোধনাগারকে ‘ফিদায়েঁ’ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে নিশানা করে তারা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় লোহিত সাগরের দিকের তরল সোনার কৌশলগত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। এতে আর্থিক দিক থেকে মারাত্মক ধাক্কা খায় পশ্চিম এশিয়ার ওই আরব রাষ্ট্র।
আরও পড়ুন:
সৌদির অর্থনীতি পুরোপুরি ভাবে খনিজ তেলের উপর নির্ভরশীল। রিয়াধের সেই ব্যবসাই বন্ধ করতে বর্তমানে উঠেপড়ে লেগেছে ইরান মদতপুষ্ট হুথি গোষ্ঠী। পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বাব এল-মান্দেব প্রণালী অবরুদ্ধ করেছে তারা। সেটা লোহিত সাগরের ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি, আরব রাষ্ট্রটির তেলের কুয়ো ও শোধনাগারে চোরাগোপ্তা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে এই ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা।
সম্প্রতি, দক্ষিণ সৌদির নাজরান শহর সংলগ্ন এলাকায় হুথিদের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে রিয়াধ নেতৃত্বাধীন ফৌজের তিনটি ব্রিগেড। ফলে, ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে যুদ্ধবন্দি হয় কয়েক লক্ষ সৈনিক। এ-হেন সফল অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম তাঁরা ‘অপারেশন ভিক্টরি ফ্রম গড’ (পড়ুন, ঈশ্বরের থেকে বিজয়) রেখেছে বলে জানা গিয়েছে। সেটা শেষ হতেই আরব রাষ্ট্রটিতে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক।
সৌদি সরকারের অনুমান, এ বার ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে আক্রমণের তেজ বাড়াবে হুথি গোষ্ঠী। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে আসির প্রদেশ। লোহিত সাগর তীরবর্তী কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই এলাকার আয়তন ৭৬,৬৯৩ বর্গ কিলোমিটার। প্রথমেই সেটা রক্ষার ভার পড়তে পারে পাক ফৌজের ঘাড়ে। তবে, ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে তারা কতটা এঁটে উঠতে পারবে, তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞ মহল।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, মক্কা চুক্তির শর্ত মেনে সৌদিকে হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহ করবে তুরস্ক। অন্য দিকে, রিয়াধের হয়ে হুথি দমনে ভাড়াটে সেনার ভূমিকা নিতে চলেছে পাকিস্তান। ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের তুলনায় ধারে ও ভারে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে তারা। তার পরেও ইসলামাবাদের বাহিনীর পক্ষে ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের নিশ্চিহ্ন করা কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
পাক সংবাদপত্র ‘দ্য ফ্রাইডে টাইম্স’-এ লেখা একটি প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট ইস্যুটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এজাজ হায়দার। তাঁর বক্তব্য, ‘‘হুথিদের উপর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, স্থল অভিযান এবং নৌ অবরোধ গড়ে তুলতে পারে ইসলামাবাদের বাহিনী। কিন্তু, এগুলির কোনওটাতেই খুলবে না ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের পরাজয়ের রাস্তা। উল্টে গেরিলা যুদ্ধে রাওয়ালপিন্ডির হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।’’
একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এজাজ। তাঁর কথায়, ‘‘গত কয়েক বছরে হুথিদের উপর আকাশপথে একাধিক বার হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও ইজ়রায়েল। ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের ধ্বংস করতে পঞ্চম প্রজন্মের বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানকেও ময়দানে নামায় আমেরিকা। কিন্তু, তাতে সাফল্য মিলেছে সীমিতই। কারণ, পাহাড় ও গিরিখাতে দিব্যি নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে পারছে তারা।’’
প্রায় একই সুর শোনা গিয়েছে আর এক পাক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফারহান জাফরির গলায়। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছেন, ‘‘বিগত কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসী নাশকতায় রক্তাক্ত হচ্ছে ইসলামাবাদ। খাইবার-পাখতুনখোয়ায় সক্রিয় রয়েছে তেহরিক-ই-তালিবান-পাকিস্তান (টিটিপি)। বালোচিস্তানে চোখ রাঙাচ্ছে বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। এদের বিরুদ্ধে ল়ড়াইয়ে চূড়ান্ত ব্যর্থ রাওয়ালপিন্ডি।’’
ফলে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কী ভাবে পাক সেনা সাফল্য পাবে, তাই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফারহান। কারণ, তারা আর পাঁচটা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মতো নয়। তাদের বহরে রয়েছে দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অতিশক্তিশালী ড্রোন। পাশাপাশি, যুদ্ধের রং বদলাতে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ব্যবহার করছে ইরান মদতপুষ্ট এই সংগঠন।
অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তারা মনে করেন, মক্কা চুক্তি মেনে সৌদিকে সামরিক সাহায্য দেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আরও দু’টি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, হুথিরা শিয়া ইসলামধর্মী হওয়ায় খুব দ্রুত মুসলিমদের দুই শাখার মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আশঙ্কা রয়েছে। তার আঁচে পুড়তে হবে ইসলামাবাদকেও। কারণ, সুন্নি ইসলামধর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীতে শিয়া নাগরিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
দ্বিতীয়ত, হুথি দমনে সরাসরি পাক ফৌজ মাঠে নামলে তাদের বিরুদ্ধে তৎপর হতে পারে ইরান। অতীতে বহু বার সেটা তেহরানকে করতে দেখা গিয়েছে। ইয়েমেনে মার্কিন বা ইজ়রায়েলি বিমানহামলা হলেই পাল্টা তাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ শানিয়েছে সাবেক পারস্যের ফৌজ। ইসলামাবাদের ক্ষেত্রেও তারা একই পদক্ষেপ করে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে বিদ্রোহ দমনে ইয়েমেনে কয়েক হাজার সৈন্য পাঠায় মিশর। ওই সময় দক্ষিণ সৌদির প্রতিবেশীটির পাহাড়ি এলাকায় ব্যয়বহুল একটি পার্বত্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কায়রো। কিন্তু, জয়ের কোনও সম্ভাবনা না থাকায় শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে তারা। একই রাস্তায় হাঁটতে দেখা গিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে। দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে ফৌজ সরিয়ে নিয়েছে তারা।
আর তাই পাক সরকারকে কূটনৈতিক পথে হুথি সমস্যার সমাধান খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হায়দার। তিনি বলেছেন, ‘‘সংঘর্ষের অর্থ হল সৈনিক হারাতে চলেছি আমরা। অন্যের জন্য কেন যুদ্ধে প্রাণ দেবে তারা? এতে ফৌজের অভ্যন্তরে মাথাচাড়া দিতে পারে বিদ্রোহ। তা ছাড়া, ভাড়াটে সেনা দিয়ে দেশরক্ষা যে হয় না, সেটা বুঝতে হবে সৌদিকেও।’’
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিলের গোড়ায় সৌদিতে ৮,০০০-১৩,০০০ সৈনিক মোতায়েন করে পাকিস্তান। এ ছাড়া, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রটিতে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, সামরিক ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাও পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ। সব মিলিয়ে ইতিমধ্যেই ৩০-৪০ হাজারের একটি বাহিনী রিয়াধের হাতে তুলে দিয়েছে রাওয়ালপিন্ডি।
২০১৫ সালে টানা পাঁচ দিন আলোচনার পর সামরিক ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় পাক সংসদ। ঠিক হয়, বিদেশের মাটিতে কখনও কোনও যুদ্ধে জড়াবে না ইসলামাবাদ। কিন্তু, ১১ বছর পর সেই নীতি পুরোপুরি পাল্টাতে চলেছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। বর্তমানে সেনাসর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) পদে রয়েছেন তিনি।
এ বছর সংবিধানে বড় সংশোধন করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ফলে ফৌজের ব্যাপারে প্রশ্নাতীত ক্ষমতার অধিকার পেয়ে গিয়েছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। পাশাপাশি, সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেও সক্ষম হয়েছেন তিনি। আরবের রণাঙ্গনে এর কেমন পরিণতি দেখা যায়, বর্তমানে সেই দিকেই তাকিয়ে আছে ভারত-সহ গোটা বিশ্ব।